শৈশব মনে পড়লে যন্ত্রণায় কাতরে ওঠেন রায়না

0

সুরেশ রায়না। ভারতীয় ক্রিকেটের ভীষণ পরিচিত এবং ভীষণই সফল ক্রিকেটার। আই পি এল ক্রিকেট ম্যাচই হোক কিংবা আন্তর্জাতিক ট্যুরনামেন্ট সুরেশ একজন অনিবার্য নাম। এইটুকু তো প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের জানা। কিন্তু আজ আমরা গল্প বলব একটি শিশুর, যে তার অন্ধকারাচ্ছন্ন শৈশবের বুক চিড়ে উঠে আসা একজন তুবড়ি, তাঁকে বাদ দিয়ে আজ কোনওভাবে তৈরি হয়না প্রথম এগারোর ক্রিকেট দল।

ছেলেবেলা থেকে অভাবের সংসারে মাটিতে শুয়ে অভ্যেস। এখনও সেই স্বভাব পিছু ছাড়েনি। বিছানায় শুয়ে আরাম পান না রায়না। 

বাড়ির আদর, বাবা মায়ের আদর থেকে দূরে এক হোস্টেলে বড় হয়েছেন। প্রতিটি দিন যেখানে ছিল এক একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। একবার ম্যাচের জন্য ট্রেনে চেপে চলেছেন। দুটো বার্থের মাঝখানের মেঝেতে নিউজ পেপার বিছিয়ে ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ বুকের ওপর ভারি চাপ, চোখ মেলার আগেই হাত মেঝেতে ঠেসে ধরা হয়েছে। বেশ বড় একটি ছেলে ওঁর মুখের ওপর প্রসাব করে দেয়। কিছুক্ষণ হাতাহাতি চলে। চলন্ত ট্রেনের গতি খানিক মন্দনে। সুরেশের কথামতো ঘুষি মেরে সেই ছেলেটিকে ট্রেন থেকে ফেলে দেন তিনি। বছর তেরোর সুরেশ অনেক লড়াই করেছেন উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্নৌ স্পোর্টস হোস্টেলে জায়গা করে নিতে। কোচের প্রিয় পাত্র ছিলেন রায়না। সহ্য হতো না বাকিদের। হোস্টেলের বড় ছেলেরা হিংষে করত তাঁকে। কারণ তারা সব ওখানে চার বছর থেকে হাসিল করতে চায় সার্টিফিকেট আর রেলে স্পোর্টস কোটায় চাকরি। পাছে সুরেশ তাদের পেছনে ফেলে বাজিমাত করে ফেলেন। তাই অ্যাথলেটিক্স ব্রাঞ্চের ছেলেদের অকথ্য দুর্ব্যবহার। পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হচ্ছিল। তাঁর দুধের পাত্রে ফেলে দেওয়া হতো বর্জ্য। পাতলা ওড়না দিয়ে ছেঁকে তাই খেয়ে নিতেন। হাড় কাঁপানো শীতের রাত। তিনটে বাজে। তাঁর গায়ে ঢেলে দেওয়া হতো এক বালতি ঠান্ডা জল। সুরেশের মনে হতো উঠে " দি দুঘা "। কিন্তু একজনকে মারলে ঝাঁপিয়ে পড়বে চারপাঁচজন। সিনিয়রদের অত্যাচারে অতিষ্ট ছেলেটি সুইসাইডের চেষ্টাও করে। শেষে হোস্টেল ছেড়ে দেন। না রণে ভঙ্গ দিতে নয়, বরং নতুন রণসজ্জায় ফিরে আসার শপথ নিয়ে।

ঘুরে দাঁড়ালেনও বটে। মুম্বাই থেকে ডাক আসে এয়ার ইন্ডিয়ার হয়ে খেলতে। জীবনের মোড় ঘোরাতে এই ঘটনাকেই দায়ি করছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, উত্তরপ্রদেশে থাকলে ছোট ছোট খেলার মধ্যে দিয়েই ফুরিয়ে যেতেন। এয়ার ইন্ডিয়ার প্রভিন আমরে অনেক সাহস জুগিয়েছেন। জীবন অন্য খাতে বইতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার হয়ে দশ হাজার টাকা স্কলারশিপ পান তিনি। আট হাজার টাকাই পাঠিয়ে দেন বাড়িতে। প্রতিটি পয়সার মূল্য বুঝতেন। মনে পরে গেল, দু মিনিটের বেশি এস টি ডিতে কথা বলতেন না। নইলে একলাফে চার টাকা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

আই পি এল সুরেশের জীবনের আরেক টারনিং পয়েন্ট। হাঁটুর আঘাত কেড়ে নিয়েছে খেলোয়াড়ের কিছু মূল্যবান সময়। কঠিনতম সেই দিনগুলোতে মনে হতো বুঝি শেষ হয়ে গেল ক্রিকেট কেরিয়ার। মাথায় আশি লাখ টাকার ঋণের বোঝা। তবে দমে যাননি। ফিরে এসেছেন সগৌরবে। আবার দাপিয়ে বেরিয়েছেন ক্রিকেট দুনিয়া। ২০১৫-র এপ্রিলে প্রিয়াঙ্কা চোধারিকে বিয়ে করেন। প্রিয়াঙ্কা আমস্টারডামের একটি ব্যাঙ্কে আইটি প্রফেশনাল। বিয়ের পর আরও অনেক বেশি স্থিতধি আর দায়িত্বশীল হয়েছেন রায়না। আগে তিনি শুধু মগ্ন হয়ে খেলতেন। আজকাল কন্ট্রাক্ট মন দিয়ে পড়েন। সময়ের সদউপয়োগ করতে শিখেছেন। প্রিয়াঙ্কার হাত ধরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন। তাঁদের জীবনে সম্প্রতি আগমন ঘটেছে এক ছোট্ট অতিথির। সুরেশ আর প্রিয়াঙ্কার একটি কন্যা সন্তান জন্মেছে। ইদানিং সুরেশের মনে হয় কাজ অনেক অনেক বাকি কিন্তু হাতে সময় বড্ড কম।