সৃজনের ঐতিহ্যেই ভরসা রাখেন পোশাকির মালকিন

0

সোমা দাস। দক্ষিণ কলকাতার মফঃস্বলের মেয়ে। বড় হয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারে। ঘরে শিল্পের একটা পরিবেশ ছিল। বিশেষ করে ছুঁচ সুতোয় পারদর্শী ছিলেন মা দিদিমা, ঠাকুমাও। আর তাই মা-দিদিমার বানানো জামা পরেই সোমা আর ওর ভাইবোনদের ছোটবেলাটা কেটে গেছে। এমব্রয়ডারি, অ্যাপ্লিক তো ছিলই, মা তার ওপর দারুণ ক্রুশের কাজ জানতেন। শীতের দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে বসে ব্যস্ত হাতে ছুঁচ সুতোয় ফুটিয়ে তুলতেন নানান কলকা। এসব দেখতে দেখতেই বড় হয়েছেন সোমা।

নিজের বুটিকে বসে এসব বলতে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলেন পোশাকির কর্ণধার। উত্তরাধিকার সূত্রে হাতের কাজের গুণ পেয়েছেন। কিন্তু কোনওদিনই বুটিক খোলার কথা ভাবেননি। বরং বরাবরই নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল সোমার।

“ভরনাট্যমে তালিম নিয়েছি সঙ্গে কনটেম্পোরারি ডান্স। শিখেছি অনিমেষ বক্সি ও কবিতা বক্সির কাছে। বরাবরই নাচকেই পেশা করব ভেবেছিলাম।” তাহলে হঠাৎ এই দিক পরিবর্তন? প্রশ্ন করার আগেই উত্তরটা দিলেন সোমা। “তখন কলকাতার এক নাম করা নাচের গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে হোলি উৎসবে অনুষ্ঠান করার জন্য নিজের পোশাক নিজেদেরই বানাতে হত। সেই কাজ করতে গিয়েই বুটিকের আইডিয়া মাথায় আসে।”

তবে ইন্ডাস্ট্রিতে কোনও মেন্টর পাননি সোমা। যা শিখেছেন ঠেকেই শিখেছেন। “বাড়িতেই কাজ চলত। প্রথম ছয় মাস শাড়ি ডিজাইন করতাম। আর পরের ছয় মাসে তা বিক্রি করতাম। পাশাপাশি চলত নাচের গ্রুপ কৃষ্টি-ও।” একবার সিঙ্গাপুরে ঘুরতে গিয়ে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নাম ভারি পছন্দ হয়। তাঁরই আদলে নিজের প্রোডাক্টের নাম দেন ‘দিসফ্যাশন’। প্রথম প্রথম রোটারি ক্লাবের মত নানা এনজিও-র সহযোগিতায় একাধিক জায়গায় প্রদর্শনী করেছেন। একবার বেঙ্গালুরুতে শিফন আর কোটা শাড়ির ওপর বাটিক প্রিন্টের প্রদর্শনী করেন। খুব প্রশংসিত হয়।

২০০৭ সালে পোশাকি নামে বুটিকটি খোলেন। তখন থেকেই পুরোদমে এই পেশায় নামা। তবে হালফিলের ডিজাইনার শাড়ি নয়, তাঁর বুটিক মূলত কনভেনশনাল শাড়ি আর হ্যান্ডলুমের ঐতিহ্যই ধরে রেখেছে। এমব্রয়ডারি, ব্লক প্রিন্ট, হ্যান্ডলুম তাঁর বুটিকের বিশেষত্ব। ডিজাইনার শাড়ির এই ফ্যাশন দুরস্ত জমানায় আদৌ কতটা চাহিদা রয়েছে কনভেনশনাল শাড়ির? সোমার দাবি, কালের নিয়মে আবার এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ির ফ্যাশন ফিরে এসেছে। আজও নিয়মিত বিয়ের নমস্কারির তত্ত্ব, পয়লা বৈশাখ বা পুজোর অগ্রিম অর্ডার পান। মুম্বই, বেঙ্গালুরু থেকে আসেন পুরানো গ্রাহকেরা।

তবে দিসফ্যাশন থেকে পোশাকির এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। “কখনও ভাইজ্যাগ, কখনও জয়পুর ছুটেছি ডিজাইনের খোঁজে। স্থানীয় হাট থেকে ভিনরাজ্য ঘুরে ঘুরে তৈরি করেছি ‘পোশাকি’র পরিচিতি। আজ তাই পোশাকি আর পাঁচটা বুটিক থেকে স্বতন্ত্র।” সোমা জানালেন, মাসে ষাট থেকে সত্তর হাজার টাকার ব্যবসা হয়। পুজো বা উৎসবের মরশুমে সেই অঙ্ক লাখ ছাড়ায়।

২০০৫ সালে নাচের গ্রুপ কৃষ্টি শেষ শো করে। তারপর স্বামী অমিতাভ দাসের গানের ব্যান্ড ফাইভ ডি-তে পাকাপাকিভাবে ‌যোগ দেন সোমা। সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি ব্যবসাও চলছে জোরকদমে। পারিবারিক প্রোডাকশন হাউসও আছে।

সোমার আক্ষেপ, নিজস্বতা হারিয়ে ‌যাচ্ছে বুটিকগুলির। সেটা ধরে রাখার জন্য অর্থের দরকার হয় না, দরকার হয় সৃজনশীলতার। কিন্তু তা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই ব্যবসায়ীদের। তাই স্টার্টআপদের সোমার টিপস শুধু ভাল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না। নিজস্বতা তৈরি করাও খুব জরুরি। না হলে অনলাইন শপিংয়ের এই যুগে অচিরেই হারিয়ে ‌যাবে ‘বুটিক’ শব্দটি।

Related Stories