"সাধ‍ের লাউ বানাইলো..." উদ্যোগপতি

0

খরার রাজ্যে এক টুকরো মরিচীকা। অথবা ঠিক হয় যদি বলি, সবুজের আস্ফালন। যা বুঝিয়ে দেয়, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকলে প্রকৃতির রোষ সামলেও অনেক কিছু করা যায়। ধার করে হাজার দুয়েক টাকা আর নিজের অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি। এই পুঁজির ভরসায় লাউ চাষ করে লাখপতি হয়ে উঠেছেন নাড়ু বাউড়ি। 

পুরুলিয়ার এই প্রান্তিক কৃষকের সাধের লাউ দেখতে এখন দূরের গাঁয়ের চাষিরাও ভিড় করছেন। প্রভাবিত সরকারি আধিকারিকরাও। ‌সোজা কথায় নাড়ু এখন আর কৃষিজীবীর তকমায় আটকে নেই, রীতিমতো সে উদ্যোগপতি।

আষাঢ়-শ্রাবণের কয়েক পশলা পেলেও তারপর থেকে বৃষ্টির জন্য হা-হুতাশ রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে। জলের অভাবে মাঠেই শুকোচ্ছে আমন ধান। গরুর পাল সেই শুকনো ধান সাবাড় করে দিচ্ছে এই তো সচরাচর ছবি। 

সবাই যখন প্রকৃতিকে দুষছেন, তখন প্রকৃতিকে বাগে এনে অন্যরকম সাফল্যের উপাখ্যান লিখছে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর ২ নম্বর ব্লক। বামনড়া গ্রামে বলা যেতে পারে সবুজের সমারোহ। ১০০ দিনের কাজের জন্য পুরুলিয়া জুড়ে অনেক পুকুর কাটা হয়েছে। এমনই পুকুর কাটা হয়েছিল ওই গ্রামেও। পুকুরের পাড়ে যে অনেক সম্ভাবনা আছে তা বুঝতে পেরেছিলেন নাড়ু বাউড়ি। তাঁর কথায়, ‘আশেপাশে প্রত্যেকের বাড়িতে লাউ গাছ দেখি। এসব দেখে মনে হয়েছিল সামান্য জলেই তো লাউ ফলে। তেমন একটা যত্ন নিতে হয় না। চাষের ব্যাপারে পুকুরের মালিক মৃর্ধা পরিবারের সঙ্গে কথা বলি। ওরা আমার কথায় রাজি হয়ে যায়।’

চাষ শুরু করতে গিয়ে সমস্যায় পরেন। পরের জমিতে জন মজুরের কাজ করা নাড়ুর কাছে চাষ করার মতো পুঁজি ছিল না। লাউ বীজ কিনতেই লাগবে ১০০০ টাকা। কোনওরকমে সেটা জোগাড় করলেও সারের জন্য ৮০০ টাকা আরও প্রয়োজন। ধার দেনা করে অর্থের ব্যবস্থা হওয়ার পর নাড়ুকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সাত বিঘে জমিকে বাগে আনতে ছেলে, বউ নিয়ে নেমে পড়েন নাড়ু। পুকুরের পাড় হওয়ায় মাচা করারও তেমন প্রয়োজন হয়নি। এবছর বর্ষার মুখে জমি তৈরি করে বীজ ফেলে দিয়েছিলেন। তারপর ইতিউতি লাউ-এর লতা, ডাল বেরোতে থাকে। তখন বালতি করে জল দিয়ে শুরু হয় সেবা-যত্ন। গাছে ফল বেরোনোর পর নাড়ুর আর আনন্দ ধরে না।

বর্ষার একটু আগে থেকে যে লড়াই চলছিল তা থামল আশ্বিনের শেষে। পড়ন্ত হেমন্তেও উজ্জ্বল নাড়ুর খেত। মাঠ জুড়ে লাউয়ের বাড়বাড়ন্ত। হাজার খানেক টাকা বিনিয়োগ করে বিক্রি করে এ‌ই মরসুমে প্রায় ২ লাখ টাকার লাউ বিক্রি করেছেন এই ছাপোষা মানুষটি। লাউ দিয়ে যে পরীক্ষাটা শুরু হয়েছিল এবার কুমড়ো, পুঁইশাকে তার প্রয়োগ করতে চান নাড়ু বাউড়ি। গণ্ডগ্রামে প্রকৃতিকে বাগে এনে নাড়ুর এমন কেরামতির কথা পৌঁছেছে প্রশাসনের কানে। নাড়ুর হাতযশের সাক্ষী হতে মেঠো পথ উজিয়ে মৃত্তিকা সংরক্ষণ দফতরের সহ অধিকর্তা সমর কর্মকার পৌঁছে গিয়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। মহকুমা কৃষি আধিকারিক আশুতোষ সরদারও নাড়ুর কাজে প্রভাবিত। সরকারি আধিকারিকরা নাড়ুকে প্রযুক্তিগত সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিবেশীরা যারা শুরুর দিকে নাড়ুকে গুরুত্বই দেননি, তারা এখন বুঝতে পারছেন সদিচ্ছা থাকলে সব হয়।

‌এই গোটা কর্মকাণ্ডে অদ্ভুতভাবে রয়ে গিয়েছে সম্প্রীতির ছোঁয়া। স্থানীয় সংখ্যালঘু মৃুর্ধারা এক কথায় নাড়ুকে পুকুরের পাড় ছেড়ে দিয়েছিল। চাষের জন্য একটি টাকাও নেয়নি তাঁরা। এই সহযোগিতার মর্যাদা দিয়েছেন নাড়ু। নাড়ুর বক্তব্য, ‘এই ধরনের যদি আরও পুকুর পাওয়া যায় তাহলে সেখানে আমি চাষি করতে চাই। যদি সুযোগ পাই তাহলে পুকুরে মাছ চাষ করব। আর পাড়ে হবে সবজি। এটা আমার স্বপ্ন বলতে পারেন।’ ছোট্ট পরিসরের মধ্যে থেকে নাড়ু তাই দেখিয়ে দিয়েছেন পরিশ্রম ও উদ্ভাবন শক্তি থাকলে কিছু করা যায়। শুধু প্রকৃতির সব দায় দিলে হয় না, কিছু করতে হলে এভাবেই এগিয়ে যেতে হয়।