১৪৫ বছর ধরে পার্কস্ট্রিটে 'আলিজো ফুরিয়ার্স'

0

আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগেকার কথা। অবিভক্ত কাশ্মীর থেকে রোজগারের আশায় কলকাতা চলে এসেছিলেন জনৈক মিঃ আলিজো। উদ্দেশ্য ছিল পশুর চামড়া অর্থাৎ 'ফার' দিয়ে তৈরী শীতের পোশাক কলকাতার বাজারে বিক্রি করবেন। ১৮৭১ সালে পার্ক স্ট্রিটে একটি ছোট্ট দোকান দেন তিনি। সেই তার ১৪৫ বছর আগের স্টার্টআপ। নাম রাখেন 'Alijoo Furriers'। ওই চত্বরের এমনকি সম্ভবত এশহরের এটিই সবচেয়ে পুরনো কাশ্মীরি পোশাকের দোকান। আশ্চর্যের বিষয়, এই ১৪৫ বছরে কলকাতা এবং অবশ্যই পার্ক স্ট্রিটের অনকে পরিবর্তন হয়েছে। পাল্টায়নি শুধু আলিজো সাহেবের সেই দোকান। আজও পার্ক হোটেল এবং অক্সফোর্ড বুকস্টোরের ঠিক মধ্যিখানে বিরাজ করছে খাঁটি কাশ্মীরি জিনিসের এই সম্ভার।

আগে এখানে শুধুমাত্র 'অ্যানিম্যাল স্কিন' দিয়ে তৈরী জিনিসপত্রই পাওয়া যেত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনে বদল আসে। পশুর চামড়া দিয়ে তৈরী জিনিসপত্রের বিক্রিও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে কাশ্মীরি শাল, ওভারকোট, ফারের জ্যাকেট, কার্পেট বিক্রি করতে শুরু করেন তাঁরা। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে যোগ হয় একেবারে খাঁটি কাশ্মীরি গয়নাগাটি, ঘর সাজানোর জিনিসপত্রও। কাশ্মীরের অন্যতম আকর্ষণ 'পেপারমাশি'-ও পাওয়া যায় এখানে। এখনও এই দোকানের পশমিনা শালের এশহরে জুড়ি মেলা ভার। কেবলমাত্র কাশ্মীরি মহিলাদের নিজেদের হাতে তৈরী সুতোর কাজ করা পশমিনা শালই বিক্রি হয় এখানে। বাকী জিনিসপত্রও কাশ্মীরের বিভিন্ন গ্রামে কারিগরদের হাতে তৈরী। কলকাতায় একটি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট থাকলেও এখনও জিনিসপত্র অধিকাংশই আসে কাশ্মীর থেকেই।

বর্তমানে দোকানটির মালিক আলিজো সাহেবের বংশধর আব্দুল মাজিদ। বছরখানেক হল বয়স ষাটের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে। তবে ক্লান্তি কোনওভাবেই গ্রাস করেনি সদা হাস্যমুখ এই বৃদ্ধকে। তাঁর দোকানের বিষয়ে ইওর স্টোরিতে তুলে ধরার কথা বলতেই উৎসাহের সঙ্গে দোকানের প্রতিটা বিভাগ ঘুরে দেখালেন। জানালেন, আলিজো ফুরিয়ার্স-এর মূল আকর্ষণ পশমিনা শালের দাম শুরু ২০,০০০ টাকা থেকে। সাধারন কাশ্মীরি শাল ৬০০ টাকা থেকে শুরু হলেও খাঁটি পশমিনা পরতে হলে কিন্তু দাম বেশি পড়বেই। তার উপর যদি তাতে সুতোর কাজ বেশি হলে তো কথাই নেই। দাম ছাড়িয়ে যেতে পারে ১ লক্ষ টাকা। তবে কম দামে পশমিনা বলে যেসব জিনিসপত্র শহরের আনাচ কানাচে বিক্রি হয় তা কোনওমতেই খাঁটি পশমিনা নয় বলেই জানালেন আব্দুল মাজিদ। শীতকালে যেসব কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাদের আমরা শহরের অলি-গলিতে ঘুরতে দেখি তাঁদের অনেকেই আসলে এই দোকান থেকেই জিনিস কেনেন, দাবি তাঁর।

বর্তমানে দোকানের কাজকর্মের দেখাশোনা করেন আব্দুল মাজিদের আত্মীয় ফারহান। আগে যেভাবে বিদেশীরা এসে এখান থেকে জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যেতেন সেই বাজারে অনেকটাই ভাঁটা পড়েছে বলে মত তাঁর। তবে তাঁদের নিজস্ব ক্রেতা রয়েছেন, যাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকী বিদেশ থেকেও জিনিসপত্রের অর্ডার পাঠান। এই শহরে এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা অন্য কোথাও কাশ্মীরি জিনিসপত্র কিনতে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। ফলে বিভিন্ন সময় প্রচারের জন্য দোকানের তরফে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে বর্তমানের ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসায় যে কোনওভাবেই ঝুঁকতে চান না তাঁরা। গত ১৪৫ বছরে নানা ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে আলিজো ফুরিয়ার্স। এই দোকানের পরতে পরতে জড়িয়ে গিয়েছে ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে আলিজু সাহেবের ব্যবসায় কোনওধরণের কোনও পরিবর্তন আনতে নারাজ তাঁর বংশধরেরা।