ই-কমার্সে এফডিআই নিয়ে গড়িমসি কেন?

0

ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যান্ড প্রোমোশন ( DIPP)সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অনলাইন মার্কেটিংয়ে দেশের এফডিআই পলিসি চলবে না। এই সিদ্ধান্ত এসেছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্টার্টআপ অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করার ঠিক একদিন আগে। ই-কমার্স সংস্থাগুলির কাছে DIPP এর এই সিদ্ধান্ত ছিল মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো।

ই-কমার্সে এফডিআই প্রয়োগ নিয়ে যে অস্বচ্ছতা তার লম্বা কাহিনী রয়েছে। অফলাইন রিটেলররা অফলাইনের জন্য এফডিআইয়ের অনুমোদনের বিরুদ্ধে একটা পিটিশন দাখিল করে। তাদের যুক্তি ছিল, অনলাইন মাল্টি ব্র্যান্ড রিটেলররা বিদেশি বিনিয়োগের নিয়ম ভাঙছে। নভেম্বরে দিল্লি হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দেয় ২১টি ই-কমার্স সংস্থা এফডিআই আইন ভাঙছে কিনা তা তদন্ত করার। বেশিরভাগেরই দাবি ছিল, তারা মার্কেটপ্লেস মডেল মেনে চলছে। জিনিসপত্রের দাম ঠিক করা বা গুদামজাত করার দায়িত্ব তাদের নয়, সংস্থাগুলি শুধু প্রযুক্তির সাহায্য দিচ্ছে এবং কমিশনের বিনিময়ে এজেন্টের কাজ করছে। ET এর একটি রিপোর্ট বলছে DIPP হয়ত অফলাইন রিটেলারদের যুক্তিই মেনে নিয়েছে।

২১টি তালিকাভুক্ত ওয়েবসাইটের একটি ভুনিক। সুজায়াত আলি, ভুনিকের কো-ফাউন্ডার বলেন, ‘ভুনিক সরাসরি বাজারও নয়, এটা অনেকটা অনুমোদিত মডেলের মতো কাজ করে, যারা অন্যের হয়ে ব্যবসা করে দেয়।যদিও আমাদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই অর্ডার হয়, অন্যেরা কাজ সম্পন্ন করে’। জাবং, ফ্যাশনারার মতো সংস্থার কাছ থেকে ভুনিক বরাত নেয়। ‘অর্ডার করা প্রোডাক্ট পেলেই জাবংকে দিয়ে দিই। বাকি কাজটা জাবংই করে’,বলেন সুজায়াত। তাঁর সংযোজন, এক্ষেত্রে একটাই কনফিউশন হতে পারে, সেটা হল ভুনিক সরাসরি পেমেন্ট গেটওয়ে কিনা-এই প্রশ্নে। ইওরস্টোরি ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল, পেটিএম এবং শপক্লুর মতো বড় বড় অনলাইন সংস্থাগুলির সম্মুখীন হয়। কিন্তু এই গল্পে তাদের কেউ সামিল হতে নারাজ।

সূত্রের খবর, সরকার নানারকম অনলাইন রিটেলারের ওপর নজর রাখছে। যাই হোক এখনও পর্যন্ত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাধিকা জৈন, Walker Chandiok & Co LLP এর পার্টনার বলেন, ‘যদি সরকার মার্কেটপ্লেস মডেল অনুমোদন না দেয়। যদি তাই হয়, তবে ভারতে সব ই-কমার্স বন্ধ হয়ে যাবে। এমন নয় যে এই লোকগুলি সিঁদ কেটে দেশে ঢুকে এই মডেলে ব্যবসা করছে। সরকার নিজেইএই বিষয়ে অবগত’। রাধিকার সংযোজন সরকারের উচিত সিঙ্গল ব্র্যান্ড, মাল্টি ব্র্যান্ড এবং ই-কমার্স সব রিটেল শ্রেণিকে এক জায়গায় রাখা। কিন্তু তাতে সময় লাগবে। যদিও টেকনোপার্কের চেয়ারম্যান অরবিন্দ সিঙ্ঘলের ভিন্ন মত রয়েছে। তিনি বলেন, এটা সংসদের আইন, আর্থিক বিল নয় বা আইন সংশোধনের ব্যাপার নয়-যদি তা করতে চায়, কালই করতে পারে। দেশের নিরাপত্তা নিয়েও এত আলোচনা হয় না,যতটা রিটেল ইস্যুতে হয়। বর্তমান এনডিএ সরকার প্রাক্তন ইউপিএ সরকারের ৫০ শতাংশ এফডিআই-এর সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিল। পরিস্থিতি এখনও পাল্টায়নি। অবরিন্দের সংযোজন, ‘রিটেল ব্যবসা নিয়ে সরকারের কোনও ধারণা আছে বলে মনে হয় না। রিটেল নিয়ে তাদের যা ধারণা, পৃথিবীর আর কোথাও তা নেই’। যদি সরকার ভারতে ই-কমার্স বন্ধ করে দেয় তাহলে আন্তর্জাতিক স্তরে শোরগোল পড়ে যাবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

উদ্যোক্তা এবং ইকমার্স কনসালটেন্ট কে ভৈতেশ্বরণ বলেন, ‘এই ইন্ডাস্ট্রিই সরকারকে সাহায্য করছে ই-কমার্সকে রিটেলের ভিন্ন মডেল হিসেবে বিবেচনা করার। আদতে ই-কমার্স ভারতে সব ব্যবসার ছোট্ট একটা অংশ। এর জন্য আলাদা নিয়মের প্রয়োজন নেই’। তাঁর বিশ্বাস, যদিও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, বাজার এখনও বাড়ছে। এবং যেকোনও ধরনের পলিসির বদল পরিস্থিতি পালটে দিতে পারে। ‘আমার নিজের মতে রিটেল ব্যবসায় এফডিআই হওয়া জরুরি। ডিফেন্স ম্যানুফেকচারিং এবং রেলওয়েতে এফডিআই মেনে নিতে পারলে রিটেলে নয় কেন?’

রিটেলে এফডিআই নিয়ে ভারত চিরকাল অনিচ্ছুক ছিল। ১৯৯০ এ অর্থনীতির উদারনীতিতেও মনে হচ্ছিল ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ভারতকে, যার শুরুই হয়েছিল ব্যবসার মাধ্যমে। কিন্তু অর্থনীতি নিয়ে এভাবে কতদিন গুটিয়ে রাখব নিজেদের? বিদেশি বিনিয়োগ এবং সংস্থা ভারতীয় সংস্থায় দক্ষতা বাড়াতে পারে। ভারতীয় সংস্থা ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিযোগিতায় তারা কতটা এগিয়ে। ই-কমার্সে স্টার্টআপগুলি বেড়ে ওঠার জন্য এবং ফান্ডিং পেতে সেইমতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সরকারের নানা অংশের নানারকম মন্তব্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাতে শুধু ই-কমার্সেরই ক্ষতি হচ্ছে না, অন্য ইন্ডাস্ট্রিরও ক্ষতি হচ্ছে।

লেখক-আথিরা নায়ার, অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস