গেমসে প্রেম Flirtual Reality

0

বাচ্চা থেকে বুড়ো, কম্পিউটার গেমসে বুঁদ। অ্যাপস, ওয়েবসাইট নির্ভর ফাস্ট লাইফে গেমসে হাত পড়েনি এমন লোকের দেখা মেলা ভার। গেমস আসলে ভারচুয়াল রিয়েলিটি। সত্যি অথচ সত্যি নয়। জয়স্টিক বা মাউসের কন্ট্রোলে মেসি-রোনাল্ডোর পা থেকে দুরন্ত গোল, টান টান উত্তেজনা, ঠিক যেমন হয় রিয়েল-বার্সা ম্যাচে। স্পাইডারম্যান-ব্যাডম্যান-সুপারম্যানদের নানা মিশন, প্রতিপক্ষ কম্পিউটার। এমনকী রোমহর্ষক হরর গেমস। কিন্তু গেমসে প্রেম! তাও কী সম্ভব!

ভারচুয়াল রিয়েলিটিতে ডেটিং অথবা ফ্লার্ট কখনও ভেবেছেন কী? সেটা যদি আবার গেমস হয়? আপনি কি মনে করেন ভারচুয়াল রিয়েলিটিতে প্রেম প্রেম খেলতে গিয়ে রিয়েল লাইফে রোমান্স তৈরি হবে? বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এটাই TrulySocial গেম অ্যাপ Flirtual Reality এর প্রেক্ষাপট।

বছর পাঁচেক আগে সেবাস্টিয়ান কোমেনের মাথায় Flirtual Reality এর আইডিয়া আসে। তখন স্যোশাল গেমসগুলি ঘিরে উন্মাদনা তুঙ্গে। বাজারে যখন স্যোশাল গেমসের বন্যা, সেবাস্টিয়ানের কিন্তু মনে হয়েছিল গেমসগুলি বড্ড একঘেয়ে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই রকম। তিনি জানতেন, এই গেমসগুলিতে বিরক্ত হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। তখন নতুন গেমসের খোঁজ পড়বে। এই গেমসগুলি পুরনো হয়ে যাবে। সেবেস্টিয়ানের মাথায় ভারচুয়াল রিয়েলিটিতে ডেটিংয়ের আইডিয়াটা একেবারে গেঁথে দিয়েছিল চারপাশে দেখা ডেটিংয়ের ভান বা প্রেমের ভান। সামাজিক বিষয়গুলি গেমসে আনার কথা কেউ ভাবেনি তখনও। সেখান থেকেই ভারচুয়াল কাপলদের মধ্যে রোমান্টিক এনকাউন্টার নিয়ে গেমস বানানোর আইডিয়া আসে। কাপলদের মধ্যে যা যা ঘটতে পারে সবকিছু এই থ্রি ডাইমেনশনাল ওয়ার্ল্ড ফরম্যাটে পাওয়া যাবে।

সেবাস্টিয়ান তাঁর আইডিয়া নিয়ে সেলোন সিঘালের কাছে যান। সেলোন তখন বার্কলে ব্যাঙ্কের ভাইস প্রিসডেন্ট। ‘হঠাৎ করে ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং TrulySocial তৈরিতে তাকে সাহায্য করতে আমার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেবাস্টিয়ান দেখতে চেয়েছিল। এমন সম্ভবনার এবং তুলানাহীন প্রস্তাব, আমি আর দেরি করিনি, লুফে নিলাম’, জানান সেলোন। সেবেস্টিয়ান খুব দ্রুত আমারিকার ডেভেলপারদের সাহায্যে প্রাথমিক এমভিপি(মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার বা যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে)তৈরি করে নেন। সালোন জানতেন, ভারতে তাঁর যোগাযোগ ভারতীয় ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কতটা কী খরচ পড়বে সেসব ঠিক করা সহজ করে দেবে। ‘ভারতে আমরা একটা আউটসোর্স (সংস্থার বাইরের লোকদিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া)টিম খুঁজছিলাম। সৌভাগ্যবশত ঠিক লোক পেয়ে যাই। আউটসোর্সে ঝুঁকি থাকেই। আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু দারুণ ছিল। গেমসে দুজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক ভারতে দলটাকে এগিয় নিয়ে যান, যারা একদল প্রতিভাবন শিল্পী এবং ডেভেলপারকে কাজে লাগিয়েছিলেন’, জানান সালোন। TrulySocial আদতে ব্রিটেনের সংস্থা,যার হেডকোয়ার্টারও ব্রিটেনে, কিন্তু আসল কাজ লন্ডন এবং ভারতের মধ্যে ছড়ানো। টিম বিশ্বাস করে, গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন হলেও বড় বড় রাঘব বোয়ালদের সঙ্গে লড়ে TrulySocial ধীরে ধীরে পায়ের ছাপ রাখতে শুরু করেছে। দুজনের দল থেকে নয় জনের দল হয়েছে। আরও সংযোজনের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থা।

নতুন জগতে পা রাখার বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ সবসময় থাকে। সালোন জানান, প্রতিযোগিতার ধারে গেমস তৈরির ক্ষেত্র ইতিমধ্যে কঠিন হয়ে উঠেছে যেহেতু এখানেও উদ্যোক্তাদের ভিড় বাড়ছে। তিনি যোগ করেন, টিমকে সবচেয়ে বেশি যে চ্যালেঞ্জটার মুখোমুখি হতে হয় সেটা হল একঘেয়েমি। ‘গেমসে নতুন ধরন আনতে প্রয়োজন রিসোর্স, সাহস এবং সবচেয়ে জরুরি হল সময়’, বলেন সালোন। অনেক বিনিয়োগকারী জায়গটা ঠিকমত না বুঝেই টিমকে বলে দেয় তারা অনেক সময় নিচ্ছে। তাদের ছন্দ ঠিক লাগছে না এবং এমন ডেভেলপারকে তারা চেনেন যিনি ৩ দিনে গেমস তৈরি করে দেবেন। ‘তাঁরা হয়ত জানেন না ইলেকট্রনিকস আর্টের ফ্র্যাঞ্চাইজি দ্য সিমস তৈরি করতে ৬ বছর সময় নিয়েছিলেন উইল রাইট। অথবা অ্যাংরি বার্ডসের ৫১টি গেমস যেগুলি ওই নামে আসার আগেই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সেটি তৈরির পেছনে যারা কাজ করছিলেন তাদেরও চেনেন না। টেক ওয়ার্ল্ডে গেমস তৈরি করাই হল সবচেয়ে কঠিন যেহেতু, গেমস বিনোদনের অংশ’, যোগ করেন সালোন।

সাবেস্টিয়ান কোমান, প্রতিষ্ঠাতা, TrulySocial
সাবেস্টিয়ান কোমান, প্রতিষ্ঠাতা, TrulySocial

‘ফ্রি টু প্লে মাবাইল গেমস চালু হওয়ায় একটা সুবিধা হয়েছে। ইউজারের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায় এবং আরও বিস্তৃত জায়গায় গেমসকে ছেড়ে দেওয়া যায়। আকর্ষণ দেখে বুঝতে পারি আমরা এমন একটা কিছু তৈরি করেছি যার আবেদন রয়েছে এবং আমাদের ইউজাররা সেটা পছন্দও করছেন’, বলেন সালোন।

টিম এবার পরের রাউন্ডের জন্য পুঁজি সংগ্রহ শুরু করেছে। লক্ষ্য ছিল, নতুন ধরনের মজাদার বিশেষ করে রোমান্টিক এনকাউন্টারের মধ্যে দিয়ে গেমিং অভিজ্ঞতা তৈরি করা। কারণে বাজারে এমন নতুন থিমের আর একটাও গেম নেই। সালোন বলেন, গেমসে দৈত্য মেরে দেওয়া যায়, কল্পনার পুতুল-বাড়ি তৈরি করা যায়, খেলা যায়, বহু অবতারকে হারিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু সম্পর্ককে খেলায় পরিনত করার কথা কেউ কখনও ভাবেনি। ‘ডেটিং অ্যাপে রয়েছে বিপরীত লিঙ্গের কারও কাছে ঠিক কথাটা বলতে পারার লড়াই। প্রযুক্তি আমাদের যতটা কাছে আনে ততটাই দূরে সরিয়ে দেয়। এইসময় Flirtual Reality তাই যথেষ্ট প্রসঙ্গিক’, বলেন সালোন। Flirtual Reality থাকে ফ্রি গেমসের সঙ্গে ডেটিংয়ের নানা কথাপোকথন, যোগ করেন সালোন। টিম TrulySocial চেষ্টা করে সামাজিক আলাপচারিতা, বিয়ের আগে প্রেম, আচরণগত মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ু বিজ্ঞানকে গেমসের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। এই গেমসে আপনি অবতার হিসেবে থ্রি-ডি জগৎ এ ঢুকে নানা চরিত্রের সঙ্গে প্রেমের ভান বা ফ্লার্ট, কথাপোকথন চালাতে পারেন। Myers – Briggs ব্যক্তিত্ব নির্দেশকের মাধ্যমে আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাই দিয়ে গেমস আপনার ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলবে। নিউরো বিজ্ঞানী এবং গেমস ডেভেলপাররা এই চরিত্রগুলি তৈরি করেছে বাস্তব ডেটিং সায়েন্স থেকে। ৯০ হাজার লাইনের ধারাবাহিক বর্ননার মাধ্যমে প্রত্যেক প্লেয়ার তার নিজের গল্প তৈরি করতে পারে এবং একই কথোপকথন দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না। যত বেশি ভলো কথাপেকথন চালিয়ে যাওয়া যাবে তত বেশি হাগ (আলিঙ্গন) ঝুলিতে জমা হবে। যত ভালো ফ্লার্ট হবে তত দ্রুত এগোন যাবে। আর নম্বর জমা হবে ছোট কালো খাতায়(‘Little Black Book’)। নম্বর জমা হলেই প্যারিস, স্পেন আরও কত সব মজাদার জায়গায় ডেটিংয়ে যাওয়ার সুযোগ। ‘খুব শিগগিরই আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কের খেলা তৈরি করতে যাচ্ছি’, জানান সালোন।

টিম TrulySocial বলে, ইতিমধ্যে ভারতসহ সারা বিশ্বে ভালই সাড়া ফেলেছে Flirtual Reality। মূল ১৮ থেকে ৩০ বছরের মহিলারা বেশি পছন্দ করছেন এই গেমস। যারা খেলছেন তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশই মহিলা। সালোন জানান, গড়ে

২৫ থেকে ৩০ মিনিট ধরে খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে মোবাইলের জন্য কম খরচে ভারচুয়াল রিয়েলিটি ডিভাইস নিয়ে আসার প্ল্যান রয়েছে। এর ফলে আরও অনেক বেশি ইউজারকে ফ্রি-টু-প্লে গেমস দেওয়াসম্ভব হবে। টিম বিশ্বাস করে এত ভাল থ্রি-ডি ইন্টারফেসের মাধ্যমেই সারা বিশ্বে কাঁপিয়ে দেবে এই গেমস। ভারতেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ‘খুব দ্রুত প্রযুক্তিকে গ্রহণ, স্মার্টফোন আর ট্যাবলেটের ছড়াছড়ির কারণে ডেটিং অ্যাপসের বৃদ্ধি বিস্ফারণ ঘটাবে’, আশা সালোনের।

টিম এবার আর্থিক দিকটাও নজরে রাখছে। তাদের লক্ষ্য ইউজারদের ধরে রাখা এবং সেখান থেকে উপার্জনের রাস্তা তৈরি করা। তাই গেমস বিক্রির দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিকল্পনা রয়েছে যারা গেমন পছন্দ করছে তাদের মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশকে গেমস কিনিয়ে দেওয়া। ‘যেকোনও জায়গায় আমাদের গেমসের উপর গড়ে৮ থেকে ১২ ডলার খরচ করছে অনেকে। কেউ কেউ ১০০ডলারও খরচ করে ফেলেন। ভার্চুয়াল অর্থনীতিতে এটা ভালো লক্ষণ’, যোগ করেন সালোন।

গতবছর ভালোই হয়েছে।এই বছর আবার নতুন করে পুঁজি ঢালা হয়েছে। ‘আমরা জানি নতুন ধরনের প্রডাক্ট নিয়ে বিশ্বে এবং স্থানীয়ভাবে বৃদ্ধির ভালো জায়গায় রয়েছি আমরা। বাজারে পছন্দ করছে এমন প্রডাক্ট তৈরি করে ফেলেছি, খরচও একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। পুঁজি একটু বাড়লেই মডেলটা আরও উন্নত করব’, শেষ করেন সালোন।