শালিনীর ‘আফটার টেস্ট’ স্বপ্নপূরণের গল্প

0

আপনাদের সঙ্গে শালিনীর আলাপ করিয়ে দেব। পুরো নাম শালিনী দত্ত। সোশ্যাল আঁত্রেপ্রেনিয়র বলতে যা বোঝায়। শালিনী তাই। আবার একটু অন্যরকমও।

শালিনী দত্ত
শালিনী দত্ত

ছোটবেলায় ট্র্যাফিক সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়ালেই শালিনীর চোখে পড়ত অভুক্ত মুখগুলো। গাড়ির কাচে হাত বুলিয়ে ভিক্ষা চাওয়া বিবর্ণ মুখগুলো। বয়স বাড়লেও ওই মুখগুলো ভুলতে পারেননি শালিনী। কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ও ফ্যাকাসে সেই মুখগুলো তাঁর মাথায় ভিড় করে আসত। অনেক রাত ওদের কথা ভেবে ভেবে ঘুম হয়নি। কলেজ শেষে সফটঅয়্যার কোম্পানিতে চাকরি পান। কাজের শেষে শিশুশিক্ষা অভিযানে বাচ্চাদের পড়াতেন। বছর দু’য়েক বাচ্চাদের পড়িয়েই বুঝতে পারেন সফটঅয়্যারের কারিগর তিনি নন। মানুষ গড়াই তাঁর জীবনের মন্ত্র। 

এরপর আর দেরি করেননি শালিনী। রাতারাতি মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে যোগ দেন ‘টিচ ফর ইন্ডিয়া’ প্রোগ্রামে। ৮০ টি খুদেপড়ুয়া আর দিদিমণি। এক কামরার সংসারে হাসি ধরে না। আর্থিকভাবে অক্ষম ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির দায়িত্ব সামলাতে নিজেকে উজার করে দিলেন শালিনী। বেশ কিছু দিনের মধ্যেই অভিভাবকদের মধ্যে শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠলেন। দিদিমণিকে সংসারের অভাব অনটনের কথা বলতে শুরু কর‌লেন মায়েরা। স্কুলের দিদিমণি উপলব্ধি করলেন, সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বার্থেই এই মহিলাদের কাজ প্রয়োজন।

‘আফটার টেস্ট’-এর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শালিনী
‘আফটার টেস্ট’-এর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শালিনী

সেই শুরু। ফতিমা ও কামরুন্নিসাকে নিয়ে তৈরি হল ‘আফটার টেস্ট’। মূলত, হস্তশিল্প নিয়ে কাজ আরম্ভ করল এই সংস্থা। তবে শুরুটা করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল শালিনীকে। তিনি তো আর হস্তশিল্পী নন। ফলে বাকিদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল তাঁর। তবে শিল্পে আগ্রহ থাকায়, খুব তাড়াতাড়ি কাজ রপ্ত করে ফেললেন। মাত্র দু’টো পণ্য আর দুই মহিলাকে নিয়ে তাঁর এই শুরুয়াতি এখানেই থেমে থাকল না।

হস্তশিল্প প্রদর্শনী
হস্তশিল্প প্রদর্শনী

ফতিমাদের মুখে চওড়া হাসি

এক সময় চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফতিমার। অনটনের ফলে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। ‘আফটার টেস্ট’-এ কাজ করে উপার্জনে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠাও ওই অশান্তিকে আজ আর পাত্তাই দেন না ফতিমা। পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের জোয়াল টানছেন। আর কামরুন্নিসার যন্ত্রণা অন্যরকম। মেয়েকে পড়াতে চাইতেন কিন্তু দারিদ্র আর সাংসারিক চাপে পারছিলেন না। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ সারার পরই মেয়েদের পড়াশুনো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কাজকর্ম বন্ধের ফতোয়া জারি হয়েছিল। শেষে পরিবারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন কামরুন্নিসা। আর এটা সম্ভব হয়েছিল শালিনীর জন্যে।

হস্তশিল্পের জিনিস গড়ে রীতিমত ভালো টাকা উপার্জন করতে শুরু করলেন কামরুন্নিসা। সেই টাকায় তিন মেয়ের পড়াশুনো চালিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি।

এই দুই মহিলার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার কাহিনিই প্রেরণা জুগিয়েছিল শালিনীকে। কাগজের ওপর হাতে আঁকা কারুকাজে আরও বেশি করে জোর দিলেন তিনি। এই দুই মহিলার সংস্থায় এখন সদস্য সংখ্যা বেড়েছে।

জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত ‘আফটার টেস্ট’-এর মহিলারা
জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত ‘আফটার টেস্ট’-এর মহিলারা

গত এক বছরে গুজরাতে দুটি গ্রামে ৮০ জন মহিলাকে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ‘আফটার টেস্ট’। সংস্থার কর্ণধারের লক্ষ্য, আগামী দিনে এভাবেই উপেক্ষিত নারীদের পাশে দাঁড়াবে তাঁর সংস্থা। অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সব প্রতিকূলতাকে বাগে আনবেন সংস্থার কর্মীরা। এ পথ যে সোজা নয়, তা ইতিমধ্যেই টের পেয়েছেন শালিনী। তবে তাঁর বিশ্বাস ‘চেষ্টা যারা করে তারা পরাজিত হয় না’।

Related Stories