লুপ্তপ্রায় ‘ফুল-পট্টি’, শিখার দৌলতে স্টাইল স্টেটমেন্ট

0

ভারতের ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্ম বা এমব্রয়েডারিকে মূল ধারায় নিয়ে আসা খুব একটা সহজ ছিল না। শিখার ‘নূর তারা ক্রিয়েশন’ সেটাই করে দেখিয়েছে।‘ফুল-পট্টি’র আলিগড়ি এমব্রয়েডারি করা শাড়ি, জামা, সালোয়ার কামিজ নানান ধরণের পোশাক তৈরি করে ‘নূর তারা ক্রিয়েশন’।দেশীয় কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা বিরাট চ্যালেঞ্জ।একদিকে সারা বিশ্বের নানা রকম নিত্য নতুন স্টাইলের ডিজাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে কাজ জানা কারিগর যথেষ্ট সংখ্যায় পাওয়াও যায় না।সাধারণত সামাজিক নানা বাধায় পুরপুরিভাবে এই কাজকে পেশা হিসেবে নিতে পারেন না অনেকে। আবার নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, বেশি বেতনের আশায় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে ছেড়ে সোদিকে ঝুঁকছেন একটা বড় অংশ। এত প্রতিকূলতাতেও দমে যাননি শিখা। তাঁরএই জেদই ‘নূর তারা’কে শক্ত জমি দিয়েছে। দেশের বড় বড় রিটেলার বা খুচরো বিপনিগুলির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ‘নূর তারা’র পোশাক পৌঁছে গিয়েছে দেশের নানা প্রান্তে।তাঁর অধ্যাবসায় ন্যশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি(NIFT)কে টেনে এনেছে আলিগড়ে, এই ভারতীয় এমব্রয়েডারি শিল্প সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে।এবং তিনি বিশ্বাস করেন এখনও অনেক পথ চলা বাকি।

‘নূর তারার বেড়ে ওঠার রহস্য লুকিয়ে আছে সম্পর্ক তৈরি করা এবং সেটা ধরে রাখার মধ্যে’,বলেন শিখা। ১০ বছর আগে যে শিল্প লুপ্ত হয়ে গিয়েছে সেই ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সূচিকর্মকে ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তখন। তাঁর প্রেরণার পেছনে ছিলেন আরও এক মহিলা, রেণুকা বাজাজ, আলিগড়েরই এক বাসিন্দা। ২০০০ এর শুরুতে তাঁর হাত ধরেই ‘নূর তারা’র চলা শুরু। আর তাঁরই উৎসাহে ‘নূর তারা’ ব্র্যান্ডের পোশাকের মাধ্যমে আলিগড়ি এমব্রয়েডারির বড় বাজার তৈরি করা শুরু হয়েছিল।উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে ওপড়ে উঠতে গেলে প্রয়োজন কাজের প্রতি অসম্ভব একটা আবেগ। শিখার ক্ষেত্রে তার কোনও অভাব ছিল না। শুরুর সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায় শিখার। সবার মনে ধরবে এমন কিছু একটা করতে গিয়ে তিনি এবং রেণুকা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতেন। ‘নতুন হোক বা পাকা হাতের কাজ, দুটোই আজও আমাকে সমানভাবে উজ্জ্বীবিত করে, ভালো লাগে যখন দেখি অদ্ভুত সুন্দর সব নিত্য নতুন ডিজাইন প্রতিদিন আসার অপেক্ষায় রয়েছ’,বলেন শিখা।


প্রথমদিকে দিল্লিতে নানা প্রদর্শনীতে ‘নূর তারা’র তৈরি মহিলাদের পোশাক বিক্রি নিয়ে বাধা নিষেধ ছিল।২০০০ মাঝামাঝিতে এল সুযোগ।‘নূর তারা’ তাদের এমব্রয়েডারি করা জামা কাপড় বড় বড় খুচরো বিপণী বা রিটেল চেইনে ঢোকাতে থাকল।এর ফলে শুধু ব্যাবসা বাড়লই না একটা তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্মকে সারা দেশে ক্রেতাদের কাছে পরিচিতি দিতে থাকল।একজন ক্রেতার কাছ থেকে অন্য ক্রেতা, এভাবে অন্যদিক দিয়ে ব্যবসা বাড়ার রাস্তা তৈরি হচ্ছিল।একই সঙ্গে নূর তারার মূল যে ব্যবসা নানা প্রদর্শণীতে পোশাক বিক্রি, সেটাও ধরে রাখল। ব্যবসা য‌খন বাড়ছে নবাগত শিখার সেই সময়টা খুব একটা সহজ ছিল না। একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।শিখা ব্যবসার রাশ ধরার পর একটা বড় বরাত পেলেন। অল্প সময়ের মধ্যে কাজটা শেষ করতে হবে।মান বজায় রেখে কম সময়ে বেশি কাজ বের করে আনা তাঁর কাছে বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।শিখার মনে পড়ে প্রায় সারাদিন কাজ করতেন ঠিক সময় সঠিক মানের কাজ ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ‘উদ্যোক্তা হিসেবে এটা আমার কাছে বড় শিক্ষা ছিল’, তিনি বলেন। সেই অভিজ্ঞতা শিখাকে উদ্যোক্তা হিসেবে আরও আরও বেশি দক্ষ করে তুলছিল,সাহস জুগিয়েছিল আরও বড় কাজে হাত দিতে।

সব ব্যবসার মতো নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে শিখার ব্যবসাতেও ওঠা পড়া আসে।তাঁর মেন্টর রেণুকার যদি পুরনো ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্ম নিয়ে ভালো জ্ঞান থাকে,তবে শিখা ছিল আধুনিক ফ্যাশন সম্পর্কে দারুণ ওয়াকিবহল। আধুনিক চিন্তা ভাবনা এবং নানা আইডিয়ায় ভর্তি শিখার অন্য ভাবনা এল।পুরনো ধারা নতুন ধারা মিলিয়ে ফিউশন কেমন হয়? প্রথম দিকে নতুন ডিজাইন একেবারেই গ্রহণযোগ্য হল না।ক্রেতারা ‘নূর তারা’র কাছ থেকে যেমন আশা করে তার ধারকাছ দিয়েও গেল না। কিছু কিছু তো একেবারেই পাতে দেওয়ার মতো নয়। হাল ছাড়ার প্রাত্রী নন শিখা। ব্যবসা ধরে রাখতে রাস্তা বদলালেন। এবার যৌথ প্রক্রিয়া বেছে নিলেন। অর্থাৎ আলিগড়ের কারিগররা যে ডিজাইন দিচ্ছিলেন তার সঙ্গে পেশাদার ডিজাইনারদের পরামর্শও নিতে থাকলেন।পরিস্থিতি আমূল বদলে গেল। ‘নূর তারা’ থেকে ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তখন ইতিহাস।শিখা বলেন, সবসময় খোলা মনে পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হবে।বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকেও বদলানোর প্রবল ইচ্ছে থাকতে হবে।

কারিগরদের তিনি শুধু কর্মীই ভাবতেন না, তারাই শিখার ভরসার জায়গা, যারা দুর্দিনে তাঁর পাশে ছিলেন। বেশিরভাগই মুসলিম মহিলা ‌যারা আংশিক সময়ের কর্মী ছিলেন তাদের মধ্যে ২০০ জনের ওপর মহিলাকে তিনি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।তারা যাতে ঠিকমতো টাকাপয়সা পান,সময়মতো কাজ যাতে ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য সেই মহিলাদের মধ্যে থেকেই কয়েকজনকে ব্যবস্থাপনার কাজ দেখার ভার দেন, অন্যান্য জায়গায় ঠিকাদারেরা যেটা করে থাকেন। শিখা মনে করেন,’নূর তারা’র প্রতি কর্মীদের যে অসীম দায়বদ্ধতা এটাই তার একটা কারণ। মহিলা যারা ব্যবস্থাপনা বা দেখভালের দায়িত্ব পেলেন,তাঁদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে ক্ষমতায়ণ বোধ কাজ করতে থাকে। যার ফলে আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে যায়।মহিলাদের মধ্যে এই উৎসাহটারই প্রশংসা করেন শিখা। পরিবারে যেহেতু পুরুষরা রুটি রুজির ব্যবস্থা করেন,তাই যে মহিলারা এখানে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগের এটাই একমাত্র রোজগারের পথ নয়।তারপরও কাজের প্রতি কর্মীদের একটা বিরাট দায়বদ্ধতা রয়েছে।এদের মধ্যে অনেকে আছেন যাদের বাড়ি থেকে কাজ করা নিয়ে নানা আপত্তি।বাড়ির বাধা সত্বেও মহিলারা কাজ করছেন নিজেদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া পূরণ করবেন বলে।এই ভরসাটাই মহিলাদের শক্তি দেয়। তাদের কাজ করতে দেখে প্রেরণা পান শিখা নিজেও। কারিগররাই তাঁর ভরসা।পরস্পরের মধ্যেসহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।কারিগরদের নিজের সংস্থার কর্মী নয়, সহকর্মী হিসেবে দেখতে চান শিখা।

ব্যক্তিগতভাবে পরিবারই শিখার বড় ভরসা।পরিবার থেকে যা শিখেছেন,ব্যবসার উন্নতিতে সেটাই কাজে লাগিয়েছেন।একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা তাঁকে একসঙ্গে চলার শিক্ষা দিয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও সেটাই প্রয়োগ করেছেন।যদি তাঁর রোজগার ভাল হয়,সংস্থার বাকিদেরও উন্নতি হবে।শুরু থেকেই এই মানসিকতা ছিল।মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া এবং অন্যকে তাঁর প্রতি সৎ এবং স্বচ্ছ থাকার জায়গা করে দিয়েছে তাঁর এই স্বভাবই।

উদ্যোক্তা হিসে বেশ কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে শিখা মনে করেন, অনেক মহিলা ব্যবসা শুরু করতে পারেন।‘ব্যবসায় সুযোগের শেষ নেই’, বলেন শিখা। ‘ভুল করুন, আবার নতুন করে করুন। একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে, কোনও বাধাকেই সামনে দাঁড়াতে দেবেন না’,যোগ করেন শিখা। তিনি বলেন, অনেক গৃহবধূ আছেন যাদের ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার পর অখণ্ড অবসর।নিজের কিছু একটা শুরু করার এটাই একদম ঠিক সময়।

নানা স্তরের মানুষের চাহিদা মটাতে শিখা তাঁর সংস্থার পোশাক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। একটা শোরুম খোলার ইচ্ছে আছে।ফুল-পট্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং কারিগরদের উৎসাহ দিতে তিনি চান শুধু মহিলারাই তাঁর সঙ্গে কাজ করাবে না বরং পুরুষরাও এই সূচিকর্মকে পেশা হিসেবে নেবেন,যা শুধু মহিলাদের জন্য তুলে রাখা আছে।