নারী স্বাধীনতার তিতুমীর রুক্মিণী রাও

0

রূপোলি পর্দায় রানি মুখার্জির মর্দানি দর্শকদের মন জয় করেছে। সমাজের একটা অন্ধকার দিকও তুলে ধরেছে এই ফিল্ম। বক্স অফিসে রানির সেই মর্দানি প্রায় জীবনভর রিয়েল লাইফে করে আসছেন বব কাট চুলের এই মহিলা। নাম রুক্মিণী রাও। নারী স্বাধীনতার হয়ে সওয়াল করা এই প্রৌঢ়া হায়দরাবাদে সুপরিচিত।

রুক্মিণী রাও
রুক্মিণী রাও

সাতের দশকের মাঝামাঝি পণের দাবিতে বধূহত্যা নিয়ে সমাজের একটা শ্রেণিতে তখন তোলপাড় হচ্ছে। দিল্লির ন্যাশনাল লেবার ইন্সিটিটিউট অ্যান্ড পাবলিক সেন্টার ফর কন্টিন্যুইয়িং এডুকেশনে কাজ করতে করতে সমাজের এই নির্মম দিকটার সঙ্গে পরিচয় হয় রুক্মিণীর। তিনি তখন সদ্য চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। মহিলাদের প্রতি এই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রুক্মিণী। ১৯৮১ সালে দিল্লিতে তৈরি করেন সহেলি রিসোর্স সেন্টার ফর উইমেন। সেই শুরু। পরের তিনটে দশক, নারী স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান সেনানি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন রুক্মিণী।

জন্ম হায়দরাবাদে। দু-বছর বয়সেই বাবাকে হারান। তারপর থেকে মা, ঠাকুমা, বড় মায়ের মাঝেই বেড়ে ওঠা। রুক্মিণীর দুই ভাই। কিন্তু বাড়িতে সকলেকই সমান চোখে দেখা হত। ছেলে বলে ওদের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হত না। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রুক্মিণী জানিয়েছেন, ‘ছুটিতে যখন আমরা বড় মা-র কাছে যেতাম, তখন পছন্দের জিনিস কেনার জন্য বড়মা সকলকেই সমান টাকা দিতেন’। রুক্মিণীর মা মেয়েকে কখনওই বাবার অভাব টের পেতে দেননি। শহরের সেরা স্কুলে মেয়েকে পড়িয়েছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহ জুগিয়েছেন। মা-ঠাকুমার বাৎসল্যে বেড়ে উঠতে উঠতেই বোধহয় জীবনে মায়েদের গুরুত্ব টের পেয়েছেন রুক্মিণী। আর তাই পরবর্তী সময়ে মহিলাদের হয়ে লড়াইয়ের সুযোগ আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মনস্তত্ত্ব নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার পর হায়দরাবাদের সেন্ট ফ্রান্সিস কলেজ ফর উইমেনে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তারপর পিএইচডি-র জন্য চলে যান দিল্লি।

রান্নাঘরে আগুনে পুড়ে গৃহবধূর মৃত্যুকে যখন নিছক দুর্ঘটনার মোড়কে তুলে ধরা হত, তখন সেই সব মৃত্যুর অন্তর্তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হতেন রুক্মিণী। নিজের হাতে গড়ে তোলা সহেলি রিসোর্স সেন্টার ফর উইমেনের মাধ্যমে প্রতিবাদের এই আওয়াজকেই কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি। পাশে পেয়ছিলেন তাঁরই মতো অনেক সহেলিকে।

নিজের জন্মস্থানে মহিলাদের উন্নয়নে কাজ করার তাগিদ ১৯৮৯ সালে রুক্মিণীকে হায়দরাবাদে ফিরিয়ে আনে। হায়দরাবাদে তখন মহিলাদের আইনের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানকার গ্রামীণ মহিলাদের সার্বিক বিকাশের ঘাটতি ছিল। ‘নারী কল্যাণের স্বার্থে নিজেকে গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম, হায়দরাবাদে চেনা পরিবেশে কাজ করলে এই লক্ষপূরণে সুবিধা হত’, দিল্লি ছেড়ে আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একথাই জানিয়েছেন রুক্মিণী। মহিলা কৃষকদের অধিকার কায়েম করতে এরপর ডেকান ডেভেলপমেন্ট স্যোসাইটির সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন। তিনি এখন সংস্থাটির বোর্ড সদস্য ও অধিকর্তা।

এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একাধিক কর্মশালার আয়োজন করেছেন। সেই কর্মশালায় যোগ দেওয়া মহিলারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন, বুঝতে শিখেছেন কীভাবে পরিবারকে সামলাতে হয়।

এতো গেল গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের কথা। নয়ের দশকের মাঝামাঝি রুক্মিণী অন্ধ্রপ্রদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতে বেশ কিছু সমস্যা লক্ষ করেন। সমস্যা না বলে বোধহয় সামাজিক ব্যাধি বলা ভাল। বাড়িতে যমজ মেয়ে হলেই তাদের বিক্রই করে দেওয়া হত। ১৯৯৭ সালে গ্রাম্য রিসোর্স সেন্টার ফর উইমেনে যোগ দিয়ে এই সমস্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান রুক্মিণী। বন্ধু পি যমুনাকে সঙ্গে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে কাজ করা শুরু করেন। চাঁদমপেট মণ্ডল নামে এক ব্লক দিয়ে যে সচেতনতা অভিযান শুরু হয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বারোটি প্রত্যন্ত গ্রামে। আটশোরও বেশি মহিলাকে তাঁরা নতুন করে ভাবতে শিখিয়ে আত্মনির্ভর করে তোলেন। সারা দেশের মেতা অন্ধ্রপ্রদেশের গ্রামাঞ্চলের কন্যাভ্রুণ হত্যা এক সমস্যা যেমন ছিল, তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে ব্যাপক হারে শিশুকন্যা ‌পাচারের কথাও রুক্মিণীরা জানতে পারেন। একাধিক অভিযান চালিয়ে তাঁরা এই পাচার তো রোখেনই, সেই সঙ্গে এই অপরাধের সাথে যুক্ত একাধিক বেআইনি অ্যাডপশন সেন্টারেও তালা ঝুলিয়ে দেন। রুক্মিণীর কথায়, ‘এই ধরণের সামাজিক সমস্যাগুলি দূর করতে এক চিন্তাশীল মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে তোলা জরুরি।

এত সব কঠিন লড়াইয়ের যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই রুক্মিণী রাও-এর সঙ্গে কথা বললে চমকে যেতে হয়। কথাবার্তা ও ব্যবহারে এতটাই নম্র যে লড়াকু সেই মানুষটার সঙ্গে বাইরে থেকে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। 

রুক্মিণী রাও আজ অনেকের কাছেই রোল মডেল। কিন্তু তাঁর রোল মডেল কে? 

অবলিলায় বলছিলেন রুক্মিণী যে কমলা নামে দক্ষিণ দিল্লির নিজামুদ্দিন বস্তির এক কাজের মেয়েই নাকি তাঁর কাজের অনুপ্রেরণা। মত্ত স্বামী আর চার সন্তানের সংসার সামলেও যিনি রুক্মিণীদের সহেলি নামক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সংস্থার তহবিলে টান পড়লে সেই মহিলাই দোরে দোরে অর্থ সংগ্রহে বেরোতেন। দরিদ্র মানুষের এই মহানুভবতা রুক্মিণীকে মুগ্ধ করেছিল। 

সমাজের জন্য জীবনভর লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে প্রচুর সম্মান পেয়েছেন। এদেশে তো বটেই, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, চিনের বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ফেলোশিপ দিয়েছে। নারী কল্যাণ ও মেয়েদের সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সম্মেলনে তিনি বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর মুকুটে সর্বশেষ পালক – সমাজে প্রভাব ফেলার স্বীকৃতি হিসেবে ফেমিনা সম্মান।

সারাটা জীবন যিনি অপরের জন্য কাজ করে গেছেন, অনেক ভাঙা সংসার জোড়া লাগিয়েছন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অতটা গোছানো নয়। মাত্র আঠেরো বছর বয়সেই বিয়ে করতে হয়েছিল। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পেরে বছর ছয়েক পর তিনি সেই সম্পর্ক ইতি টানেন। ছেলেকেও রেখে আসেন স্বামীর জিম্মায়। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন কিন্ত তাও টেকেনি। কিন্তু কিছুতেই তিনি সরে আসেননি তাঁর মিশন থেকে।