কোন অদক্ষতার সমাধান করছে আপনার সংস্থা?

TechSparks2016-র মঞ্চে প্রশ্নটা সরাসরি রাখলেন FreeCharge এর প্রতিষ্ঠাতা কুণাল শাহ। 

2
গত দশ বছর আগে ঠিক কোন পণ্য এবং পরিষেবাটি সব থেকে বেশি নিপুণ এবং দক্ষ ছিল? এই প্রশ্নের কোনও সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ সমস্ত নৈপুণ্য বা দক্ষতা যা তৈরি হয়েছে সবই ভবিষ্যতে কথা ভেবে। এবং এটাই মানুষের বিশেষত্ব যে তারা পণ্য এবং পরিষেবা দিয়ে নৈপুণ্যকে নির্মাণ করে।

- এই দার্শনিক, আপাত দুর্বোধ্য উক্তিটি কুণাল শাহর। ফ্রিচার্জের প্রতিষ্ঠাতা। টেক স্পার্কের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দক্ষতার পাঠ পড়ালেন তিনি। শেখালেন ডেল্টা ফোরের তত্ত্ব। বললেন প্রোডাক্ট তৈরি করতে হলে চাই ব্র্যাগওয়ার্দি প্রপোজিশন।

আজকের উপভোক্তা লক্ষ লক্ষ যন্ত্রণার শিকার। যেমন ধরুন কীভাবে দ্রুত ছবি আপলোড করা যাবে! কীভাবে দ্রুত ফান্ডিং পাওয়া যেতে পারে! কিংবা পরীক্ষায় আরও ভালো নম্বর কীভাবে আনা যায়! প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এমন একটি ব্যবস্থার উপত্যকায় যেখানে অদক্ষ পটুত্বই রয়েছে। আর এখানেই সুযোগ। আপনার চেষ্টা হওয়া উচিত উপভোক্তাকে উচ্চশ্রেণির একটি সুচতুর পটুত্বের সঙ্গে পরিষেবা উপহার দেওয়া। এবং এই ভাবেই আপনি আপনার সম্পদও সৃষ্টি করতে পারেন। এটাই সাফল্যের সুলুক। কুণাল স্যারের প্রবচনে স্তব্ধ গোটা হল ঘর। ইওরস্টোরির টেক স্পার্কের মঞ্চে এক্সপার্টদের ম্যারাথন নলেজ শেয়ার চলছিল। কুণাল শাহ বলছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিমায়।

সরাসরি প্রশ্ন, আপনি কী করে জানলেন, যে আপনি দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছেন? আমাদের অনেকেই অনেক কিছু তৈরি করি। এবং তার ৯৯ শতাংশই সফল হয় না। যেমন ধরুন রেলের টিকিট কাউন্টারে যাওয়া এবং আইআরসিটিসির মারফত টিকিট বুক করা। কুণাল বলছেন যারা অনলাইনে টিকিট কাটার মজা পেয়েছেন তাঁরা অধিকাংশ সময়ই আর লম্বা টিকিটের লাইনে দাঁড়ান না। ফলে ফান্ডাটা সফল হয়েছে। সেক্ষেত্রে এটার ডেল্টা পয়েন্ট চারের বেশি। যখনই আপনি এই রকম চার পয়েন্টের ডেল্টা ছুঁয়ে ফেলছেন তখনই আপনি দক্ষতার মাপকাঠিতে সঠিক বিন্দুটা ছুঁয়ে ফেলছেন।

যখনই এই ডেল্টা ফোর ব্যাপারটা তৈরি হয়ে যায় তখন আর আপনি আগের অদক্ষ কিংবা কমদক্ষ সিস্টেমে ফিরে যেতে চান না। সেটা হতে পারে ওলা কিংবা উবেরে গাড়ি বুক করা কিংবা অনলাইনে টিকিট বুক করা অথবা অনলাইনে কোনও বিল চোকানো। ইউ এস পি বলতে আমরা সবাই জানি ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন। কিন্তু কখনও ইউবিপি শুনেছেন? UBP হল Unique brag-worthy Proposition যারা প্রথম পেলেন এই প্রপোজিশনের হদিস, তারা জেনে রাখুন এই bragworthy শব্দটার আভিধানিক অর্থ হল Worth Bragging about, Brag মানে লোক দেখিয়ে বেড়ানো, হামবড়া করা,

সেই ভাবে দেখতে গেলে আর পাঁচজনের তুলনায় সব থেকে বেশি স্মার্ট হওয়ার যোগ্যতাকে বোঝাচ্ছেন কুণাল। ট্রুকলারের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, কোথাও একটাও বিজ্ঞাপন না দিয়েও এই অ্যাপ গোটা বিশ্বে দুর্দান্ত সফল। কারণ সকলেই এর কথা অন্যের মুখে শুনে শুনে ডাউনলোড করেছেন। তারপর এর ফাণ্ডাটা যখন ভালো লেগেছে তখন কেউ আর পুরনো অদক্ষ অকেজো সিস্টেমে ফিরে যেতে চাননি।

একবার ডেল্টা ফোরের খোঁজ পেলে ব্যবহারকারী অসীম ধৈর্য দেখান। আবারও ধরুন আইআরসিটিসির উদাহরণ। সমস্যা কি নেই, আলবত আছে। কিন্তু তাবলে উপভোক্তা সহজে রেলের কাউন্টারে ফর্ম ফিলাপ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে চান না। ফলে আপনাকে এবার ভাবতে হবে আপনি উপভোক্তাকে কী দেবেন।

আপনি যদি ডেল্টা ফোর তৈরি করতে না পারেন, তাহলে জানবেন সম্পদ তৈরি করতে পারবেন না। ধরুন আপনি অনলাইনে শার্ট কেনা আর অফলাইনে শার্ট কেনার সঙ্গে তুলনা করুন। এটা এমন কোনও ডেল্টা ফোর তৈরি করতে পারল না। কারণ অফলাইনে শার্ট কেনাটা এখনও ক্রেতা যন্ত্রণা মনে করেন না। অনেকের মনে হয় এখনও হাতে ধরে দেখে কিনলে ভালো জিনিস পেতে পারবেন। ফলে এই অফলাইন সিস্টেমটা অদক্ষ বিবেচিত নয়। ফলে সুযোগের সোনার ঘড়াটা এখনও মুখ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।

ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট দিয়ে ওই স্বর্গীয় সুখ দীর্ঘ সময়ের জন্যে দেওয়া সম্ভব নয়। এটা কোনও সাস্টেনেবল মডেলই নয়। লন্ড্রি অ্যাপের উদাহরণ দিয়ে কুণাল বলছেন, অ্যাপের মারফত আপনার জামা কেঁচে ইস্ত্রি করে দেওয়ার ব্যাপারটা ভালো কিন্তু ভারতের মাটিতে সব থেকে ভালো উপায় হল একটা কাপর কাচার লোক রাখা। তাই নয় কি! কিন্তু বিলেতে এটা দারুণ কাজের। এবং ডেল্টা ফোর অভিজ্ঞতা দিতে পারে এই অ্যাপ কারণ সেখানে কাজের লোক রাখা বেশ খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার তুলনায় লন্ড্রি অ্যাপ অনেক সস্তায় পরিষেবা দিচ্ছে।

যে যে জিনিস গুলো ডেল্টা ফোর অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কাজ করে না

১) ক্রয় ক্ষমতা- ধরুন প্লেনে যাত্রা করা, ট্রেনের তুলনায় প্লেনে যাত্রা করার ডেল্টা ভ্যালু বেশি হওয়া সত্যেও পকেটে পয়সা না থাকলে লোকে কী করবে!
২) ইংরেজির মত ভাষা কিংবা স্যাপ বা ট্যালির মত সফ্টঅয়্যার
৩) হোয়াটসঅ্যাপের মত একটা প্রোডাক্ট যদি ইতিমধ্যেই থাকে
৪) কিছু কিছু কাজের জন্যে ব্র্যান্ডের নামটাই যখন গোটা ব্যাকরণটাকেই ঘেঁটে দেয়। যেমন- জেরক্স কর, গুগল কর ইত্যাদি। সেক্ষেত্রে একই কাজে অন্য কোনও প্রোডাক্ট বানানোর কোনও মানেই হয় না।

উদ্যোগপতিদের পরামর্শ দিলেন কুণাল বললেন,

ডেল্টা ফোরের মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে কোনও প্রোডাক্ট তৈরি করবেন না প্লিজ। এটা আপনার লঙ টার্মে ক্ষতিই করবে।

আর যদি কোনও আইডিয়া মাথায় ঘুরপাক খায়, তাহলে আগে ভাগে প্রোডাক্টটা বানাতে ছুটবেন না। অপরিচিত লোকেদের জিজ্ঞেস করুন, অন্য উদ্যোগপতিদের সঙ্গে কথা বলুন। ওরাই আপনাকে সব থেকে কঠিন ভাষায় সমালোচনা করবে। মোহগ্রস্ত হয়ে নয়, বিবেচনা করে তৈরি করতে হবে ডেল্টা ফোর। দর্শনের স্নাতক হয়েও যখন ফ্রিচার্জ তৈরি করি তখন, একটা রাফ ভার্সন বানিয়ে অপরিচিত লোকেদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওরা এটা ব্যবহার করতে চান কিনা। ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে তবে তৈরি করেছি এই প্রোডাক্ট, অদক্ষ একটি ব্যবস্থাকে শুধরে দিতে।