শক্তিগড়ের দৈত্য ল্যাংচায় সিদ্ধেশ্বরের চওড়া হাসি

4

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এগোলে শক্তিগড়ে রাস্তার দুপারে অজস্র দোকান। কোনওটা ল্যাংচাঘর, কেউ ল্যাংচা সম্রাট। বাহারি স্বাদের মতো, বাহারি সব নাম। কারও ল্যাংচা ১০ টাকা, কোথায় ৫০ টাকা। কিন্তু ১০০০ টাকার পিসের ল্যাংচা কোথাও শুনেছেন। যার ওজন আবার সাত কেজি। হ্যাঁ, এমনই দৈত্যাকার ল্যাংচা বানিয়ে মিষ্টির বাজারে হইচই ফেলে দিয়েছেন বছর ছত্রিশের এক উদ্যোগী। শক্তিগড়ের মিষ্টি হিসাবে আটকে না থেকে সিদ্ধেশ্বর ঘোষের ল্যাংচা এখন খাস কলকাতাতেও পাওয়া যায়। এত দামি মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি নিয়ে তাঁর কোনও চিন্তা নেই। 

বিয়ে বাড়ি থেকে জন্মদিন বা কোনও পার্টি। কেককে হটিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই জায়গা করে নিয়েছে উদ্যোগীর মস্তিষ্কপ্রসূত বিশালাকার ল্যাংচা। একদা শক্তিগড়ের আমড়া এলাকার এক ময়রার তৈরি মিষ্টি, এখন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সত্যিকারের বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে।

নয় নয় করে প্রায় তিন তিন পুরুষ ধরে ঘোষ পরিবারের এই মিষ্টান্ন ব্যবসা। বর্ধমান শহরের স্পন্দন কমপ্লেক্সের কনক সুইটস হল তাঁদের আদি দোকান। আমাদের কোনও শাখা নেই, নামের ট্যাগলাইনে আটকে থাকতে চাননি বর্ধমানের মেহেদিবাগানের এই বাসিন্দা। এখান থেকেই ধাপে ধাপে ব্যবসা বাড়িয়েছেন। তার জন্য দ্রুত পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ব্যবসায় নেমে পড়েন। প্রায় ২০ বছর থেকে রয়েছেন মিষ্টির সঙ্গে। মিষ্টি ব্যবসার জন্য তাঁর যে আলাদা মিষ্টতা রয়েছে তা প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়েছেন এই উদ্যোগী। ‘ল্যাংচা বাজার’ নামে ল্যাংচার জন্য আলাদা দোকান করেছেন শক্তিগড়ে। পাশাপাশি বর্ধমানের জেলখানা মোড় এবং রানিগঞ্জ বাজার মোড়েও তাঁর ব্যান্ড ‘ল্যাংচা বাজার’ খুলেছেন।

 শুধু বর্ধমান নয়, এই বাঙালির মিষ্টি ব্যবসা এখন কলকাতা পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে উত্তরবঙ্গেও। শিলিগুড়িতে প্রত্যেক দিন গাড়ি ভর্তি মিষ্টি চলে যায় বর্ধমান থেকে। সিধুবাবুর কথায়, ‘‘১৯৯২ সাল থেকেই আমরা বর্ধমানের ঐতিহাসিক সীতাভোগ এবং মিহিদানাকে রাজ্যস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিই। এখন প্রায় ৩০জন এই সমস্ত মিষ্টি সরবরাহের কাজে যুক্ত রয়েছেন। চাহিদা সামাল দিতে তৈরি হয়েছে ভ্রাম্যমান ‘ল্যাংচা বাজার’ গাড়ি।’’ দুটি গাড়ি চ‌ষে বেড়ায় উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ। আরও একটি গাড়িও খুব শিগগিরই বের হচ্ছে। আসানসোল, দুর্গাপুর, চিত্তরঞ্জন ছাড়াও দমদম, টিটাগড়, বাগুইহাটি, ধানবাদ এবং শিলিগুড়িতে রোজ সীতাভোগ, মিহিদানা ৮০০-৯০০ কেজি যায়। ইতিমধ্যে বিদেশেও এই দৈত্যাকার ল্যাংচা সরবরাহের চেষ্টা হয়েছে।

ল্যাংচা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় তা নিয়ে সিধু ঘোষ যোগাযোগ করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। কথা হয়েছে টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের সঙ্গেও। তবে এখনও এক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি। তা বলে থেমে থাকতে চান না এই উদ্যোগী। আরও কীভাবে তাঁর সাধের ল্যাংচা ও মিহিদানা, সীতাভোগ ‘জিইয়ে’ রাখা যায় তার চেষ্টা চলছে নিরন্তর।

সীতাভোগ এবং মিহিদানা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করার পর ২০১০ সাল থেকে ল্যাংচার বিশেষত্ব নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন সিধুবাবু। বাজারের নিয়মিত চাহিদা অনুসারে ৫, ১০, ১৫ এবং ২০টাকার সাইজের ল্যাংচা তৈরি শুরু হয়। ধীরে ধীরে ৫০ এবং ১০০টাকা পিসের ল্যাংচার চাহিদা বাড়তে থাকে। এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই শুরু হয় ২০০, ৫০০ এবং ১০০০ টাকার ল্যাংচা বানানো। ক্রমশই এই দামি ল্যাংচার চাহিদা বাড়ছে।

তবে বহরে বাড়লেও স্বাদে কিন্তু ছোট ল্যাংচার থেকে কিছুটা পিছিয়ে ৭ কেজি ওজনের এই এক হাজার টাকার ল্যাংচা। কারণ বিশালাকার (ছোট কোল বালিশের মতো) এই ল্যাংচা তৈরি করতে যেমন প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগে, তেমন তার ভিতর রসের প্রাচুর্যও কিছুটা কম থাকে। পুজোর মুখে চাহিদা বাড়ছে এক হাজার টাকার ল্যাংচার। কালীপুজো, ভাইফোঁটায় আরও জমাটি হবে বিক্রিবাট্টা। আর শীতকালে এর চাহিদা যথেষ্ট বলে জানালেন এই মিষ্টি ব্যবসায়ী। বর্ধমানের মানুষের থেকে সাড়া পেয়ে ভ্রাম্যমান ল্যাংচা বাজারের গাড়িতে কলকাতায় যাচ্ছে এই দৈত্যাকার ল্যাংচা। অনেকেই বাড়ির ছোটখাটো অনুষ্ঠানের জন্য কেকের পরিবর্তে এই ল্যাংচারই অর্ডার দিচ্ছেন। ভবানীভবন, অফিস পাড়া, টালিগঞ্জ, বেহালা, বারাসাত, সল্টলেকের মতো জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে সিধু ঘোষের এই অবাক ল্যাংচা।শক্তিগড়েই এই মুহূর্তে প্রায় ৩৫টি ল্যাংচার দোকান রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর ল্যাংচা আলাদা শুধু আকারের বৈচিত্র্যে নয়, স্বাদেও। মানের সঙ্গে কখনই সমঝোতা করেন না। কেবলমাত্র সিধু ঘোষের ব্যবসাতেই যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৮০জন কর্মী।

Related Stories