পুঁজি টানতে স্টার্টআপে স্বচ্ছতা জরুরি

0

হিসেব বলছে গড়ে প্রতিদিন দুটি করে স্টার্টআপ আসছে ভারতে। ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বহু স্টার্টআপ। নতুনগুলিও সেই পালেই ভিড়ছে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন মূলত সেইসব স্টার্টআপের দিকে যারা নেট স্যাভি গ্রাহকদের চাহিদা মেটানোর ব্যাপারে নিজেদের জাহির করতে পেরেছে। পুঁজি তোলার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সংস্থার দর বাড়ানো এবং আপোষ করা আর নতুন কিছু নয়। বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি টানতে এবং তাদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে কিছু নামী সংস্থা ভ্যালুয়েশনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি তুলে ধরে। কিছু পরিবর্তনের ফলে বিনিয়োগের পরিস্থিতি একটু কঠিন হয়েছে। যাই হোক না কেন, কীভাবে স্টার্টআপগুলি বিনিয়োগকারীদের অ্যাপ্রোচ করবে সেটা একটু জরিপ করে নেওয়া দরকার। একটা সময় আসবে যখন ভিসি ইনভেস্টররা লাগাম শক্ত করবে এবং ব্যবসা সংক্রান্ত খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই ভিসি ইনভেস্টরদের কাছে যাওয়ার আগে ডু’জ অ্যান্ড ডো’নটস জেনে নেওয়া দরকার।

একজন উদ্যোক্তার মন সবসময় ব্যবসার দেখভাল আর পুঁজি বাড়ানোর মধ্যে দুলতে থাকে। কেউ ভাবেন একটু থিতু হয়ে পুঁজি বাড়ানো যাবে। আবার কেউ ঠিক উলটোটা। বিনিয়োগকারী এবং পুঁজি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরনের খসড়াটাই জরুরি। উদ্যোক্তাই ঠিক করবেন ব্যবসার কোন পর্যায়ে গিয়ে বলতে পারবেন যেভাবে ভেবেছিলেন ব্যবসা সেই পর্যায়ে এসেছে। যদি কেউ দেখাতে পারেন শুরুতে বিনিয়োগ করা নিজের পুঁজি দিয়ে ব্যবসা লাভজনক করে তুলতে পেরেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে একই গ্রাহক রয়েছেন, তাহলে নতুন বিনিয়োগকারীকে অ্যাপ্রোচ করার ক্ষেত্রে সেটাই প্লাস পয়েন্ট। একটা কথা এক্ষেত্রে প্রায়ই আলোচনায় চলে আসে, সেটা হল রঙ চড়িয়ে দেখানো। বিনিয়োগকারীর যদিও বা টিম এবং বিজনেস আইডিয়া পছন্দ হয়, কিন্তু ব্যাবসায়ীর দিক থেকে বাড়িয়ে বলার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে। বিরাট দর হাঁকিয়ে স্টার্টআপগুলি আসে এবং পুঁজি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আর তার ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না, কারণ ওই পরিমানটা বাস্তবোচিত নয়। এখান থেকে স্টার্টআপগুলির শিক্ষা নেওয়া দরকার। খুব সচেতনভাবে বিনয়োগের দর হাঁকার পরিমান ঠিক করা উচিত।

ব্যবসা যে ধরনের, সেই ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সফল কোনও বিনিয়েগকারীর সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। লক্ষ্য, মাইন্ডসেট এবং বিনিয়োগকারীর পুরনো রেকর্ড নিয়ে হোমওয়ার্ক করে রাখা দরকার। বুঝতে হবে তিনি কতটা গাইড করতে পারবেন, ভালো নেটওয়ার্ক আছে কি না, নাকি সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ কব্জা করতে চাইছেন। বিনিয়োগ ছাড়াও বিনিয়োগকারীর কাজ হল, সমস্যায় পড়লে সাহায্য করা। মনে রাখতে হবে, ইনভেস্টর বোর্ডে আসা মানে দীর্ঘকালীন পার্টনার হওয়া এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার। তাই উদ্যোক্তাকে আগে থেকেই হোমওয়ার্ক সেরে রাখতে হবে যাতে উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীর মধ্যে মনের মিলও থাকে। যখন কোনও ভিসির কাছে যাওয়া হয় তখন সঙ্গে যেন প্রেজেনটেশন থাকে। কারণ, সারাদিনে ডজন ডজন সংস্থার থেকে হয়ত আইডিয়া আসছে। পরেরবার যখন কারও সঙ্গে কথা বলছে, তখন প্রেজেনটেশন না দেখলে হয়ত সংস্থার নামই মনে করা সম্ভব হয় না। তাই সবসময় ডেমো নিয়ে তৈরি থাকা উচিত।

বিনিয়োগের অঙ্ক ছাড়াও বিনিয়োগকারীরা ভেঞ্চারের পেছনে উৎসাহ এবং চালিকাশক্তি খোঁজেন। স্বচ্ছতা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিমিত আবেগ বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ যোগায়। বিনিয়োগকারীকে প্রভাবিত করতে নিজের ব্যবসাকে দ্রুত এবং ঠিকঠাক বোঝানোর ক্ষমতার থাকতে হবে উদ্যোক্তার। প্রায়শই দেখা যায়, প্রেজেনটেশন শুরুই হয় উদ্যোক্তার মনগড়া বিরাট বাজার দেখিয়ে, যাতে বিনিয়োগকারীকে বোঝানো যায় যে বাজারের প্রয়োজনীয়তাটা কতটা। যদি ওই বাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীর সামান্যতম ধারণাও থাকে এবং তারপরও উদ্যোক্তার কথা শুনতে রাজি হন, তাহলে সেটা খুব একটা সুখকর হবে না। দেখা যায়, প্রজেক্টের বাজেট তৈরি করতে গিয়ে স্টার্টআপগুলি একটু বেশিই ইতিবাচক হয়ে ওঠে। এটা কাজের কথা নয়। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বাজারের সুযোগের কথা মাথায় রেখে বিজনেস মডেল তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই সংস্থার বৃদ্ধি এবং লাভজনক হবে।

আগ্রহী বিনিয়োগকারী সাধারণত প্রথম মিটিংয়েই আভাস দিয়ে দেন। বাতিল করে দিলে বিনিয়োগকারীকে আবার বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে, যদিও সেটা খুব একটা কাজ দেয় না। বিনিয়োগকারীদের ফিডব্যাক খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁরা জানেন ইন্ডাস্ট্রিতে কী চলছে। তাই যে কোনও ফিডব্যককে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা ভালো। বিনিয়োগকারী রাজি হলেও উদ্যোক্তাকে আরও অনেকটা পথ যেতে হবে। আর বিনিয়োগকারী যদি না বলে দেন অথবা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখেন, তাহলে উদ্যোক্তাদের প্রতি উপদেশ, তাঁদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রেখে সংস্থার আপডেট দেওয়া, সংস্থার সাফল্য জানানো এবং নতুন ক্লায়েন্ট ব্যবসায় জড়ানোর কথা জানানোর মধ্যে কোনও ক্ষতি নেই। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের রাডারে থাকা যায় এবং ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা জিইয়ে রাখা সম্ভব হয়।

ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে একটা প্রথা চালু রয়েছে। দেখা যায়, রেসে এগিয়ে থাকার জন্য বিনিয়োগকারীরাও বড় বড় সংস্থার সঙ্গে থাকে। স্টার্টআপগুলির পথ সহজ করতে সরকার সম্প্রতি কার্যকরি কমিটি করার কথা ঘোষণা করেছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নিসন্দেহে স্বাগত। শিগগিরই কেন্দ্রের স্টার্টআপ পলিসি ঘোষণা হবে যেখানে এন্টারপ্রেনারশিপ নিয়ে সরকারের দায়বদ্ধতার ছাপ থাকা উচিত।

উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীকে একসঙ্গে মিলে দীর্ঘকালীন ব্যবসা তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তা যেমন নজর রাখবেন টাকা দিয়ে দক্ষ ম্যানেজমেন্ট টিম এবং পরিকাঠামো তৈরি করতে, যাতে পন্য এবং পরিষেবা দিয়ে বাজার চালানো যায়। তেমনি বিনিয়োগকারীর নজর থাকবে টাকার যোগানের দিকে, বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তখনই ঠিকভাবে চলবে যখন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, সংস্থার কর্মী এবং পরিচালকদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া থাকবে।

(লেখা-উৎকর্ষ জোশী, অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস)