মাতৃভাষার শিকড় খোঁজেন স্বশিক্ষিত ছত্রমোহন

0

জীবনের স্কুলে স্কুলছুটদের ফার্স্টবয় হওয়ার ভূরি ভূরি গল্প আছে। শুধু গরিবগুর্বোদের দেশ গাঁয় নয়। গোটা দুনিয়া জুড়ে এমন উদাহরণ অঢেল। এরকমই এক স্কুলছুট এই গল্পের নায়ক। ছত্রমোহন মাহাত। ওঁর অবশ্য টাকার অভাবে পড়া শিকেয় উঠেছে। তাবলে পড়াশুনো থেমে থাকেনি। বরং এই কাহিনির আশ্চর্য নায়ক গোটা জীবনটাই পড়াশুনোকেই দিয়ে দিয়েছেন।

আগেই বলেছি টাকার অভাবে পড়া বেশিদূর হয়নি । পঞ্চম শ্রেণিতেই স্কুলছুট পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলপাহাড়ি ব্লকের বামনডিহা গ্রামের বাসিন্দা ছত্রমোহন মাহাত। আয় বলতে চাষবাস। তা দিয়েই কোনক্রমে সংসার চলে। ছত্রমোহন জাতিতে কুর্মি। কুরমালি তাঁর মাতৃভাষা। প্রথাগত শিক্ষা বেশিদূর না গড়ালেও মাতৃভাষার অমোঘ টানে আজ তিনি ভাষা গবেষক। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, জেলা ঘুরে ভাষাটির শিকড়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করে চলেছেন নিরন্তর।

পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পঃ মেদিনীপুর, এছাড়া ছোটনাগপুর মালভূমি, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝড়ে কুর্মি জনজাতি দেখা যায়। যদিও পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড সীমানাবর্তী এলাকার জন্য এই ভাষার সঙ্গে হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া ভাষা মিশে গেছে।

অনেকের মতে, এই ভাষা সিন্ধু সভ্যতা যুগের সমসাময়িক। এই ভাষায় যে বংশচিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় তা সিন্ধুলিপিতেও দেখতে পাওয়া যায়। তাই এমন মত। বেশিরভাগ ঝুমুর গান কুরমালি ভাষায় রচিত। কালেদিনে বাংলায় অনুদিত হয়েছে বেশ কিছু গান।

বিহার সময় মরদরা বলে
কত টাকা পারবি ?
আগুদিনেই সোব টাকাটা
ঘরকে আইনে দিবি।
আর-অ বলে, ইটা লিব-অ
উটাও দিতে হবেক,
খাইট, কাঁথা, গাড়ি, ঘড়ি
পাঁচ-শ ব্যরাত যাবেক।
লাজ শরমের মাথা খাঁঞে
বলে যে কন্ মুখে,
মরদগিলার মদ্দানিটাই
শালে যেমন ধুঁকে....

তিরিশ বত্রিশ বছর বয়স থেকেই এই কাজ করে যাচ্ছেন ছত্রমোহন বাবু। জানালেন, “যখনই কেউ প্রবাদ-প্রবচন বলত, সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখতাম। ” এভাবে একটু একটু করে কাজ এগিয়েছে তাঁর। প্রথম বই ‘মায়ামঙ্গল’ লেখার কাজ শেষ হয়েছিল বছর চল্লিশেক আগে। কুরমালি ভাষার গবেষণাধর্মী এই বইটি প্রকাশ পায় ২০১০ সালে। প্রকাশনায় ৪০ বছর দেরী হল কেন? প্রশ্নের উত্তরে ইতস্তত করছিলেন ছত্রমোহন বাবু। পরে জানালেন, এতগুলো বছর ধরে বই প্রকাশের টাকা জোগাড় করতে পারেননি। প্রশাসনের দরজা দরজায় ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও সুরাহা হয়নি। “দিন আনি দিন খাইয়ের সংসার আমার। তাতে বই প্রকাশ করার খরচ জোটানো সম্ভব ছিল না। ”

অবশেষে ২০১০ সালে বেলপাহাড়ির তৎকালীন বিডিও সুনন্দ ভট্টাচার্য্য সাহায্যে এগিয়ে এলেন। তাঁরই উদ্যোগে বই প্রকাশের ব্যবস্থা হল। চল্লিশ বছর পর স্বপ্নপূরণ হল গবেষকের।

এরপরই নড়েচড়ে বসে রাজ্যের শিক্ষা দফতর ও। ২০১৩ সালে পুরুলিয়ার সিধো কানহো বিড়শা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে এই ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা হয়। সিলেবাস কমিটিও গঠিত হয়। কিন্তু সেই হেলদোল ছিল সাময়িক। আজ পর্যন্ত পাঠ্যক্রম শুরুই হয়নি। ২০১৫-র ১৫ সেপ্টেম্বর তথ্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে গবেষক স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাঁকে।

ছত্রমোহন বাবু জানালেন, কুরমালি ভাষা নিয়ে চর্চা করার ইচ্ছা রয়েছে এই জাতির যুব সম্প্রদায়ের মধ্যেও। কিন্তু তারা সুযোগ পাচ্ছে না। উপরন্তু এই ভাষায় কোনও সরকারি কাজও হয় না। ফলে পেটের টানে মাতৃভাষার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন কুর্মি জনজাতির মানুষই।

ছত্রমোহনবাবুর দ্বিতীয় বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। মূলত কবিতার বই। নাম ‘ মহুল কঁঢ়ির মহক ’। বন্ধু দীপক মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় বইটি দিনের আলো দেখেছে । দীপকবাবু হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁর এই দ্বিতীয় বইটির কবিতাগুলি ইংরাজিতে অনুবাদের কাজও শুরু করেছেন রায়পুরের জনৈক ইংরাজির শিক্ষক।

ছত্রমোহনবাবুর দুটি বইই বইমেলায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বই বিক্রি করে লাভ করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। ভাষাটি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই তাঁর লক্ষ্য। ফলে নামমাত্র দামেই স্থানীয় এলাকায় বই দুটি বিক্রি করেন তিনি।

আপাতত কুরমালি ভাষার শব্দকোষ তৈরির কাজ হাতে নিয়েছেন। কিন্তু চিন্তা সেই আর্থিক জোগান। বলছিলেন, “এ ব্যাপারে বিভিন্ন সরকারি মহলে জানিয়েছি। কোনও লাভ হয়নি। এমনকী, কালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কাছেও গিয়েছি। তাঁদের যুক্তি, এটি আদিবাসী ভাষা নয়, তাই সাহায্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ”

১৯৩১ সাল পর্যন্ত কুর্মি জনজাতি তফসিলি উপজাতিভুক্ত ছিল, বর্তমানে তাঁরা ওবিসি ভুক্ত। ছত্রমোহনবাবুর আশঙ্কা, মূলত সীমান্ত এলাকার ভাষা হওয়ায় বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দি ভাষার দাপটে হয়তো একদিন লুপ্ত হয়ে যাবে কুরমালি। তা রুখতেই নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সত্তরোর্ধ এই গবেষক। অন্তরায় অর্থ। তাই যদি কোন সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁকে এই কাজে সাহায্য করতে চান তবে দয়া করে যোগাযোগ করবেন এই নম্বরে, ছত্রমোহন মাহাত—৯৫৪৭৭০০৩৫৬।