পাথুরে জমিতে সোনা ফলান বাঘমুণ্ডির সচি

0

ধুলো উড়িয়ে ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে ছৌ নাচের আতুড়ঘর বাঘমুণ্ডি। সচিন্দ্রনাথ মাহাতো। এখানকারই এক চাষি। চাষ তো অনেকেই করে। কিন্তু চারদিকে নির্জলা রুক্ষ্ম শুকনো জমি। এমন জায়গায় চাষ করে তাক লাগিয়ে দেওয়া যে সে কাণ্ড নয়। এই কৃষক কেবল তাঁর মগজাস্ত্রে শান দিয়ে দেখিয়ে দিলেন চাষেও সফল হওয়া যায়। বন্ধুর প্রকৃতিকে বন্ধু বানাতে নতুন কোনও টোটকা নয়। বুদ্ধি খাটালেই পাথুরে জমিতেও সোনা ফলে।

বাবাকে দেখে আম গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। এরপর গাছের নীচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পেঁয়াজ, হলুদ, ওল চাষ করতে থাকেন। গাছে আমও ফলল। তলায় পেঁয়াজ, ওল, লঙ্কা এবং হলুদের ভাল ফলন হল। পরপর সাফল্যে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সচিন্দ্রনাথ শুরু করলেন ছাগল আর মুরগি পালনও। সেখানেও মারাংবুরু সহায়। পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডির ঘোরাবাঁধা গ্রামের সচি এলাকার কৃষকদের প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিলেন। এমন উদ্যোগপতিকে কৃষিরত্ন হিসাবে বেছে নিয়েছে ব্লক প্রশাসন।

অযোধ্যা পাহাড় ঘিরে রেখেছে বাঘমুণ্ডি এলাকা। ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত বাঘমুণ্ডির চারিদাকে সবাই এক ডাকে চেনে। কিংবদন্তী ছৌ শিল্পী গুরু গম্ভীর সিং মুরার জন্মভিটে চারিদা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঘোরাবাঁধা গ্রাম। পাণ্ডববর্জিত এই এলাকার চাষবাস পুরোপুরি প্রকৃতি নির্ভর। বৃষ্টি হলে চাষ হয়, নাহলে গেল।

বছরের পর বছর ‌ছিঁটেফোঁটা বৃষ্টির জন্য স্থানীয় কৃষকরা চাষে তেমন সুবিধা করতে পারেন না। খরার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ঘোরাবাঁধার বাসিন্দা সচিন্দ্রনাথ মাহাতো অন্য কিছু ভেবেছিলেন। ছেলেবেলায় বাবাকে দেখেছিলেন গ্রামের এক শিব মন্দিরের পাশে আমগাছ লাগাতে। অযত্নে, অবহেলায় পড়ে থেকেও আমগাছের ফলনে সচির মনে হয় আম চাষ করলে একদিন ফল আসবেই। সেই মতো শুরু। নিজের জমিতে আমচাষ। সচির আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আমগাছের নীচে চালা করে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে থাকতে হত তাঁকে। তিনজনে অমানুষিক পরিশ্রম করে গাছগুলিকে দাঁড় করান। গাছের নীচে কখনও হলুদ, কখনও পেঁয়াজ, আবার সময় বুঝে ওল বা লঙ্কার চারা লাগান সচি। এবছর প্রায় তিন কুইন্টাল হলুদের ফলন হয়েছে। খারিফ সময়ে শুধু পেঁয়াজ চাষ করে পনেরো হাজার টাকা উপার্জন করেছেন। বছরের অন্য সময় ওল ফলিয়েও দারুণ সফল সচি। তার জমির ওলের এক একটা ওজন আড়াই থেকে তিন কেজি।

আম্রপালি আমের সুবাসে মাতোয়ারা এলাকা। সময় বুঝে আমগাছের তলায় নানারকম সব্জি চাষ করেন। এর মধ্যেই তার কত পরিকল্পনা। সচি এবার ওল ও হলুদ বিক্রি করবেন না। সামনের মরসুমে বীজ আকারে কাজে লাগাবেন। আরও জমিতে চাষ করবেন। রীতিমতো উদ্যোগপতির মতো তাঁর ভাবনা। প্রতিটি পরীক্ষায় সমানভাবে সফল বাঘমুণ্ডির এই কৃষক ছাগল পালনও শুরু করেছেন। সমান তালে চলছে পোলট্রিফার্ম, আবারও গরু-বাছুর নিয়েও মেতেছেন। একসঙ্গে এত কিছু সামলান কী করে। 

জমিতে কাজ করতে করতে সচি বলেন, ‘‘ছোট থেকেই এসব দেখে এসেছি, আমি শুধু প্রয়োগ করেছি।’’ আসলে শৈশব থেকেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তাঁর মজ্জায় মজ্জায়। স্রোতের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার এই বুকের পাটা দেখে প্রভাবিত জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি তাঁকে কৃষিরত্ন পুরস্কার দিয়েছে সরকার। সচিকে দেখে উজ্জীবিত এলাকার অন্য চাষিরাও। সচি এখন চাষিভাইদের বকলমে মাস্টার মশাই। রীতিমত ক্লাস নেন। চাষিদের বোঝান সামান্য পরিকাঠামোর মধ্যেও কীভাবে সাফল্য পাওয়া যেতে পারে। 

গাছের নীচে চালা নয়, এখন রীতিমতো পাকা বাড়ি সচির। বছরে লক্ষাধিক টাকার লেনদেন। কল্যাণী বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধিকর্তা অরিবন্দ মিত্র পর্যন্ত চমকে গিয়েছেন সচিকে দেখে। তাঁর কথায়, ‘‘খরা অঞ্চলে ফসলের বৈচিত্র্য দেখিয়েছে সচি। একটি গাছকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে এতগুলো চাষের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। কৃষি প্রযুক্তির নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন উনি।’’ সমান তালে চাষ, সঙ্গে পশুপালন, পোলট্রি। সব্যসাচীর মতো সামলাচ্ছেন সচি। তাঁর নজর যে আরও অনেক, অনেক দূরে। পুরুলিয়া তথা রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকার অন্যান্য চাষিরা যাতে এভাবেই নির্ভরতার পথ খুঁজে পায় তার জন্য সচির ভাবনার শেষ নেই।