শ্রুতি রেড্ডির Anthyesti, পারলৌকিক ক্রিয়ার স্টার্টআপ

0

মিলটন থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলেরই ভাবনার মূল ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে মৃত্যুবোধ। স্বর্গের পতন কিংবা স্বর্গ পুনরুদ্ধারের অনবদ্য কাব্যে অন্ধ কবি মিলটনও দেখেছেন অনির্বচনীয় স্বর্গীয় বিভা। মৃত্যুর আগে মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তের মরণবাঁচন নিয়েই মানুষ বেশি চিন্তিত। অথচ মৃত্যুর পর... আর কোনও চাওয়া পাওয়া থাকে না। কবরের নীচে শান্ত হয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও অবশ্য কর্ম থাকে না। আকাশের তারা হয়ে নীল শীতে কেঁপে কেঁপে ওঠা ছাড়া আর কোনও অনুভূতি হয়তো থাকে না। হিন্দু ধর্মমতে শরীরের মৃত্যু হয় আত্মা সে এক চিরন্তন সত্তা। একটা জামা বদলে অন্য জামা পরার মতো একটা শরীর ছেড়ে অন্য শরীরে আশ্রয় নেওয়ার প্রক্রিয়ার নাম মৃত্যু-জন্ম। আত্মার কোনও মৃত্যু নেই তার জন্যে শোক অবান্তর। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর একটি মাথা তুলে পাড়ে আছড়ে পড়ার নাম যদি মৃত্যু হয়, যদি অনন্তের সঙ্গে নিরন্তর মিলনের নাম মৃত্যু হয় তাহলে এত কান্না কেন? এত হাহাকার কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আধ্যাত্মিক বিকাশ হয়েছে গৌতম বুদ্ধের। সেই সব দার্শনিক অভিযাত্রার কাহিনি আজ আমরা ব্যাখ্যা করে বলতে বসিনি। আমরা কলকাতার একটি স্টার্টআপকে নিয়ে আলোচনা করব। সংস্থার নাম অন্ত্যেষ্টি। শুরু করেছেন এক দক্ষিণভারতীয় মহিলা। নাম শ্রুতি রেড্ডি।

পেশায় সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। হায়দরাবাদের মেয়ে। কলকাতায় এসেছেন স্বামীর চাকরির সূত্রে। কলকাতাতেই একটি সংস্থায় সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তার আগে অবশ্য হায়দরাবাদে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চাকরি করেছেন। সত্যমেও কাজ করেছেন শ্রুতি। কিন্তু বাঁধাগতের কাজ থেকে মুক্তি চাইছিলেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কিছু করার কথা ভাবছিলেন। এরই মধ্যে গত বছর অক্টোবর মাসে পরিবারের একটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দাদা শ্বশুরের মৃত্যু। বয়স হয়েছিল। গোটা পরিবার তবুও এই মৃত্যুর ঘটনায় রীতিমত দিশেহারা হয়ে পড়ে। এরপর কী করা হবে, কোথায় কখন অন্ত্যেষ্টি করা যাবে। পুরোহিতের বন্দোবস্ত করা। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন। অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানো। খুঁটিনাটি এসব কাজ করতে করতেই গোটা প্রক্রিয়াটা আয়ত্ত করে ফেলেন শ্রুতি। টের পান গোটা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রচুর লুকিয়ে রয়েছে। শ্রুতি বলছিলেন, কলকাতার মত শহরে মানুষ এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে তার বন্ধু বান্ধবের অভাব তৈরি হয়েছে। পরিবার ছোটো হতে হতে নিউক্লিয়াসের থেকেও ছোটো পরিবার। অবিবাহিত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পরিবারে অনীহা বাড়ছে। একেকটি মানুষ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো খালি ভাসমান। পরিচিত অনেক মানুষের ফোন নম্বরে ঠাসা মোবাইল কিন্তু কার্যক্ষেত্রে একটা নম্বরও সেখানে নেই ডাক দিলে পনের মিনিটে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে। এরকম করুণ নাগরিকতার পাশে এসে দাঁড়াতেই শ্রুতি খুলে ফেলেছেন তাঁর অনন্য স্টার্টআপ। নয় বছরের সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কেরিয়ারে ফুল স্টপ দিয়ে শুরু করলেন এই কাজ। গত মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন এই Anthyesti Funeral Services Pvt. Ltd। একাই। সঙ্গী বলতে কখনও স্বামীর সঙ্গে শলা পরামর্শ করেছেন ঠিকই কিন্তু পথে নেমে লোকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে একটা দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছেন শ্রুতি।

পরিবারে মৃত্যুর মত দুর্ঘটনা ঘটলে এই শহরে কোথায় কোথায় দৌড়বেন? কীভাবেই বা একা একা সমস্ত কাজ করবেন? এতদিন এটা সমস্যাই ছিল। কিন্তু অন্ত্যেষ্টি আসায় গোটা প্রক্রিয়াটায় আর অকারণ হেনস্তা থাকল না। Anthyesti Helpline (Number- 988 331 8181) নম্বরে ফোন করলেই শ্রুতির লোকজন তুরন্ত পৌঁছে যাবেন আপনার পাশে। মৃতদেহ সংরক্ষণ করানো থেকে শ্মশানের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করানো পর্যন্ত শ্মশানবন্ধু হিসেবে শুধু পাশেই থাকবে না দাহ করানোর ব্যবস্থা করানো এমনকি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজনটাও করে দেবেন ওঁরা। নামমাত্র মূল্যের বিনিময়ে ইতিমধ্যেই এই কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন শ্রুতি রেড্ডি। কলকাতার ১৪টি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রুতির স্টার্টআপ। সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জাতীয় বিমানবন্দরে ওদের সম্পর্ক ভালো। ফলে অন্য দেশে মৃত্যু হলে সেই দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মত জটিল কাজটাও করতে পারেন সহজেই। ৯০ দিনে প্রায় ৬০ টি অন্ত্যেষ্টির কাজ করেছেন ওঁরা।

শ্রুতি বলছিলেন ওঁরা সব ধর্মের মানুষের জন্যেই এই পরিষেবা দিয়ে থাকেন। তবে টার্গেট মার্কেট বলতে যা বোঝায় সেটা হিন্দু পরিবারই। বাঙালি পরিবারের ক্ষেত্রে মাত্র তিরিশ কি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার প্যাকেজে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের নিরামিষের আয়োজন পর্যন্ত সমস্তটাই ওঁরা হাসি মুখে করে দেন। বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন নিয়ম কানুন। পারলৌকিক নিয়মের তারতম্যের জন্যে ওদের প্যাকেজেরও তারতম্য থাকে। তবে নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে পারলৌকিক কাজ করাতে ওদের জুরি মেলা ভার। প্রাথমিক ভাবে পূর্বাঞ্চলের বাজারটাই ধরতে চাইছেন শ্রুতি। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ছাড়াও লাগোয়া শহরগুলিকে টার্গেট করেছেন। খুব শিগগিরই আসানসোল, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, মালদহে ছড়িয়ে পরবে অন্ত্যেষ্টির পরিষেবা। একটু একটু করে আগামী বছরের মধ্যে অসম এবং অন্য পূর্বাঞ্চলের রাজ্যের শহরগুলিতে ঢুকে পরবেন শ্রুতি রেড্ডি। বলছেন শোক সন্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা থাকা মানে সেই পরিবারের লোকজনের জীবন আরও সহজ। শ্রুতির অনুরোধ শোকের মুহূর্তে আর দিশেহারা হবেন না। একবার অন্ত্যেষ্টির নম্বরে ফোন ঘোরান। বাকিটা ওরাই সামলে দেবেন, পারিবারিক বন্ধুর মত, আন্তরিকতার মোড়কে মুড়ে।