‘ফলফুল’-এ অর্ডার করলেই মেনু প্ল্যানার মুফতে

1

প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনও ব্যবসা শুরুর পেছনে কিছু না কিছু একটা কাহিনী থাকে। সুনীল সুরির যেমন ব্যক্তিগত জীবনে বিরাট ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসায় নেমে পড়া। সুনীলের মা মারা গিয়েছিলেন ক্যান্সারে। আর বাবা ডায়াবেটিসে।এখন ভাবেন যদি বাবার ডায়েটচার্টটা নিয়মিত নজরে রাখা যেত তাহলে হয়ত আর কিছু দিন বেশি বেঁচে থাকতে পারতেন। স্বদেশ মেনু প্ল্যানার, সুনীলের এই অ্যাপ্লিকেশন তৈরির পেছনে ছিল নিজের আবেগ এবং বাবাকে হারানোর দুঃখ। এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে যে কেউ নিজের ডায়েটচার্ট আপলোড করতে পারেন এবং ডায়েটেশিয়ান সেই ডায়েটচার্ট দেখে প্রয়োজনে কিছু পরিমার্জনও করতে পারেন। ২ মাসের মধ্যে তিনি এই অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপ করেন। অথচ ৬ মাসে এই ফ্রি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি যখন আর বদলালোই না, সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন সুনীল। তবে খাবার এবং স্বাস্থ্য সবসময় তাঁর উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখন মেনু প্ল্যানারের বদলে ফল এবং সবজি বিক্রি করেন সুনীল। আর ক্রেতাদের বিনামূল্যে মেনুপ্ল্যানার বিলোন।

তিনি জানেন, ফল-সবজি বিক্রি বেশ পুরনো আইডিয়া, প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে কতজন হারিয়ে যায়। সুনীল ঠিক করলেন ইনভেন্টরি মডেলে(পন্যের তৈরি তালিকা) যাবেন না, তাতে ক্ষতিই বেশি। যখন বেশিরভাগ স্টার্টআপ দিনেরটা দিনেই ডেলিভারি দিচ্ছে, সুনীল করলেন ঠিক তার উলটোটা। ২০১৫র জুনে ফলফুল নামে অনলাই প্ল্যাটফর্ম লঞ্চ করেন। বিকেলে ফল এবং সবজির অনলাইন অর্ডার নিয়ে পরদিন সকালে সেগুলি পৌঁছে দেন উত্তর-পশ্চিম দিল্লির গৃহস্থের দোরগোড়ায়। ‘এই পদ্ধতিতে ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই লাভবান হন। বিক্রেতার কোনও জিনিস পড়ে থেকে নষ্ট হয় না। চাহিদা বাড়তে থাকায় ওষুধ, গাছ, মুদিমালও সরবরাহ করতে শুরু করি’, বলেন বছর চল্লিশের সুনীল সুরি, ফলফুলের প্রতিষ্ঠাতা। মাত্র ৬ মাসে ৩০০০ কাস্টমারের কাছে অর্ডার করা পন্য পৌঁছে দিতে সমর্থ হয় ফলফুল। প্রতিদিন গড়ে ৪৫টি করে অর্ডার পড়ে। সুনীলের দাবি, তাঁর ভেঞ্চারই একমাত্র প্ল্যাটফর্ম যেটি ফল, সবজি, গাছের চারা, ওষুধ এবং মুদিমাল নিয়ে সম্পূর্ণ সলিউশন দেয়। এখনও পর্যন্ত ৭ থেকে ৮ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। দিনে প্রায় ২০,০০০ হাজার টাকার লেনদেন। ‘ক্রেতা ধরতে লিফলেট ছড়ানো এবং লোকের মুখে মুখে প্রচারের ওপরই ভরসা করি। এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর’, বলেন সুনীল।

গ্রাহকদের দাবিতেই ২০১৫র নভেম্বরে নানা ধরনের গ্রাহকের জন্য নানারকম ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করে ফলফুল। ‘তার আগে পর্যন্ত কোনও অফার বা ডিসকাউন্টের কথা ভাবিনি। মাথা খাটিয়ে ২২টি প্যারামিটার বের করে গ্রাহকের ওপর ভিত্তি করে জিনিসপত্রের দাম ঠিক করে দিই’। এই পদ্ধতিতে প্রায় বিপ্লব ঘটে যায়। ৭৪ শতাংশের বেশি অর্ডার ঘুরে ঘুরে আসছিল। শুধু তাই নয়, সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছিল।

ভারতের খুচরো বাজারের ৬০ শতাংশই মুদির দখলে। কারণ খাবারই হল মানুষের মূল প্রয়োজন। ভারতে খাবার এবং মুদির ব্যবসা ৩৮৩ বিলিয়ন ডলারের। টেকনোপার্কের সমীক্ষায় ২০২০তে এই ব্যবসা ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছোঁবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে যারা লিডরোলে রয়েছে তারা হল-বিগবাস্কেট, জপনাও, গ্রুফারর্স, পেপারট্যাপ এবং জুগনো। ভারতের প্রথম সারির পাঁচটি অনলাইন গ্রসারি স্টার্টআপ ১৭৩.৫ মিলিয়ন ডলার বাজার থেকে তুলেছে। তার মধ্যে শুধু গত বছরই উঠেছে ১২০ মিলিয়ন ডলার। বিগবাস্কেট তুলেছে ৮৫.৮ মিলিয়ন ডলার এবং গ্রুফারর্স ৪৫.৬ মিলিয়ন ডলার। জায়েন্টদের সঙ্গে লড়ে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় তার উত্তরে সুনীল বলেন, বড় খেলোয়াড়রা বিনিয়োগকারীদের টাকায় যেমন ব্যবসা করছে তেমন খরচও করছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সুনীলের টাকা ওড়ানোর জায়গাই নেই। লাভক্ষতিতেই ব্যবসা চলছে। জানুয়ারিতে ব্রেকইভেনে পৌঁছবেন বলে আশা তাঁর। ‘এই মডেলেই আমরা ব্যবসা করছি। আমরা পরদিন পন্য পৌঁছাই গ্রাহকের কাছে। দিনের দিন ডেলিভারি করতে হলে ৪৫ টাকা করে চার্জ নিই’, বলেন সুনীল।

সম্প্রতি ফলফুল কিছু ছোট এবং মাঝারি মুদির দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এই স্টোরগুলি নানা অফার দেয়। খুব শিগগিরই ফলফুলের মাধ্যমে এই অফার পাবেন ওয়েবসাইটের গ্রাহকরা। কিছুদিন আগে ফলফুল রেসিপি শেয়ারিং সেগমেন্ট লঞ্চ করেছে। স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরির রেসিপি দেওয়া হয় এখানে। ২০১৬র জুনের মধ্যে দিল্লি, গুড়গাঁও এবং নয়ডাতে ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ফলফুল যেহেতু গ্রাহকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে, এই সুযোগে মেনু প্ল্যনার আরেকবার লঞ্চ করার ইচ্ছে আছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেটাও সেরে ফেলব। তাতে আরও ভ্যালু অ্যাড হবে ফলফুলে’, বলেন সুনীল।

লেখক-তৌসিফ আলম

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস