সিগারেট ও মদের বিরুদ্ধে VChangeU-র জেহাদ

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ -ধূমপান ও মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। খবরের কাগজে, সিনেমার পর্দায় ধারাবাহিক প্রচার চলছে। এর বাইরেও কেউ-কেউ বিষয়টা নিয়ে ভাবিত। তেমনই এক গল্প ইয়োর স্টোরির পাতায়।

0

VChangeU হায়দরাবাদের একটি নন-প্রফিট সংস্থা। এর উদ্দেশ্য হল তরুণদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তিশালী করা। VChangeU মনে করে দেশজুড়ে ছোট-ছোট এইসব কাজের মধ্য দিয়েই একদিন বড় পরিবর্তন আসবে।বৃহত্তর এই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেই VChangeU নজর দিয়েছে স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার মতো দুটি জরুরি বিষয়ে।এই সংস্থা বিশ্বাস করে সুস্থ জীবনযাপন এমনই একটি বিষয় যা শুধু ব্যক্তি নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজকেই এগিয়ে নিয়ে যায়। ধূমপান ও মদ্যপান। ভারত-সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই দুটি অভ্যাস ডেকে আনছে বহু প্রাণঘাতী রোগ।যদিও দুটির হাত থেকেই নিস্তার পাওয়া সম্ভব।আর একাজেই হাত লাগিয়েছে VChangeU. অ্যালকোহল ও টোবাকো, দু'টির বিরুদ্ধেই কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ভিচেঞ্জইউ।স্কুলে-স্কুলে এর বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার চলছে। প্রচার চালানো হচ্ছে পাবলিক প্লেসেও।

সিঙ্গাপুরে মন্থন অ্যাওয়ার্ড ২০১২ তে VChangeU টিম
সিঙ্গাপুরে মন্থন অ্যাওয়ার্ড ২০১২ তে VChangeU টিম

মদ ও তামাকের ব্যবসা আজকের নয়। বস্তুত কয়েক শতাব্দী ধরেই বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে মিশে রয়েছে এর বাণিজ্য। কোটি-কোটি ডলারের ব্যবসা। এটাই VChangeU-র কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।VChangeU একটা জিনিস বুঝে নিয়েছে। মদ ও তামাক থেকে তরুণদের বিমুখ করতে পারলেই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা যাবে।সেই ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার জন্য তাই বহুবিধ প্রচার ও সচেতনতা মূলক পরিকল্পনা ছকেছে এই সংস্থা।সম্প্রতি ইয়োর স্টোরি মুখোমুখি হয়েছিল সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রেসিডেন্ট বিজয় ভাস্করের সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎকারের কিছু নির্বাচিত অংশ নিচে তুলে ধরা হল।

ইয়োর স্টোরি -এমন কী কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে আমরা পড়েছি যাতে ভিচেঞ্জইউ এত প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে?

বিজয় ভাস্কর - আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি বিশ্বের সবথেকে ভয়াবহ বিপদের বিরুদ্ধে।প্রতিদিন যার শিকার হন প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ। দেশ-জাতি নির্বিশেষে এক-একটা পরিবার হয়তো বা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমরা এর বিরুদ্ধেই লড়ছি এবং লড়ব। আমরা স্কুল-কলেজ তথা তরুণ-যুবকদের কাছে এর সম্ভাব্য বিপদ তুলে ধরছি।যদিও আমাদের সদস্যদের মধ্যে কেউই কিন্তু হেল্‌থ প্রফেশন থেকে আসেননি। তা সত্ত্বেও কাজটা কিন্তু আমরা করেছি এবং কিছুটা হলেও সাফল্য পেয়েছি।একটা উদাহরণ দিই। ২০১৩ সালে বস্টনে SRNT (Society for Research on Nicotine and Tobacco)-র বার্ষিক সভায় আমাদের প্রেজেন্টেশন পোস্টার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ইংরেজিতে যার নির্যাস ছিল : TOBACCO FREE WORLD : AN INNOVATIVE AND CREATIVE APPROACH FOR TOBACCO CONTROL. ২০১০ সালে মুম্বইয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্স বা ২০১২ সালে সিঙ্গাপুরে ওয়ার্লড কনফারেন্সে আমরা এ বিষয়ে স্কলারশিপও পেয়েছি। শুধুমাত্র ব্যবসার মধ্যেই সৃষ্টিশীলতা লুকিয়ে রয়েছে আমরা এমনটা মনে করি না। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার উপায় খুঁজতেও এর ব্যবহার আছে।

ইয়োর স্টোরি - ঠিক কী কী ফ্যাক্টরের জন্য ভিচেঞ্জইউ-র স্ট্রাটেজি এত সফল হল বলে মনে করেন?

বিজয় ভাস্কর - সামাজিক এই সমস্যার মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার অবশ্যই প্রযুক্তি। অনুপ্রেরণাও বটে। ছাত্র ও তরুণ সমাজ জীবন সম্পর্কে যাতে ইতিবাচক ভাবতে শেখে সেজন্য আমরা ক্রিয়েটিভ পোস্টার এবং অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম ব্যবহার করি। টোবাকো অ্যান্ড অ্যালকোহল কন্ট্রোল পলিসি নিয়ে গত তিনবছর পড়াশোনা করে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের স্ট্রাটেজি খুঁজে পেয়েছি। অভিনব আইডিয়াকে কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু অ্যান্টি টোবাকো ও অ্যালকোহল পোস্টার তৈরি করা হয়েছে। সেগুলি নিয়ে চলছে জোরদার প্রচার। আমরা কিছু 2D ও 3D অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্মও বানিয়েছি। সচেতনতা বাড়াতে যেগুলো আমরা স্কুল-কলেজে দেখিয়ে থাকি। এমনকী ফেসবুকের মাধ্যমেও তামাক-মদ বিরোধী প্রচার চলছে।


ইয়োর স্টোরি - মদ ও তামাকের ব্যবহার বহু প্রচলিত। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনটা ঠিক কীভাবে হলে আলোড়ন শুরু হবে বলে আপনি মনে করেন?

বিজয় ভাস্কর - বর্তমানে যত ধরনের ক্রাইম হয়-খুন, দুর্ঘটনায় মৃত্যু,শিশু নিগ্রহ, আত্মহত্যা-এর অর্ধেকই জানবেন অ্যালকোহলের কারণে। আমরা তো মনে করি যারা মদ্যপানকে উৎসাহিত করেন বা এর ব্যবহারে যুক্ত তারা আসলে শিশু নিগ্রহ, অপরাধ ও হিংসাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। দিল্লিতে নির্ভয়াকাণ্ডের দিকে তাকান। সবাই বলছে একটি মেয়ের ওপর কয়েকজন যুবকের পাশবিক অত্যাচার। কিন্তু নারকীয় অত্যাচারের আগে ওই ধর্ষকরা যে মত্ত অবস্থায় ছিল সেটা কেউ বলছে না। আমার তো মনে হয় অ্যালকোহলের প্রভাবে আচ্ছন্ন থাকার জন্যই তারা ওই ধরনের জঘণ্য অপরাধ করতে পেরেছিল। সেই ঘটনার পরে দেশজুড়ে কত তর্কবিতর্ক। কিন্তু মদ্যপান নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে কাউকে দেখলাম না। অন্যদিকে তামাকের বাণিজ্য বিশ্বায়ন ঘটে গিয়েছে। টোবাকো ইন্ডাস্ট্রি নিজেই একটা শক্তি। আমাদের লড়াই চালাতে হচ্ছে তামাকের ব্যবহারের বিরুদ্ধে। আমরা চাইছি মদ ও তামাককে নিষিদ্ধ করা হোক। সেটা হলেই শহর বা গ্রামে, ঘরে-ঘরে শান্তি ফিরবে, রোগের দাপট কমবে।

ইয়োর স্টোরি - মদ ও তামাকের ব্যবহার কমাতে সরকার কী করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?এখন অল্পবয়সিদের সিগারেট বিক্রির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কি আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়?

বিজয় ভাস্কর - তামাক বিরোধী প্রচারের জন্য সরকার যে টাকা খরচ করে থাকে, ক্যান্সার, ফুসফুস বা হার্টের বিভিন্ন রোগে সরকারের খরচ এর থেকে তিনগুণ বেশি। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করা গেলে যে টাকাটা বাঁচত সেই টাকাটা অনায়াসে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যায় কাজে লাগত। মদ ও তামাক এত রোগের জন্ম দিচ্ছে যে এসব জিনিসের ওপর আরও বেশি কর আরোপ করা উচিত। যাতে সেই টাকাটা উর্ধ্বমুখী ওষুধের দামে কিছুটা প্রলেপ দিতে পারে। সিগারেট, মদের বিরুদ্ধে সরকারের অনেক আইন, বিধিনিষেধ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেগুলি মোটেই কঠোরভাবে প্রয়োগ হয় না। নজরদারিও সেভাবে আছে বলে মনে হয় না। এখনও তো দেখছি অল্পবয়সিরা সহজেই দোকান থেকে সিগারেট বা মদ কিনছে। পাবলিক প্লেসে ধূমপানও চলছে।


ইয়োর স্টোরি - সোশ্যাল অন্ত্যপ্র্যানরদের কী পরামর্শ দেবেন?

বিজয় ভাস্কর - সামাজিক ক্ষেত্রে যাঁরা উদ্যোগ গড়ে তুলছেন বা তোলার কথা ভাবছেন তাঁদের একটা কথাই বলব। আপনার প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে তুলুন। আর লাভের সেই টাকাটা বিলাসিতায় উড়িয়ে না দিয়ে মানুষের সেবায় ব্যবহার করুন।

ইয়োর স্টোরি - এর বাইরে আমাদের পাঠকদের কিছু বলবেন?

বিজয় ভাস্কর - অনেকেই সমাজসেবায় কিছু অবদান রাখার কথা ভাবেন।কিন্তু পারিবারিক বা অন্য কারণে সেটা আর হয়ে ওঠে না। শুরুটা কীভাবে করা যায় সেটাও তারা বুঝে উঠতে পারেন না। স্বাধীনতার পরে আমাদের দেশে বহু বিলিওনেয়ার এসেছেন। কিন্তু ধনী ও গরিবের মধ্যে ফারাকটা আরও প্রকট হয়েছে। কেউ-কেউ এক কাপ কফির জন্য ৫০ টাকা খরচ করেন। আবার কেউ-কেউ সারাদিনের রোজগার ওই ৫০ টাকা দিয়েই পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেন। আমাদের দেশের তরুণদের এই অসাম্য, ফারাক মেটানোর কাজেই আরও বেশি-বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আসবে কাঙ্খিত পরিবর্তন।