দৃষ্টিহীনদের পাশে বিস্ময় কিশোরের প্রিন্টার

0

কবি বলেছিলেন অন্ধজনে দাও আলো। সেই আলো যে মুদ্রণের মাধ্যমে এত সহজে আসবে কে তা জানত। দৃষ্টিহীনদের জন্য আর দশাসই চেহারার নয় ছাপা হল হাল্কা মেশিনে। খরচও নামমাত্র। ব্রেইল প্রিন্টারের আধুনিক ও কম খরচের মেলবন্ধন ঘটালেন শুভম ব্যানার্জি। দৃষ্টিহীনদের কাছে যা হাতের চাঁদের মতো। হোতার বয়স মাত্র চোদ্দ। অনাবাসী ভারতীয় শুভমের এই কীর্তিতে ধন্য ধন্য রব মার্কিন মুলুকে। শিহরিত গোটা দুনিয়া।

ছোট থেকেই চশমা। দৃষ্টিশক্তি নিয়ে মানুষের কেন এত সমস্যা ভাবাত শুভম ব্যানার্জিকে। ছেলেবেলা থেকে মানস মন্দিরে সেই ভাবনাকে একটু একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু শুভমের। বারো বছরে নিজের স্কুলের বিজ্ঞানমেলায় তার ‌ভাবনার ডালপালাগুলো আরও ছড়িয়ে পড়ে। নিজের ব্রেইল প্রন্টারের নকশায় ফুটিয়ে তুলেছিল অনেক না জানা কথা। প্রদর্শনীতে গিয়ে অভিভাবকদের সে জানতে চেয়েছিল দৃষ্টিহীনরা কীভাবে পড়তে পারে। কৌশলী জবাব তার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। শুভম এই নিয়ে শুরু করে দেয় গবেষণা। চলে অনলাইনে সমীক্ষা। এক বছরের মধ্যেই যার ফল মেলে। সে তৈরি করে ফেলে ব্রেইলগো নামের এক প্রিন্টার। সাধারাণ ব্রেইল প্রিন্টারের থেকে যা বহুযোজন এগিয়ে। সাধারণ প্রিন্টারের দাম যেখানে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা, সেখানে মাত্র ৩২ হাজার টাকায় তার প্রিন্টার তৈরি। তার ডেস্কটপ প্রিন্টার যা কিনা ছাপার আগে ইলেকট্রনিক টেক্সট থেকে ব্রেইলে রূপান্তর হবে। এই প্রিন্টার কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রিন্ট করা যাবে। এমনকী এর জন্য কোনও কালির প্রয়োজন নেই। স্রেফ ডট ব্যবহারেই কাজ হাসিল।

ক্লাস নাইনে পড়াশোনা চলছে। সমানতালে প্রিন্টিং নিয়ে কাজ। ব্রেইলগো ল্যাব নামের সংস্থা খুলে শুভম এখন রীতিমতো উদ্যোগপতি। সংস্থার সিইও। নিজের সংস্থাকে নিয়ে কীভাবে আরও এগোনো যাবে তা নিয়ে শুভমের যত মাথাব্যাথা। এরজন্য পাঁচজন ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়েছে শুভম। নিয়মিত লগ্নিকারীদের সঙ্গে কথা বলে সে। ইঞ্জিনিয়িারদের থেকে পরামর্শ নেয়। বাচ্চা ছেলের এমন পাকা মাথাকে খুঁজে নিতে দেরি করেন ইন্টেল কর্পোরেশনের মতো সংস্থা। তারা ক্যালিফোর্নিয়ার শুভমের এই স্টার্ট আপে বিনিয়োগ করেছে। ডেইলি মেলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে শিবম জানায়, তার মনে হয়েছিল প্রিন্টারের এত দাম হওয়া উচিত নয়। সহজেই এধরনের প্রিন্টার করা যেতে পারে। কম খরচের ব্রেইল প্রিন্টার বানাতে শুভম লেগো ব্লকের ব্যবহার করেছে। তার ইচ্ছে আছে হাল্কা ওজনের ডেস্কটপ প্রিন্টার তৈরির। যার দাম সাড়ে তিনশো মার্কিন ডলারের মধ্যে থাকবে।

উন্নয়শীল দেশগুলিতে ৯০ ভাগ দৃষ্টিহীনরা থাকেন। শুভমের এই প্রিন্টার তাদের অনেকটাই কাজে আসবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে একজন বাচ্চা ছেলে এমন কিছু ভাবতে পারে তা দৃষ্টিহীনদের কাছে রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছে। এই পথে প্রথম থেকেই বাবা নীল ব্যানার্জিরে পাশে পেয়েছে শুভম। ছেলের যখন পড়াশোনা চাপ তখন ইন্টেলের ইঞ্জিনিয়ার নীল কাজ দেখেন। তাঁর দেওয়া ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েই শুভমের ব্রেইলগোর পথ চলা শুরু হয়। ইন্টেলও শুভমের প্রিন্টারে মজেছে। তাদের এক আধিকারিকের কথায়, শুভম দুনিয়ার বড় এক সমস্যার সমাধানের পথ দেখিয়েছে। শুভমের মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ইন্টেলও কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করেছে। ইন্টেলের সদর দফতর থেকে মিনিট কয়েক দূরে সি‌লিকন ভ্যালির সান্টাক্লারায় বাড়ি শুভমের। প্রযুক্তি সংস্থার প্রতিবেশী শুভম এবার আরও হাল্কা ব্রেইল প্রিন্টার বানাতে চায়।