মালদহের দেবজ্যোতি সুরেসুরে ভুবন ভরান

0

ছেলেবেলায় ছিল তুমুল আগ্রহ। রুটি-রুজির তাগিদে সখের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। একটু থিতু হওয়ার পর ফের পুরনো ভুবনে ফেরা। মাউথ অর্গান তুলে নিয়ে নতুন সরণিতে মালদহের ইংরেজবাজারের দেবজ্যোতি গুপ্ত। গোল্ডেন ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে নাম তু‌লেছেন। তাঁর নতুন ইনিংসের সুবাদে ইংরেজবাজারে মাউথ অর্গানের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

দেব আনন্দ, জয় ব্যানার্জি, শাম্মি কাপুরদের মুখে সুরের ঝড়ের কথা মনে পড়ে। ষাট, সত্তর দশকের সেই সব কালজয়ী সব গান। যে গানের শুরুটা এই সব অভিনেতাদের মাউথ অর্গানে ছন্দ খুঁজে পেত। ছেলেবেলায় সিনেমায় অভিনেতাদের মুখে এই অদ্ভুত যন্ত্রের কারসাজির হাতছানি এড়াতে পারেননি দেবজ্যোতি গুপ্ত। মাউথ অর্গানের প্রতি এতটাই বুঁদ হয়ে যান যে এটাই মনে হয়েছিল জীবনের পথ। মাউথ অর্গানের পাশাপাশি টেবিল টেনিসেও ছাপ ফেলেছিলেন তিনি। রাজ্যস্তরে নিয়মিত খেলেছেন মালদহের হয়ে। কিন্তু টানাটানির সংসারে প্রাণের চেয়ে প্রিয় যন্ত্রটির সঙ্গে নিতান্ত বাধ্য হয়ে দূরত্ব রাখতে হয়েছিল। টিটির সঙ্গেও আড়ি হয়ে গিয়েছিল। জীবন বিমা নিগমের কাজ করে ভদ্রস্থ আয়ের পর আবার ফিরে আসেন চেনা জগতে। বছর পাঁচেক আগে অল ইন্ডিয়া মাউথ অর্গান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। এরপরই দ্বিতীয় ইনিংস আরও গতি পায়। সর্বভারতীয় সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেবজ্যোতিবাবু বুঝতে পারেন ভিতরের আগুন জ্বালানোর এটাই সেরা সময়। শুরু হয় নতুন উদ্যমে সাধনা।

গত বছরের তেসরা অক্টোবর ছিল দেবজ্যোতির জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। ইন্দোরে অল ইন্ডিয়া মাউথ অর্গানের অনুষ্ঠানে দুশো জন মাউথ অর্গান শিল্পী একসঙ্গে পারফর্ম করেন‌। দশ মিনিটের মধ্যে তেরোটি গানের সুর তোলা হয়। একসঙ্গে এতজন শিল্পীর অনুষ্ঠান করা নজিরবিহীন। এই টিমের অন্যতম সদস্য হিসাবে গোল্ডেন ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে স্বীকৃতিও পেয়েছেন এই বঙ্গসন্তান। এই কনসার্টে যোগ দেওয়ার দেবজ্যোতি গুপ্তর তাগিদ যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। মালদহের বিভিন্ন জায়গায় মেলা, প্রদর্শনীতে এই বাজনার গুরুত্বর কথা সুরের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন। ব্যস্ততার মধ্যেও দিনে অন্তত এক ঘণ্টা তাঁর মাউথ অর্গান নিয়ে বসা চাই।

শুভানুধ্যায়ীদের কাছে ইংরেজবাজারের বিএস রোড এলাকার বাসিন্দা অবশ্য রাজাদা নামেই বেশি পরিচিত। রাজাদাকে দেখে এখন অনেকেই মাউথ অর্গান নিয়ে খোঁজ নিচ্ছে। নিজেদের মতো করে সুর তোলার চেষ্টা করছে। ইংরেজবাজারে যারা এক সময় মাউথ অর্গান শেখাতেন তাদের কাছে নতুন প্রজন্ম আসছে। এই বিষয়টা কিছুটা হলেও দেবজ্যোতিবাবুকে তৃপ্তি দেয়। ধুলো সরিয়ে তিনি যেভাবে মাউথ অর্গানকে আপন করে নিয়েছিলেন, অনেকটা তেমন ভাবে মাউথ অর্গানের ভবিষ্যত.. অন্ধকার বলে যারা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন তারাও নতুন স্রোতে গা ভাসিয়েছেন। শিল্পীর কথায়, ‘‘কাকা অমিত গুপ্তও বাজাতেন। উনি বেশি দূর চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। আমি সেই আক্ষেপটা সুরের মাধ্যমে মেটাতে চাই।’’ এই আজব নেশার সঙ্গে শিল্পী দারুণভাবে পাশে পেয়েছেন পরিবারকে। তাঁর চোদ্দ বছরের ছেলে দেবদীপ এখনই যন্ত্রকে বাগে আনার কৌশল রপ্ত করেছে। এমন আরও অনেক দেবদীপ উঠে এলেই নিশ্চিন্ত হতে চান শিল্পী।