শিবশঙ্কর অর্জুননের পাখির চোখ ওলিম্পিক ২০২০ 

0

গল্ফ চিরকালই বড়লোকেদের খেলা। গল্ফের সংস্পর্শে আসার কোনও সম্ভাবনাই গরীব মানুষের থাকে না। কারণ যেসব জায়গায় গল্ফ খেলা হয় সেখানে বিত্ত মেপে প্রবেশাধিকার থাকে। এ হেন মাছি না গলতে পারা আবহের ভিতর থেকেও উঠে এসেছেন দেশের অন্যতম নক্ষত্র গল্ফ প্লেয়ার শিব শঙ্কর প্রসাদ চৌরাসিয়া। অনেকেই ভাবছেন তো কাহানি পে টুইস্ট টা কোথায়! জানেন কি এই বিশ্ববিখ্যাত গল্ফ প্লেয়ার এই কলকাতারই ঐতিহ্যশালী একটি গল্ফ ক্লাবের সার্ভিস কোয়ার্টারে বড় হয়েছেন। বাবা RCGC—এর গ্রিনকিপার ছিলেন। ফলে খুব কাছ থেকে সাহেবসুবোদের গল্ফ খেলতে দেখে দেখেই বড় হয়েছেন শিবশঙ্কর। আর দেখতে দেখতেই শেখা কোটিপতিদের স্ট্যাটাস সিম্বল, গল্ফ। রয়্যাল ক্যালকাটা গল্ফক্লাবের সারভেন্টস কোয়ার্টার থেকে অর্জুন পুরস্কার পর্যন্ত যাত্রাটা রূপকথার গল্পের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

সাত ভাই বোন আর বাবা—মায়ের সঙ্গে গল্ফক্লাবের কোয়ার্টারেই বড় হওয়া। গল্ফ কিট নিয়ে গল্ফার নেল লর ছায়া সঙ্গী হয়ে থাকতেন ছোট্ট শিবশঙ্করের এক ভাই। ফলে ল’র গল্ফ ব্যাগ ছিল তার হাতের মুঠোয়। এসএসপির গল্ফে হাতেখড়ি নেলের গল্ফ সেট দিয়েই। নেল নিজেও তাঁর কিট ব্যবহার করতে দিতেন বছর দশেকের এই ছোট্ট ছেলেটাকে। শুরুটা এভাবেই। ক্লাবে পেশাদারদের খেলতে দেখে, তাঁদের জন্য বল কুড়িয়ে এনে, কিট বয়ে, কোনও প্রশিক্ষক ছাড়া নিজে নিজেই অনুশীলন চালিয়ে যেতে থাকেন ছোট্ট শিবশঙ্কর। শান্ত, লাজুক, মুখে হাসি লেগেই থাকত। যেসব গল্ফার এসএসপিকে খুব অল্প বয়েস থেকে চেনেন তারা বলছিলেন, ও সবার শেষেই প্র্যাকটিসের সুযোগ পেতেন। শিবশঙ্কর অপেক্ষা করে থাকত কখন অন্যদের প্র্যাক্টিস শেষ হয়। কারণ তারপর ওর খেলার সময়। ছোট্ট ছেলেটা গল্ফের বল নিয়ে কী দারুণ স্ট্রোক দিত দেখে চোখ জুরিয়ে যেত সিনিয়রদের। ফলে উৎসাহ ও অনেক পেয়েছেন।

গল্ফ কোর্ট ফেরায়নি চৌরাসিয়াকে। বাড়ির বড়রা চেয়েছিলেন পড়াশুনোয় মন দিক। কিন্তু শিবশঙ্করের মন পড়ে ছিল গল্ফেই। প্রফেশনাল গল্ফে ঢুকে পড়েন ১৯৯৭ সাল থেকে। পেছন ফিরে তাকাননি আর। ২০০৩ সালে প্রথম বারের মতো এশিয়ান ট্যুরে যান। এইসব ট্যুরের খরচও বেশ মোটা অংকের। অত টাকা জোগাড় করা গ্রিনকিপারের ছেলের পক্ষে দুরূহ। তখনও RCGC এর সদস্য নন এসএসপি। তবে মিষ্টি ব্যাবহার আর খেলায় একাগ্রতার জন্য তখন ক্লাব সদস্য এবং প্রশাসকদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন এই প্রতিভাধর গল্ফার। ট্যুর থেকে ফিরে বড় অংকের হোটেল বিল নিয়ে অস্বস্তির কথা পাড়েন তাঁদের কাছে। ফলও মেলে। শিবশঙ্করের পরবর্তী কয়েক বছরের ট্যুরের স্পন্সরের ব্যবস্থা করে দেয় রয়্যাল ক্যালকাটা গল্ফ ক্লাব। মান রেখেছিলেন চৌরাসিয়া। ২০০৮ থেকে মাঝে এক মাসের জন্য ছাড়া আর কখনও ইউরোপিয়ান ট্যু র কার্ড হারাতে হয়নি তাঁকে। টানা ৯ বছর এক পারফরমেন্স ধরে রেখে বড় বড় ট্যুরে খেলে যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। গত ১৪-১৫ বছরে ভারতীয় গল্ফারদের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ আয় করেছেন ট্যুর থেকে।

শিবশঙ্করের মোবাইলে স্ক্রিন সেভারে যার ছবি তিনি জামশেদ আলি। দেশের প্রথম গল্ফার হিসেবে অর্জন পুরস্কার পান। অর্জুন পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছেটা ওর অনেক দিনের গোপনে লালিত স্বপ্ন। একটা সময় ছিল যখন অর্জুন পুরস্কারই একজন গল্ফারের সেরা স্বীকৃতি বলে ওর মনে হত। ১২—১৩ বছর বয়সেই এই ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না জামশেদ আলির অন্ধ ভক্ত শিবশঙ্কর। ‘বেশ কয়েকবার আমার নাম ওঠে অর্জুন পুরস্কারের জন্য। ২০০৮ এ এমার—এমজিএফ ইন্ডিয়ান মাস্টার্স জেতায় জিভ মিলখা সিং ও অর্জুন অটোয়ালের পর ইউরোপিয়ান ট্যুর ইভেন্ট জয়ী আমিই ছিলাম তৃতীয় গল্ফার। আমার পূর্বসূরিরা যখন অর্জুন পেয়েছেন, আমিও পাবো সেই বিশ্বাস ছিলই’, বললেন আত্মবিশ্বাসী এসএসপি।

কিন্তু অপেক্ষা শেষ হচ্ছিল না যেন। একটু একটু ভেঙেই পড়ছিলেন। ইন্ডিয়ান গল্ফ ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার অর্জুন পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করে। যদিও পুরস্কারের নিয়ম অনুযায়ী দেশকে প্রতিনিধিত্ব না করা পর্যন্ত ওই পুরস্কারের দাবিদার হতে পারেন না কেউ। সুযোগ আসে তখনই যখন রিও অলিম্পিক ও বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হন এসএসপি। দেশের হয়ে দুটি টুর্নামেন্ট খেলার পর অর্জুন পুরস্কারের পথে আর কোনও বাধাই রইল না শিবশঙ্করের সামনে। হলও তাই। ‘বেঙ্গালুরুতে খেলছিলাম। ফার্স্ট রাউন্ড খেলা শেষের পরে এক বন্ধুর ফোন আসে সেই সুখবর নিয়ে। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। পরে অফিশিয়াল ফোনটা আসে…স্বপ্ন সার্থক হল’, চোখের কোণে আনন্দের ঝিলিক বছর আটত্রিশের এসএসপির। ‘এতদিনে অর্জুন পুরস্কার নিয়ে কলকাতায় ফিরলাম। এই অনুভূতির তুলনা হয় না’, রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অর্জুন পুরস্কার গ্রহণের পর কলকাতায় পা রেখে খুশি চাপতে চাননি এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে সফল গল্ফার। সাফল্যের চূড়ায় থেকেও মনে রেখেছেন তাঁদের যারা গল্ফার হতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেরা মুহূর্তে বাবা—মা, নিজের পরিবারের অবদানের পাশাপাশি মনে করলেন RCGC কে, যাদের অবদান ছাড়া এই সাফল্য হয়ত অধরাই থেকে যেত এসএসপির।

রিও অলিম্পিকে নামলেও পদক জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। খালি হাতে ফিরতে হয়েছে এসএসপিকে। অর্জুন পুরস্কার পরবর্তী অলিম্পিকের জন্যে মানসিকভাবে অনেকটাই হয়ত এগিয়ে দেবে তাঁকে। বললেন, ‘আমি ছোট ছোট লক্ষ্যে ধরে এগোতে চাই। ২০২০ র অলিম্পিক দেরি আছে। ৫০ বছরের আগে কিট তুলে রাখার কোনও ইচ্ছে নেই। ওই পর্যন্ত যা যা লক্ষ্য সামনে আসবে সেগুলি পূরণের চেষ্টা করব। তবে অর্জুন পুরস্কার আমার দায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দিল। আমাকে আরও এগোতে হবে’, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে। এক নাগাড়ে বলে চলেন লক্ষ্যে অটল ‘অর্জুন’ শিবশঙ্কর চৌরাসিয়া।