চিকনকারিকে ফেরাচ্ছে মোহিতের ‘থ্রেডক্র্যাফট’

না চিকনকারি কোন ফুড ডিস নয়। সেলাইশিল্প। যা আজ দালাদের দাপটে লাটে উঠতে বসেছে। জাহাঙ্গীর নূরজাহানের প্রিয় কারুকাজের কারিগরদের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। ঐতিহ্য বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন মোহিত ভার্মা

0

ভারতের বিলুপ্তপ্রায় শিল্পগুলির মধ্যে ‘চিকনকারি’ অন্যতম। ঐতিহাসিকেরা বলেনন পৃথিবীবিখ্যাত এই শিল্পটি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ভারতে নিয়ে আসেন। কিন্তু এই সময় দালালদের দাপটে এই শিল্প রীতিমতো ধুঁকছে। শিল্পিরা তাদের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ফলে তাঁরা এই শিল্পের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন। ‘চিকনকারি’কে ফের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘থ্রেডক্র্যাফট ইন্ডিয়া’ এক অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ‘থ্রেডক্র্যাফট ইন্ডিয়া’র প্রধান মোহিত ভার্মা জানালেন ‘চিকনকারি’কে ঘিরে তাঁর স্বপ্নের কথা।


মোহিত ভর্মা
মোহিত ভর্মা

মোহিত নিজে নবাবের শহর লক্ষ্ণৌতে বড় হয়েছেন। অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। কিন্তু ব্যবসা যেন তাঁর রক্তে। তাঁর ঠাকুরদাদা ছিলেন একজন স্যাঁকরা। মোহিত ছোটবেলায় দেখেছে ‘চিকনকারির’ রমরমা। কিন্তু যত বড় হয়েছেন, দেখেছেন কিভাবে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ‘চিকনকারির’। যে ব্যবসা থেকে শিল্পিদের লাভ কমতে থাকে সেই ব্যবসা সমাজে নিজের সম্মান অচিরেই হারিয়ে ফেলে। তাই তখন থেকেই মোহিতের ইচ্ছে ছিল এই সব শিল্পীদের জন্য কিছু করবেন। একসময় সেনাদলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল মোহিতের। কিন্তু সেই ইচ্ছে তাঁর পূর্ণ হয়নি। তাতে যদিও ভেঙে পড়েননি মোহিত। সমাজের জন্য কিছু করতে বরাবরই উৎসুক ছিলেন তিনি। স্নাতক পাশ করে আইবিএম চাকরি পান মোহিত। তখন থেকেই টাকা জমাতে শুরু করেন। বরাবরই তাঁর ইচ্ছে ছিল অনেক টাকা তিনি রোজগার করবেন, তবে তা সৎপথে। তিন বছর পর গাজিয়াবাদের আইএমটি’তে চলে যান এমবিএ পড়তে। সেখানেই শুনতে পান ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স’ (টিয়াইএসএস) ব্যবসায়িক সংগঠনের জন্য কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। টিয়াইএসএস’এর অনুমতি নিয়ে মোহিত ‘চিকনকারি’র আলাদা দোকান দেন। বেশ ভালো লাভ হয় তাতে। আর দু’বার ভেবে দেখেননি মোহিত। যে মানুষগুলোর জন্য এতদিন ধরে তিনি কিছু করতে চাইছিলেন সেই সুযোগ এসে গেল। তৈরি করলেন ‘থ্রেডক্র্যাফট ইন্ডিয়া’। যেখানে কাজ করেন ২৫ জন মহিলা শিল্পী।


খরিদ্দার এবং শিল্পীদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে ‘থ্রেডক্র্যাফট ইন্ডিয়া’। যে রকম দরকার সেরকম ফেব্রিক কিনে আনা হয়, তারপর তা শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারপর তৈরি হয়ে গেলে দোকানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শিল্পীদের এর জন্য প্রত্যেক মাসে বেতন নির্দিষ্ট করা রয়েছে। ফলে মাত্র ৫ মাসের মধ্যে কোম্পানির লাভ বেড়েছে দ্বিগুণ। এছাড়াও এইসব শিল্পীদের জন্য প্রত্যেক মাসে চোখ পরীক্ষা করার উদ্যোগ কোম্পানি নেয়। প্রয়োজনে চশমাও দেওয়া হয়।

মোহিতের এই স্বপ্নকে পুরোপুরিভাবে সমর্থন করে গেছেন ডিবিএস ব্যাঙ্ক। টিয়াইএসএস’এর সমর্থনপ্রাপ্ত সংস্থাগুলিকে বরাবরই সাহায্য করে এসেছেন ডিবিএস ব্যাঙ্ক। এ রকম ৩০টি সংস্থার মধ্যে একটি ‘থ্রেডক্র্যাফট ইন্ডিয়া’। আপাতত বিভিন্ন বুটিক এবং রফতানিকারকের নিজেদের ‘চিকনকারি’র কাজ সরবরাহ করেন। বর্তমানে শিল্পী নিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে মোহিতকে। কারণ ‘চিকনকারি’র কাজ জানে এমন মানুষের সংখ্যা আজ খুবই কম। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। মোহিতের ভবিষ্যতে স্বপ্ন কোনও দোকানে বা বুটিকে কাজগুলি না পাঠিয়ে সরাসরি রফতানি করা। এতে শিল্পীদের মুনাফাও বাড়বে। বিভিন্ন এনজিও’র সঙ্গে কাজ করার কথা ভাবছেন মোহিত।