পর্বতারোহী দীপালি সিনহা নিজেই জীবন্ত কিংবদন্তি

0

এদেশে সত্তরের দশকে ইতিহাস গড়েছিলেন দীপালি সিনহা। ১৯৬৭ সালে তাঁর নেতৃত্বেই আটজন তরুণী প্রথম পর্বতারোহণ অভিযানে যান। সাফল্যের সঙ্গে নিরাপদে ফিরে এসে সেদিন সারা দেশে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন দীপালি ও অন্য সাতজন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলার তদানিন্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের হাতে সংবর্ধিত হয়েছিলেন ওঁরা।

দীপালি ছাড়া অন্য সাতজন হলেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত, সুজয়া গুহ, স্বপ্না মিত্র, লক্ষ্মী পাল, শীলা ঘোষ, স্বপ্না নন্দী এবং ইন্দিরা বিশ্বাস। মহিলা অভিযাত্রীদের এই দলে ডাক্তার হিসাবে কাজ করেছিলেন দীপালির দাদা দীপক সিনহা। দীপালি জানালেন, সুদীপ্তা পরে অ্যান্টার্টিকা অভিযানে গিয়েছিলেন। সুজয়া আর স্বপ্না নন্দী মারা গিয়েছেন। বাকিরা জীবিত। সুদীপ্তা কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে আসে না। অন্যদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।

ষাট দশকে শুধুমাত্র বাঙালি কেন, ভারতীয় মেয়েদের পক্ষে পর্বতারোহনে যাওয়ার কথা চিন্তা করা দুঃসাহসিকতার নামান্তর। যদিও ১৭৯৯ সালে মিস পারমিন্টরই প্রথম আল্পসে চড়েছিলেন। এর কয়েক বছর পরে ১৮০৬ সালে মেরি পারাডিস নামে ১৮ বছরের একজন ফরাসী তরুণী পশ্চিম ইওরোপের mont blac পর্বতে আরোহণ করেন। এরপরের দেড়শো বছর পৃথিবীর নানা দেশের মেয়েরা ‌প‌র্বতাভিযানে সফল হলেও ভারতীয় মেয়েদের দিক থেকে দৃষ্টান্তযোগ্য উদ্যম দেখা গিয়েছে প্রথম মহিলা পর্বতাভিযানের ১৬৮ বছর পর। একাজে নজির গড়েছিলেন দীপালিরা। এও দেখার পৃথিবীর বাসিন্দাদের কাছে এই নজির যাঁরা সৃষ্টি করলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বাঙালি মেয়ে। অভিযাত্রীদের ওই দলের দলনেত্রী ছিলেন দীপালি।

তিন বোন, চার ভাই দীপালিরা। দীপালি জানালেন, তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন, কখনও কোনও কাজ করতে যাওয়ার আগে নিজেকে মেয়ে হিসাবে ভাববে না। ছেলেরা যা পারে, একটু চেষ্টা করলে মেয়েরাও তাই পারবে। বাবার সেই উপদেশ মতো নিজেকে মেয়ে ভেবে কখনও পিছিয়ে থাকতে চাননি। ৭০ পেরিয়ে আসার পরেও অভিযানমূলক খেলাধূলাকে জনপ্রিয় করতে ও এ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একাধিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত দীপালি। নিজে ইন্সটিটিউট অব নেচার কেয়ার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার নামে একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। পর্বতারোহণ তথা অভিযানমূলক খেলাধূলা নিয়ে নিয়মিতভাবে লেখালেখি করেন দেশিবিদেশি পত্রপত্রিকায়। অভিযানমূলক খেলাধূলার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ক্রীড়া বিভাগের উপদেষ্টা হিসাবে নিযুক্ত দীপালি।

১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক ওই অভিযানের নেপথ্য কাহিনি‌টি দীপালির উদ্যম ও চরিত্র বৈশিষ্ট্যের যথাযথ উদাহরণ। সে বৃত্তান্ত দীপালি নিজেই জানালেন।

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল তখন কিছু অল্প সংখ্যক মেয়ে। আমিও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। তারপর একটা সময় কী মনে হল, ইন্সটিটিউট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তাদের ঠিকানা খুঁজে বের করে একের পর চিঠি লিখলাম। মনে আছে, প্রায় ২০ থেকে ২২জন মেয়েকে চিঠি লিখেছিলাম। বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত, চলো, অভিযানে বেরোব। সাতজন মেয়ে ওই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। তারপরে আমরা মেয়েরা আঁটঘাট বেঁধে অভিযানে বেরিয়ে পড়ি।

বাবা দীপালিকে মেয়ে হিসাবে বড় হয়ে না ওঠার পরামর্শ দিলেও পরিবারের অন্য বয়স্ক সদস্যরা ছিলেন যথেষ্ট রক্ষণশীল। মেয়ে হয়ে দীপালি সেদিন এত বড় একটা ঝুঁকির কাজ করতে গিয়েছিলেন সময়ের কাছে এই সাক্ষ্য রাখার জন্য যে, ছেলেরাও যা পারে মেয়েরাও তা পারে। বরং মেয়েদের ভিতর বিপদের মোকাবিলা করার ক্ষমতা ছেলেদের চেয়ে বেশি।

পরবর্তী সময়ে দীপালি হিনালয়ের একাধিক শৃঙ্গ জয় করেছেন। ৬৭ সালে রেকর্ড গড়ার পরে ১৯৬৯ সালে ফের shigri parbat expedition করেন। গোটা সত্তর দশক জুড়েই ছিল একের পর এক অভিযান। তবে দেশের প্রথম তরুণী পর্বতারোহী অভিযাত্রীদের দলটি ফের কখনও একসঙ্গে পর্বতাভিযান করেননি। এ প্রসঙ্গে দীপালি জানালেন, মেয়েরা সব সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেয়েদের পক্ষে সংসার করাটা তো একটা বড় বাধা। সংসার মেয়েদের কত কাজ সারতে দেয় না!

এক ছেলের মা দীপালিদেবী। জীবনে নানা ধরণের কাজ করেছেন। নিজে শ্রীশিক্ষায়তনের ছাত্রী। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে টানা ৯ বছর ইংরেজি পড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী। 

মহিলা পর্বতারোহণের ভারত ইতিহাসে সময়ের নিরিখে একজন বীর নেত্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন দীপালি। এ কথা রেকর্ড মাফিক সত্য। এখন কেমন আছেন, তা জানতে চাইলে দীপা‌লি কিছুটা অভিমানী হয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, ‌পর্বতারোহণ-সহ অন্যান্য অভিযানমূলক খেলা নিছক ফ্যাশান হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। প্রকৃতিকে ভালোবেসে মানুষ প্রকৃতির কাছে যাক। প্রকৃতির বিপুলতা মানুষকে উপলব্ধি করাবে, মানুষ আসলে ক্ষুদ্র।