জগতটা অস্পষ্ট, তবু দেবারতি স্পষ্ট জানেন 'এগোতেই হবে'্

0

অত্যন্ত মিষ্টি চেহারা আর সুন্দর মনের মেয়ে দেবারতি চৌধুরী। এখন ও কৈশোরের শেষপ্রান্তে। দেবারতি ইন্দিরা গান্ধী ওপেন ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। এক বিরল রোগে ক্লাস এইটের পর থেকে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি দুই-ই হারিয়ে ফেলেছে দেবারতি। ক্লাশ এইটে পড়ার সময় মেরুদন্ডে ও মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। কলেজে পড়ার সময় ওই টিউমার ক্রমে বেড়ে যায়। তার জেরে দেখাশোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে দেবারতি।

দেবারতির মা শম্পা চৌধুরী জানালেন, টিউমার অপারেশন করা যেতে পারত। কিন্তু ডাক্তারবাবুরা বলেছেন, অপারেশন করালে সেটা ঝুঁকির হতে পারে। সফল না হলে মেয়ে চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে যাবে। ডাক্তারবাবুরা এও বলেছেন, একটা সময়ের পরে টিউমারগুলো আর বাড়বে না।‌

বিএ পার্ট ওয়ান পড়ার সময় শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলায় দেবারতি কলেজে যাওয়া বন্ধ করল। মাধ্যমিক পর্যন্ত সাধারণ গার্লস স্কুলেই পড়েছে। লেখাপড়ায় বরাবরের মেধাবী।

দুরারোগ্য অসুখ দেবারতির দুনিয়াকে পাল্টে দিয়েছে। সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের সহায়িকা ছাড়া সে এখন কথা বলতে পারে না। এডুকেটর মল্লিকা দাস হাতের আঙুলে সাইনের ছোঁয়ায় প্রতিবেদকের করা প্রশ্নগুলি বলে দিচ্ছিলেন দেবারতিকে। নিখুঁত ইংরেজি বলতে পারে দেবারতি।

দেবারতির মা শম্পাদেবী জানালেন, দেবারতি তাঁর বড় মেয়ে। ওর নীচে আরও দুটি ছেলেমেয়ে আছে। ওরা দুজনেই স্কুলে পড়ে। স্বামী চাকুরিজীবী।

সারাদিন নিজে বাড়িতে থাকে দেবারতি। নিয়ম করে ভাইবোনকে পড়ায়। শম্পাদেবী বললেন, অঙ্কটঙ্কগুলো তো ও মুখে মুখে করায়। ইংরেজি গ্রামারের ক্লাস খুব ভালো করায়। আমার এই মেয়ে সবচেয়ে গুণী।

আর একটি ঘটনার জেরে দেবারতি চৌধুরী এখন একটি সংবাদ। এই রাজ্যের সরকারি ভাবে স্বীকৃত ‌মাল্টিপল ডিসএবিলিটির প্রথম সার্টিফিকেটটি পেয়েছেন দেবারতি। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করেন ইতিমধ্যেই এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে, এই রাজ্যের ডাক্তারবাবুরা প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেটে মাল্টিপল ডিসএবেলিটির উল্লেখ করছেন না। অথচ, এই রাজ্যেও বহু ছেলেমেয়ে মাল্টিপল ডিসএবেলিটির শিকার। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা চোখ ও কান দুটি ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা থাকলে একটির বেশি সার্টিফিকেটে উল্লেখ করতে চান না। তবে দেশের অন্যান্য রাজ্য মাল্টিপল ডিসএবেলিটি সার্টিফিকেট ইস্যু করার ক্ষেত্রে তেমন কোনও বাধা নেই।

অপারেশনের ঝুঁকি না নিলে দেবারতির পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। মেরুদণ্ডে ও মাথার ভিতরে টিউমার থাকলেও ওর প্রাণহানির আশঙ্কা নেই বলে ডাক্তারবাবুরা জানিয়েছেন। ফলে, মা হিসাবে শম্পাদেবী খানিক স্বস্তিতে।

শৈশব-কৈশোরের চেনা পৃথিবী অস্পষ্ট হতে হতে দেবারতির কাছে একদিন বধির হয়ে গেল। দেবারতির চোখে পৃথিবীর রূপরংও ঝাপসা হতে হতে ক্রমে আবছায়া হয়ে গেল। সামান্য দেখতে পায় ও।

শম্পাদেবী জানালেন, ও নিজের পায়েই দাঁড়াবে। ও-ও তাই চায়। কম্পিউটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোন কাজ দেবারতিকে দিয়ে করানো যেতে পারে কিনা আমরা তা খোঁজ নিচ্ছি। খোঁজ থাকলে দয়া করে জানাবেন।

অতি মিশুকে শান্ত প্রকৃতির দেবারতি লেখাপড়া করতে ভালোবাসে। গান শুনতে ভালোবাসে। হারানো পৃথিবী নিয়ে দেবারতির কোনও আক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। তারুণ্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জীবনকে সাবলীল ও সহজভাবে মেনে নিতে শিখেছে ও। দেবারতি জানে, অনেকটা পথ এগোতে হবে ওকে। সে প্রতিবন্ধী হলেও তার বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজন, ওর চেনাজানার পরিধির মানুষজন ওকে নিয়ে গর্বিত‌। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেবারতির মেধা ও সাহস জীবনের চলার পথে এপর্যন্ত কখনওই ওঁকে মনে পড়ায়নি, ও একজন প্রতিবন্ধী। হয়তো তাই দেবারতি গান গাইতে ভালোবাসে। একা একা থাকার সময়গুলিতে গান গাইতেই সবচেয়ে ভালো লাগে ওঁর।