এ এক আশ্চর্য উদয়!

0

পৃথিবীতে দু ধরণের লোক হন, এক যাঁরা সাফল্যের পিছনে ছুটতে থাকেন আর দুই যাঁদের পিছনে সাফল্য ছুটতে থাকে। অবশ্যই এই দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষগুলোর লক্ষ্য থাকে কাজ। কাজ করতে করতেই পেছনে ফেলে আসেন সাফল্যের দীর্ঘ পথ। জয় করে নেন গোটা বিশ্ব। এই ধরণের মানুষের চলার পথে অনেক বাধা আসে। কিন্তু থামাতে পারেনা। চলতে থাকেন। তৈরি হয়ে যায় সাফল্যের সরণী।

অর্জুনের গাণ্ডীব থেকে যাত্রা শুরু করা একটি তীরের মতো তিনি তন্ময়। এমনি তন্ময় এক মানুষ YUP TV-র সিইও উদয় রেড্ডি। তিনি প্রযুক্তি এবং উদ্যোগের শিখরে সাফল্যের পতাকা পুঁতেছেন। এবং এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য। তিনি টিভি চ্যানেল দেখার অভিজ্ঞতাকেই আমূল পাল্টে দিয়েছেন। YUP TV-র সৌজন্যে যেকোনো জায়গা থেকেই দেখা যায় পছন্দের যেকোনো চ্যানেল।

তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্রপ্রদেশের সংযুক্ত রাজধানী হায়দ্রাবাদ থেকে ১৪০ কিলোমিটার তিনটি ছোট্ট শহরের একটা এলাকা রয়েছে,কাজিপেট,হনমকোঁড়া এবং বরানগল। উদয় রেড্ডির সঙ্গে যোগ রয়েছে হনামকোঁড়ার। এখানকার একটি কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার। ছোট্ট উদয় IAS হতে চাইতেন। বড় হয়ে নিজের গ্রামের পাশাপাশি গোটা দেশের ছবিটাই বদলে ফেলার স্বপ্ন দেখতেন উদয়। বিশেষত শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল।

এসব ভাবনা চিন্তা করতে করতেই তাঁর দিল্লী আসা। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। সেটাও ছিল ওই স্বপ্নেরই একটা অংশ। কিন্তু উনি আমাদের জানালেন, "হনমকোঁড়ার পাঠ চুকিয়ে দিল্লী আসার পর সেই স্বপ্ন আরও তীব্র হয়। গ্রামের উন্নয়ন দেশের উন্নয়নের যে চিন্তা আমার ভিতর খেলা করত তাই ইঞ্জিনিয়রিং কলেজে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন পড়তে উৎসাহ দেয়। কিন্তু হল কী; পড়া শেষ হতে না হতেই ক্যাম্পাস সিলেকশনে "জিমেন্স"-এর চাকরি পেয়ে যাই। তখন ভাবি এক বছর চাকরি করে সিভিল সার্ভিসে বসব। সেটা আর হয়নি। সিভিল সার্ভিসের ব্যপারটা বাড়ির লোকের মাথায় বাসা বেঁধেছিল। জিমেন্সের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে গোটা দেশ ঘুরে ফেললাম। অনেক ছোটো বড় শহর ঘুরেছি,দারুণ উপভোগ করেছি। তারপর NORTEL এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আর ফেরা হল না। টেলিকম সেক্টরেই থেকে গেলাম।"

এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ উদয়ের জীবনে। NORTEL এর মতো সংস্থায় কাজ করেছেন। কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে MBA করেছেন। ১৯৯৫ এর পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। উনি বলছেন ওই সময়টা ছিল টেলিকম সেক্টরের খোলনোলচে বদলের সময়। ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের সঙ্গে সবে করছিল দুনিয়া। সিঙ্গাপুর,অস্ট্রেলিয়া,মালয়শিয়ার মতো বেশ কয়েকটি দেশে কাজ করার সুযোগ পান। NORTEL এর ডাইরেক্ট সেলসের বিভাগে কাজ করতে গিয়ে সার্বিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বাজার সম্বন্ধে সম্যক ধারণা তৈরি হয়। আলাদা আলাদা দেশ,আলাদা আলাদা কাজ,আর আলাদা আলাদা অনুভূতি। NORTEL এর সঙ্গে কাটানো এগারোটা বসন্ত। উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে তাঁর শিক্ষার এটাই ছিল সুবর্ণ সুযোগ।

একজন উদ্যোগি ব্যক্তিকে মোটা টাকার মাইনেও বেঁধে রাখতে পারে না। সবসময় মাথার ভিতরে কোনো এক বোধ কাজ করে,কোনো এক বিপন্ন বিষ্ময় তাঁকে তাড়া করে এবং নিজের মতো করে একটা দুনিয়া তৈরি করার দেখতে থাকেন উদয়। ২০০৬ সালে আমেরিকায় তৈরি করলেন YUP TV. যদিও সেসময় আইডিয়াটা নতুন ছিলনা তবে অনেক সম্ভাবনা ছিল। আর সেই সম্ভাবনাটাই দেখতে পেয়েছিলেন উদয়। ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। সংস্থা শুরু করার মতো রেস্ত ছিল না পাশাপাশি সংস্থা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। এককথায়

বলতে গেলে শুরুর দিনগুলো বেশ এবড়ো খেবড়োই ছিল। আমেরিকার একটি বাড়ির বেসমেন্টে শুরু হয়েছিল YUP TV-র দপ্তর। সেসময় ব্রডব্যান্ডও ছিল না। স্ম্যার্ট টিভি বা স্ম্যার্ট ফোনও জনপ্রিয় ছিল না। একদিক থেকে বলতে গেলে তাঁর পরিকল্পনাটা সময় থেকে এগিয়ে ছিল। তিনি এই কাজ করতে কারোও কাছ থেকে একটা পয়সাও নেননি। শুরু করেছিলেন নিজের জমানো সঞ্চয় থেকে। শুধু একটাই কথা ভাবতেন, ব্রডব্যান্ড আর ইন্টারনেটের মারফত লোকে লাইভ টিভি দেখুন,তাই নয়,বরং যখন খুশি যেখানে খুশি বসে টিভি দেখুন। সেই ভাবনাই উস্কে দিয়েছে CATCH UP TV-র ধারণাকে। আর এই সবই উনি করতে চেয়েছিলেন দেশের মাটির কথা ভেবেই। প্রবাসী ভারতীয়র মনোরঞ্জনের জন্যই দেশীয় চ্যানেলগুলো পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ থেকেই শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ।

মার্কিন মুলুকে যে সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন উদয় সেই সহযোগী সংস্থার কাছ থেকেই প্রথম আঘাত এল। নীচ কর্পোরেট রাজনীতির শিকার হলো উদয়ের YUP TV,কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। তাঁদের গ্রাহককে ধরে রাখার কঠিন লড়াই যেমন চালিয়ে গেছেন তেমনি হায়দ্রাবাদের এক সংস্থার অফিস ঘর শেয়ার করেই লড়াইয়ের ময়দানে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ২০১০ পর্যন্ত সময়টা ছিল বেশ কঠিন। অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। ২০১০ এ নিজের ঘর বেচে দিলেন। পরিবার ছাড়াও কিছু বন্ধুও এগিয়ে এলেন আর্থিক সাহায্য নিয়ে। এবার যখন বাজারে নামল YUP TV তরতর করে এগোলো। কারণ এতদিনে বাজার ও সমঝে গেছে ঠিক কী করতে চাইছিলেন উদয়।

আজ ইয়াপ টিভি শুধু আমেরিকাতেই নয়। ভারত সহ ১৩ টি দেশের দুশোরও বেশি টিভি চ্যানেলের পরিষেবা নিয়ে তাঁদের গ্রাহকদের সামনে হাজির। সাফল্যের সিঁড়ি ধরে কেবলই উঠছেন উদয়। পাশাপাশি পৃথিবীর বিভন্ন প্রান্তের সামাজিক এবং আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চেতনা তৈরি করার কাজটাও মসৃণভাবে করে চলেছেন উদয়। তার এই সাফল্যের প্রসঙ্গে রীতিমত অনাসক্ত উদয় বলেন এখনও অনেক দূর যেতে হবে। এখনও নিজেকে স্টার্টআপই মনে করেন তিনি। পথটা যে মসৃণ নয় সেটাই বলছিলেন দুর্দমনীয় উদয়। বলছিলেন একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বারবার যেতে হত। জুতোর শুকতলা খয়ে যাওয়ার উপক্রম হত। কিন্তু সম্পর্ক যখন তৈরি হল তা আর সহজেই ভাঙেনি।

ইন্টারনেটে টিভি দেখানোর পরিষেবার যদি তালিকা করেন তবে প্রথম নামটা অবশ্যই উদয় রেড্ডির সংস্থার। শুধু বিনোদন নয় ধীরে ধীরে খবরের চ্যানেলগুলিকেও যুক্ত করেছেন উদয়। পাশাপাশি, টেলিভিশনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিক্রিও শুরু করেন। ফলে ব্যবসা বাড়তে থাকে। 

সাফল্যের এই যাত্রা পথে তিনি নিজেকে কখনও অহঙ্কারি হওয়ার প্রশ্রয় দেননি। তাঁর শিকড় ভোলেননি। YUP TV এবং CATCH UP TV-র কর্ণধার উদয় রেড্ডি প্রযুক্তির হাত ধরে ভারতের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতে চান শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের সুবিধা।গ্রামের বিকাশের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে এখনও তাজা। তাঁর সংস্থার কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির টাকায় একটি গ্রামে চলছে তার স্বপ্ন বিকাশের কাজ।

লেখা- অরবিন্দ যাদব, অনুবাদ- এষা গোস্বামী

Related Stories