দীপাঞ্জনদের ফিরিয়ে আনাটাই কলকাতার কাছে BigDeal

YIBEAL মানে Yes It is a Big Deal...ভাবছেন তো BigDeal ব্যাপারটা কী! আমি বলি, আপনিও বরং ভাবুন...। 

0

ভাবুন আপনি ইউএসএ তে দারুণ জমিয়ে দিয়েছেন। বিশাল চাকরি করেন। প্রতি মাসে ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাড়ির সামনে সকলের ঈর্ষা জাগানো গাড়ি। দুর্দান্ত ফারনিশ্‌ড ফ্ল্যাট। ড্রয়িং রুমে নরম সোফা। দেওয়াল জোড়া পেল্লায় হোম থিয়েটার। জানালার কাচে নীল সাদা বরফ। আপনার দুনিয়া সেখানে সেট। উইক-এন্ড-এ পার্টি। একটা ছোট্ট ফ্রেন্ড সার্কেল। ভারতীয় বন্ধুদের একটা ক্লাব। গত বেশ কয়েক বছর আপনি দেশে ফেরার সময় পাননি। তবু ভারত নিয়ে অতি চিন্তিত। বাবা মা থাকেন, তার থেকেও বড় কথা এখানেই তো বড় হয়ে ওঠা। কথায় কথায় বলেন দেশটার কিচ্ছু হবে না। আপনার পকেটে ডলার দুমড়ে থাকে। তুলনায় অনেক হালকা ভারতীয় দশটা টাকার নোট আপনি যত্ন করে রেখে দিয়েছেন বুকমার্ক করে। ভীষণ নস্টালজিক সেই স্মৃতি। ওই টাকাটাই আপনাকে দুর্গা পুজোর কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আপনার বৈভব, সাফল্য আপনাকে অলস করে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন আপনি এমনি এমনি ঘামেননি। ঘামতে ভুলে গেছেন। মাথাও ঘামাতে চান না। অভ্যাসের মত হয়ে গিয়েছে খাওয়া, অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছে জীবন। অতি সরল সেই রেখা। অতি অলস। মার্কিন মুলুকেই আপনি শেকড় বাকড় ছড়িয়ে দিব্যি happy go lucky টাইপ। এমন সময় আপনি ভাবলেন আপনি ফিরবেন...।

পরিশ্রমী পৃথিবীতে ফিরে আসবেন আপনি। যেখানে নিশ্চয়তা একটি পরা-বাস্তবতা Surrealism। যেখানে সাফল্য পেতে রীতিমত কুস্তি করতে হয়। কুস্তি...struggle, তাও আবার প্রতিযোগীর সঙ্গে নয়, পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে, মানসিকতার সঙ্গে এবং সব থেকে বড় কথা তাদের সঙ্গে যাদের কাছে আপনার উন্নতি আপনার সাফল্যের কোনও তাৎপর্য নেই। তবু আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন। আপনি ফিরবেন। স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে তল্পি তল্পা গুটিয়ে আপনি ফিরে এলেন। আপনার নিজের কাছে। নিজের চেতনার কথা শুনে। যেন আপনি বলছেন,  ‘আমি সব দেবতারে ছেড়ে/ আমার প্রাণের কাছে চলে আসি, / বলি আমি এই হৃদয়েরে: / সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!...’

হ্যাঁ কলকাতার কাছে এটা একটা BigDeal-ই বটে।

তবে দীপাঞ্জন পুরকায়স্থর কাছে ফিরে আসার আরও একটা মাহাত্ম্য ছিল। সেটা হল এই কলকাতার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করা। আমরা জানব দীপাঞ্জনের কথা তার আগে শুনে নেব আরও একটা BigDeal এর গল্প।

একটি ছেলে, ভীষণ প্রতিভাময়, পড়াশুনোতেও বেশ ভালো। বাবা মার নয়নের মণি। বাবা মা তাঁকে আঁকড়ে ধরেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে পরিবারের সকলের point of attention। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিল চেন্নাই। মাসে মাসে বাবা টাকা পাঠান। প্ৰথম দিকে হস্টেলে থাকতেন। কী মনে হল বন্ধুদের সঙ্গে একটা রুম ভাড়া করে থাকার কথা ভাবলেন। রুম ভাড়া করতে এক বাড়ির দালালের চক্করে পড়ে যান। প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন তখন। অপরিচিত শঠ মানুষের ভিড়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটাই সেখানে ছিল সংগ্রাম। সেই লড়াই, সর্বস্ব দিয়ে লড়েছেন শতনিক রায়। শতনিক নামটা খুব একটা শোনা যায় না। বলছিলেন ওঁর লড়াইয়ের কাহিনি। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর এই ছাত্র তাঁর প্রতারিত হওয়ার কাহিনিটি এখনও পর্যন্ত গোপন রেখেছেন নিজের বাড়ির লোকের কাছে। বলছিলেন, 'অনেক কষ্ট করে বাবা পড়াচ্ছেন। তার মধ্যে এই বিপত্তির কথা শুনলে দিশাহীন বোধ করতেন তাই আর বলা হয়নি।' জিজ্ঞেস করলাম 'তোমার সব টাকা যদি প্রতারক নিয়ে থাকে তাহলে চলল কী করে, বন্ধুর কাছ ধার নিলে নিশ্চয়ই!' এবার যা বললেন শতনিক তা আরও রোমাঞ্চকর। বললেন, ‘আমি একা নই সব বন্ধুরাই এক সঙ্গে ঠকেছিলাম। ফলে কারও কাছে কোনও টাকা ছিল না। ফার্স্ট ইয়ার। খুব বেশি লোককে চিনতামও না। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই আমাদের যাবতীয় সামগ্রী বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে একটা মাস চালিয়ে দেব। করা হল তাইই। সবাই মিলে সব কিছু বিক্রি করতে থাকি। দেখলাম দামি দামি সব জিনিস সস্তায় সস্তায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কথায় যেমন বলে ‘কিনতে পাগল, বেচতে ছাগল’ দশা। আমার সব থেকে কষ্ট হয়েছিল আমার ল্যাপটপটা বিক্রি করতে। আমি তো জানি বাবা অতিকষ্টে ষাট হাজার টাকায় কোর আই ফাইভ, দুর্দান্ত কনফিগারেশনের একটি ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলেন। আমার পড়াশুনোয় কাজে লাগবে এই ভেবে, কিন্তু সেটা যখন বিক্রি হল তখন পেলাম মাত্র দেড়হাজার টাকা। ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। সেবার ঠকেই ছিলাম। সেদিন বুঝেছিলাম ব্যবহার করা জিনিস বিক্রি করার কোনও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া না থাকায় কীভাবে ঠকতে হয়। সেই দিন শিক্ষা পেয়েছিলাম। এই সমস্যার সমাধান করার কথা ভাবতে ভাবতেই মগজে জ্বলে উঠল বাল্ব, একটি স্টার্টআপের।’ এভাবেই একদিন নিঃস্ব হয়ে যাওয়া শতনিক ঘুরে দাঁড়ালেন।

ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ন্যায্য-দামে কীভাবে বিক্রি করা যায় তারই একটি স্টার্টআপ খুললেন শতনিক। সঙ্গে পেলেন দীপাঞ্জনকে।

দীপাঞ্জন পুরকায়স্থ। টেক মহিন্দ্রার উঁচু পদে চাকরি করতেন। দীর্ঘ সতের বছর মার্কিন মুলুকে এবং কানাডায় কাজ করেছেন। বিভিন্ন নামী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকেই ঠাঁই নাড়া। এনআইটি কুরুক্ষেত্রে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান। তারপর থেকে কলকাতায় ফেরা বলতে বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করা ছাড়া আর কোনও প্রয়োজন ছিল না। তবুও এই শহর ওঁর ক্রোমোজোমে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে বারংবার গুনগুন করে উঠতেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা ভাষার সাহিত্য, বাংলার সংস্কৃতি ওঁকে নিয়ন্ত্রণ করত। তাই আশৈশব ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনো করা দীপাঞ্জন বাংলায় কবিতা লেখেন। শক্তি-সুনীল-শঙ্খ ওঁর অবসরের সঙ্গী। আল মাহমুদ, জীবনানন্দ, বিনয়, নির্মলেন্দু গায়ে-গা এলিয়ে ওঁর বইয়ের তাক থেকে ওঁকে হাতছানি দিত। বার বার বলত, ফিরে এসো এই মাঠে ঢেউয়ে ফিরে এসো হৃদয়ে আমার...ফিরে এসো চাকা...

সব কেমন গুলিয়ে যেত। আদ্যন্ত হিসেবি। দুর্দান্ত মস্তিষ্কের মানুষটা একবার একটা ফর্ম ফিলাপ করতে গিয়ে দেখলেন সাল তারিখ সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হল, 'না, এবার ফেরা উচিত। ঘরে ফেরা উচিত।' সবাই বলেছিল এটা বোকামি হবে। সবাই বলেছিল ভারতে ফিরলেও গুরগাঁও কিংবা বেঙ্গালুরুতে যাও। কলকাতা নৈব নৈব চ। কিন্তু ওঁ তো ফিরতেই চেয়েছিলেন এবড়ো খেবড়ো রাস্তায়। আরামে থাকতে হলে তো ওখানেই থাকতে পারতেন। তাই সকলের বারণ, অযাচিত নিষেধ উপেক্ষা করে কলকাতাতেই ফিরে এলেন দীপাঞ্জন।

স্ত্রী বাঙালি নন। কিন্তু আবিষ্ট চুম্বকের মতো সেও এখন বাংলায় অনর্গল বলতে পারেন। দুর্দান্ত বাঙালি রান্না করেন। একটু একটু পড়তেও পারেন বাংলা। ওদের সন্তান স্টেটস থেকে ফিরে এখানেই একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ভাঙাচোরা মার্কিনি অ্যাকসেন্টেই বাংলা শিখছে। দীপাঞ্জন গর্বিত।

এখন দীপাঞ্জন এখানে কলকাতার বেশ কয়েকটি সংস্থায় বিনিয়োগ করেছেন। শক্ত হাতে ব্যবসা করতে চান। বলছিলেন 'সহজের সঙ্গে লড়াই তো সবাই করে তাই আমি স্থির করেছি লড়তে হলে লড়ব বৃহতের বিরুদ্ধে, কঠিনের সঙ্গে।' ওলা-উবেরের মত, ক্যুইকার-ওএলএক্সের মত বৃহদায়তন সংস্থাকে টক্কর দিচ্ছেন কেবলমাত্র বুদ্ধির জোরে। আর শতনিকের স্বপ্নকে সফল করতে পাশে দাঁড়িয়েছেন সিলিকন ভ্যালিতে বহুবার পুরস্কৃত দীপাঞ্জন।

আমাকে সোজা বাংলায় বোঝাচ্ছিলেন প্ল্যানটা। জলের মত বুঝে গেলাম মাত্র ২ মিনিটে। সংস্থার নাম রেখেছেন Yibeal, গুগলে অ্যাপও আছে। এর মারফত আপনি চাইলে আপনার দামি পুরনো ফোনটার একটা ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, অন্যান্য যেসব পুরনো জিনিস বিক্রির সাইট গুলো আছে তাতে আপনি পুরনো জিনিস তো বিক্রি করতেই পারেন কিন্তু তাতে কি আপনি ন্যায্যমূল্য পান? আপনি যদি পুরনো জিনিস কেনেন তাহলে কি কোনও সার্টিফিকেট কোনও ওয়ারেন্টি বা ইনসিউরেন্স পাবেন? কিংবা আপনি যে জিনিসটা কিনছেন সেটা আদৌ ভালো কিনা কিনবার যোগ্য কিনা সেটা কি কখনও জানবার উপায় থাকে আপনার? না তো! এই খানেই Yibeal এগিয়ে। ওঁরা আপনার সামগ্রী যা বিক্রি করতে চাইছেন সেটা দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ন্যায্য দামের পরামর্শ দেবেন। যিনি কিনবেন তিনিও পাবেন একইভাবে একটি সার্টিফিকেট। চাইলে একটি বীমাও করিয়ে নিতে পারবেন এই সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ফোনের। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খারাপ হলে Yibeal মেরামত করার গ্যারান্টিও দেবে।

ফলে বলাই বাহুল্য It is a big deal… আর এই ফ্রেজ টা থেকেই নামটা তৈরি করেছেন শতনিক।

সংস্থার সিইও দীপাঞ্জনের নেতৃত্বে দারুণ টিম Yibeal-এর, ব্ল্যাকবেরি আর স্যামসাঙ-এর মত সংস্থার সার্ভিসেস বিজনেসের প্রাক্তন প্রধান অম্বরীশ সেনগুপ্ত ওঁদের অপারেশন হেড, সংস্থার কো ফাউন্ডার আশিস চক্রবর্তী টেকনিকাল হেড। ২০১৬-র জুনে শুরু হয়েছে কাজ, আর তার মধ্যেই Yibeal বাজারের নজর কেড়েছে। সম্প্রতি মার্কিন উদ্যোগপতি David Wang-এর হাত ধরে মার্কিন মুলুকেও ঢুকে পড়তে চলেছে দীপাঞ্জন শতনিকদের সংস্থা। কথায় বলে Morning shows the day...  ফলে টের পাওয়া যাচ্ছে। খুব শিগগিরই কলকাতা থেকে মাথা তুলে পৃথিবী কাঁপাবে একটি ইউনিকর্ণ।

Related Stories