কে লেখেন আপনার স্টার্টআপ স্টোরির হেডলাইন?

0

২০০৮ এ প্রথম যখন শুরুয়াতি ব্যবসায় নামলাম তখন আর পাঁচটা স্টার্টআপের মতো আমিও চাইতাম এই দুনিয়াটা আমায় চিনুক, জানুক। সেক্ষেত্রে মিডিয়া আপনাকে নিয়ে লিখছে তার চেয়ে ভালো প্রচার আর কি হতে পারে! কভারেজ পেলে লোক জনকে নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পর্কে জানাতে পারতাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে আমার সঙ্গে এমন কিছুই ঘটল না। সবচেয়ে কঠিন বিদ্রুপ হল আমার কাহিনিটা কেউ শুনতে আগ্রহীই ছিল না। আমি কষ্ট পেতাম। CNBC TV18 এর নামিদামী কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে স্টার্টআপ হলাম, মিডিয়া কি পারত না আমায় নিয়ে দুচার লাইন লিখতে? সত্যি কথা বলতে কি আমি মনে মনে চেয়েছিলাম CNBC TV18 আমায় নিয়ে স্টোরি করুক। তাদের হাই প্রোফাইল শো Young Turks এ আমায় ডাকুক। তবে আমার অতো ভাগ্য কোথায়!

ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া আমার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখত। আজ আমি এইকারণেই তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে, তিনজনকে একটি বাণিজ্য সংস্থার তরফে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হল। ওই তিনজনের একজন হিসেবে আমিও পেলাম সম্মান। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিজনেস ডেইলির ( আমার আরেক প্রাক্তন সংস্থা) একটি পৃষ্ঠার অর্ধেক জুরে দুজনের নামে ফলাও করে বেরল। আমি যথারীতি বাদ! আমি বারবার পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলাম। হয়তো আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে! হয়তো ভেতরের পাতায় আছে, অল্প করে, অন্তত একটা লাইন! YourStory-র নাম মিডিয়াতে উল্লেখ করা নিয়ে আমি উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। যখন আপনার কাছে প্রচারের টাকা নেই তখন এই মিডিয়া কভারেজ খুবই জরুরী। 

তারপর ধীরে ধীরে আমি এই সত্যিটার সাথে আপোস করে নিলাম যে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার জন্য আমি নই। মাঝে মধ্যে আমার নাম উল্লেখ হতো বইকি,আর তার জন্য আমি কৃতজ্ঞও। মিডিয়ার আমার প্রতি এই উদাসীনতাই হলো সেই অতিরিক্ত স্পার্ক যা আজ YourStory কে অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরদের ভূস্বর্গ বানিয়েছে। প্রত্যেকে এখানে তাঁর কাহিনী বলার জায়গা পান। এখনও পর্যন্ত ৩০,০০০ গল্প আমরা বলে ফেলেছি। কিন্তু আমি অবশ্যই জানি লাগাতার অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও এমন আরও অনেক অনেক গল্প বলা আমাদের বাকি।

তাই একজন অান্ত্রেপ্রেনিওর হিসেবে আমি বুঝি, কেনো আমাদের কাহিনি মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়াটা দরকার। আমার মনে আছে যখন আমি CNBC আর YourStory-র মাঝখানে দোলাচলে ভুগছি, Flipkart -এ কর্মরত আমার এক বন্ধু আমায় Young Turks-এ কভারেজের জন্য সাহায্য করতে চান। বলেন ওঁরা যখন প্রিমিয়াম কলেজগুলোতে কর্মী নিয়োগের জন্য স্টুডেন্ট হায়ার করতে যাবেন তখন আমি তাঁদের কাজে লাগব, কারণ তাঁদের তখনও লোকে ভালো করে চেনেন না। সময় বিশেষে কারণ পাল্টে গেলেও আমাদের সবার মিডিয়া কভারেজ প্রয়োজন। আপনি ব্যবসায়ী হলে আপনার যোগাযোগ শক্তিশালী হতেই হবে এবং সেক্ষেত্রে অবশ্যই মিডিয়া আপনার সবচেয়ে আদর্শ বাহন। ২০০৮ এ যখন YourStory শুরু হয় তখন থেকে আজকের ভারতীয় মিডিয়া আমূল পরিবর্তিত এবং উন্নত। আট বছর পরে, এখন প্রতিটি দেশীয় পত্রিকা, ম্যাগাজিন, নিউজ ওয়েবসাইট স্টার্টআপ স্টোরি বলতে ক্ষুধার্ত।

মিডিয়ার সব বড় বড় পরম পিতারা হয়তো গত কয়েক বছরে এটা বুঝেছেন যে স্টার্টআপ স্টোরি করাটা মূল্যবান। ই-কমার্সের পিছনে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে তাই স্টার্টআপ স্টোরি করার হিড়িককে আরও তোল্লা দিয়েছে। প্রতিদিন এখন স্টার্টআপরাই খবরের শিরোনামে, বেশিরভাগই ফান্ডিং এর নিউজ। কে billion-dollar club-এ নাম লেখালেন? কে আজকের পোস্টার বয়? কে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন? YourStory-র মতো চিয়ার লিডার প্ল্যাটফর্মেও শিরোনাম নিয়ে চাপে থাকি, জল্পনা কল্পনা করি, কারণ অনলাইন মিডিয়াতে আমরা জানি পেজভিউ ম্যাটার করে।

খবর আর শিরোনাম নিয়ে যখন কথা হচ্ছেই তখন আমার একটা প্রশ্ন আছে যেটা আমি চাই সবাই একটু ভাবুন। কেন মিডিয়া সবসময় স্টার্টআপ সংক্রান্ত চরম খবরই পছন্দ করে? ইউফোরিয়ার গল্প অথবা বুঁদবুঁদের মতো ফেটে যাওয়া... স্টার্টআপরা দেশের রক্ষাকর্তাই হোন কিংবা স্টার্টআপদেরই রক্ষা করার প্রয়োজন থাকুক, এবিষয়ে সর্বদা মিডিয়া চরম ভাবাপন্ন কেন? গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ডুম্‌স ডে স্টোরি পড়ে আমি বেশ হতাশ। দিবাস্বপ্নের মতো ফান্ডিং এর গল্পও আমায় আপ্লুত করে না। বেশিরভাগ অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরদের মতো আমার কাছেও বিনিয়োগ পাওয়াটা বিশাল যাত্রাপথের একটি পদক্ষেপ। সব আলো আঁধারি পেরিয়ে মনে হয় স্টার্টআপ দুনিয়াটা যেন 'Armageddon' থেকে কয়েক হপ্তা দূরে।

আমি বিশেষজ্ঞ নই, তবু আমি মিডিয়া এবং প্রবক্তাদের বাবল থিয়োরি নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই: ওঠানামা কি প্রত্যেক সফরের নিত্যসঙ্গী নয়? কেন আপনারা একজনকে একদিনে হিরো বানিয়ে ফেলেন? আবার তাঁকেই কয়েকমাস পরে মাটিতে আঁছড়ে ফেলতে আপনাদের দ্বিধা হয় না! তাও তাঁর পারফরম্যান্স বিচার করেন না,নিছকই জল্পনার ভিত্তিতে এই ব্যবহার তাঁর প্রাপ্য হয়। 

অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরদের কাছে আমার প্রশ্ন: 

প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত নাম আমাদের কেন এত অহংকারী করে তোলে? গত কয়েক বছরে আমি অনেক স্টার্টআপ হিরোদের দেখেছি, অতিরিক্ত মিডিয়া কভারেজ যাঁদের মধ্যে "আমি লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি" এই ভ্রান্ত ধারণাটা জাগ্রত করে দিয়েছে। একটি মন্তব্যের জন্য আমি একজন অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরকে ধরার চেষ্টায় ছিলাম। তিনি আমায় বললেন , কত টিভি চ্যানেল তাঁকে ধরার জন্য ছোটে, তিনি তাঁদের সময় দিতে পারেন না, আমার জন্য কি করে সময় পাবেন! আমি তৎক্ষণাৎ আমার জায়গা বুঝে গেলাম। তবে আমি ভাবি এঁরা কেন বোঝেন না যে মিডিয়া অ্যাটেনশন পাওয়াটা কতটা ক্ষণস্থায়ী।

এই লেখাটি শুধু মিডিয়া নিয়ে নয়। মিডিয়া ততক্ষণই মিডিয়া যতক্ষণ সে আমাদের জিভ দিয়ে লালা নিঃসরণের মতো হেডলাইন দিচ্ছে। খবরকে তার সততা প্রমাণ করতে হবে। আমাদের আকৃষ্ট করতে হবে। অথবা সেটা ম্যাড়ম্যাড়ে আর বোরিং হবে, যা শুধু আমাদের সময় নষ্ট করবে। চলুন এই বাস্তবের সামনাসামনি দাঁড়াই যে আমাদের একঘেঁয়ে জীবন থেকে একটু দূরে সরে থাকার জন্য আমরা মুখরোচক, রসালো খবরের আশায় হেডলাইনে ক্লিক করি।

আমরা অ্যান্ত্রেপ্রেনিওররা কেন নিজেরাই একটু গুছিয়ে আমাদের নিজেদের গল্প বলতে পারব না? সময়ের অভাব? অথবা ভাবি এটা আমার জন্য এখনই উপযুক্ত নয়। অনেকেই ভাবেন একজন পাবলিক রিলেশনের লোক অথবা দক্ষ গল্পবক্তা কাজটি ভালো পারবেন।

সময় এসেছে নিজেদের কথা নিজেরা বলার। অন্তত যেটুকু সম্ভব। আমরা যদি এই বিষয়টি পারি, তাহলে নিয়মিত মিডিয়াকে শোনানোর কি প্রয়োজন? একটানা খবরের শীর্ষে থাকার কি দরকার? সত্যি কথা বলতে কি, প্রতিনিয়ত খবরে থাকলে আপনিও চিন্তিত থাকবেন। সোসাল মিডিয়ার সর্বৈব ক্ষমতাকে কাজে লাগাচ্ছেন না কেন? নিজের মিডিয়া বানান। এখানে আমি একটি Peppertap স্টোরির উল্লেখ করি। মিডিয়ায় আগুনের মতো ছড়িয়ে গেছিল নভনিত সিং এর ব্যবসা বন্ধের মুখে। নভনিত নিজে দায়িত্ব নেন তাঁর গল্প তাঁর মতো করে বলার। কেউ আপনার জল্পনা থামাতে পারবে না। কিন্তু নভনিতের কথা বহু মানুষ শোনেন এবং স্পষ্টতই তাঁর বক্তব্য বোঝেনও।

অনেক অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরা আমায় বলেন, তিনিই হলেন সেই পরবর্তী ইউনিকর্ণ এবং শিরোনাম, যাকে ধাওয়া করব আমি। তাঁদের আত্মবিশ্বাস আমি ভালোবাসি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি গুমরাই। ঈশ্বরকে বলি এঁদের শক্তি দিতে। দিনের আলোর পর রাতের অন্ধকার যেন এঁদের গ্রাস না করে ফেলে। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি আবার করে শিখলাম আপনার কাজ,জীবন এবং খবর এই সবের ভিতর সাম্যাবস্থা কিভাবে বজায় রাখতে হয়। সবাইকে আমি বলব চলুন নিজেরাই নিজেদের স্টার্টআপ স্টোরি বলি, নিজেদের শিরোনাম তৈরি করি।

Read Stories from the same writer

1. "তোমাকে ভালোবাসি" বলতে এত লজ্জা কিসের?
2. অন্তত আমি জানি, যে আমি জানি না
3. কতটুকু সৃজনশীল হবেন দুহাজর ষোলোয়?