"...আমরা কাজ করি আনন্দে"- শ্রদ্ধা শর্মা

0

"সকলের সঙ্গে চলা সহজ। কিন্তু যখন দলছুট হয়ে নতুন কিছু করতে চাই তখন টের পাই জীবনটা অত সোজা নয়। অবশ্যই ভিড়ের কোনও চেহারা হয় না। সবাই সেখানে মিলে মিশে একাকার। সেখানে হারিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর। ভিড়ের ভিতর মিশে গিয়ে, অনুল্লেখ নিয়ে দিনগত পাপক্ষয় করতে চান না এমন মানুষও তো আছে এই ছোট্ট গ্রহটায়। যারা ভিড় থেকে বেরিয়ে নিজের রাস্তা নিজেরাই তৈরি করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যান। তারাই আসলে নিজেদের সঙ্গে সুবিচার করতে পারেন। নিজেদের সম্মান করেন।" টেক স্পার্কের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একথাই বললেন ইওর স্টোরির প্রধান সম্পাদিকা শ্রদ্ধা শর্মা।

কয়েক হাজার টেক স্টার্টআপ আর উদ্যোগপতিদের করতালিতে ফুটে উঠল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃপ্ত প্রতিশ্রুতি। টেকস্পার্ক ৬ এর মঞ্চে একের পর এক সাফল্যের মন্ত্র দিয়ে গেলেন শ্রদ্ধা।

নিজেকে এবং নিজের কাজকে ভালোবাসুন

নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং অপরকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাই জোর দিয়ে বললেন শ্রদ্ধা। বললেন, "আমি যখন বেঙ্গালুরু এসেছিলাম তখন একটি অনুষ্ঠানে বিখ্যাত কিছু লোকের সঙ্গে আলাপ হয়। ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি কী করি। আমি বলেছিলাম ইওরস্টোরি করি। ওরা জানতে চাইছিল কখন করি দিনে করি না রাতে করি, আমি উত্তর দিয়েছিলাম দুবেলাই করি। ওরা হয়ত ভেবেছিল তার মানে আমার কোনও বিজনেস প্ল্যান নেই। আমার সঙ্গে কথা বলা মানে সময় নষ্ট করা। কিন্তু আমি অনড় ছিলাম। নিজের কাজকে ভালোবাসলে দিনরাত এক করে সেই কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে নিজের কাজকে সম্মান করলেই লোকে আপনার কাজকে আপনাকে সম্মান করবে। পাশাপাশি অপরের কাজেরও গঠনমূলক সমালোচনা করুন। খালি নিন্দে নয়। একটু প্রশংসাও করুন। দেখবেন অন্যরাও আপনার কথা বলছে। আপনার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছে।"

স্টার্টআপ সংস্থার কর্ণধারে ঠাসা টেকস্পার্কের অডিটোরিয়ামের সকলকেই বললেন একে অপরের সম্পর্কে জানুন। নিজের সম্পর্কে অপরকে জানান। তাহলেই সঠিক অর্থে মেলবন্ধন তৈরি হবে।

শ্রদ্ধার সৌজন্য টোটকা

শ্রদ্ধা বলছিলেন ২০১০ সালে তিনি যখন ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট খোলেন। তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন বিখ্যাত লোকেরা তার জন্য ট্যুইট করবেন। ইওর স্টোরির হয়ে ট্যুইট করবেন। কিন্তু ওঁর ভাষায় শ্রদ্ধা তখনও সাধারণ মানুষ। শুধু তাই নয় যার সম্পর্কে মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে তাঁর কাছে কোনও বিজনেস আইডিয়াও নেই। উনি কেবল স্টোরি লেখেন। এরকম অবস্থায় ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ একটা কাণ্ড করলেন শ্রদ্ধা। বলছিলেন, "আমি লোকেদের ট্যুইটকে রিট্যুইট করা শুরু করি। মানুষকে বলতে শুরু করি আপনি অসাধারণ। আপনার আইডিয়া অসাধরণ। ক্রমাগত করে গেলাম। দেখতে দেখতে দারুণ একটা ব্যাপার শুরু হল। লোকেরা আমাকে জানতে শুরু করলেন। আমার সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে শুরু করল। কাউকে ভালো বলতে তো পয়সা লাগে না। অসুবিধে কোথায়। অপরকে কৃতীত্ব দিন। অন্যেরাও আপনাকে দেবে। ইওর স্টোরি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা শুধুমাত্র নিজের পায়ে নিজের দমে দাঁড়িয়ে আছে।"

আনন্দে থাকুন, থাকাটা প্র্যাক্‌টিস করুন

আপনি আনন্দে থাকুন। না হলে আনন্দে থাকা প্র্যাকটিস করুন। রোজ দিনটা শুরু করুন হাসি দিয়ে। দেখবেন সার্বিকভাবে ভালোই হবে। শ্রদ্ধা বলছেন আপনি বরং নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন। রোজ। কীভাবে আপনি আনন্দে থাকতে পারবেন এবং অপরকে আনন্দে রাখতে পারবেন। অপরের ভালো কী করে হবে সেই কথাই ভাবুন বরং। আপনার ভালোটা আপনা আপনিই ম্যাজিকের মত হয়ে যাবে। আপনার চেহারায় সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। জয়ের সব থেকে বড় মন্ত্র হল এটাই। খুশি থাকুন। খুশি থাকা প্র্যক্‌টিস করুন।

তাকেই বরং বেশি খাতির করুন যে আপনাকে বোঝে না

উদ্যোগপতিদের জন্যে শ্রদ্ধার আরও একটা টোটকা, যে বা যারা আপনাকে একদমই বোঝে না, খালি নিন্দে করে, তাচ্ছিল্য করে, বারবার বলে আপনার দ্বারা এটা হবে না, ওটা আপনার কাজ নয়, ঠিক বেছে বেছে তাদের সঙ্গেই শান্ত ভাবে মিশুন। মন খুলে কথা বলুন। ভদ্রতা দিন। ভালোবাসুন। দেখবেন ম্যাজিকের মত কাজ দিচ্ছে। "সাত বছর আগে আমি মুম্বইয়ে যখন ইওর স্টোরি খোলার ব্যাপারটা প্রথম ঘোষণা করলাম আমার কথা শুনেই এক বিখ্যাত মানুষ আমাকে প্রায় নস্যাত করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এসব সাতদিনও চলবে না। আমি খুব কেঁদেছিলাম। বাবাকে ফোন করে খুলে বললাম। তখন বাবা আমায় একটা মোক্ষম কথা বলেছিলেন। দেখো শ্রদ্ধা আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম তুমি বিয়ে থা করে সংসারী হয়ে যাও। তখন শোনোনি। এখন যখন ময়দানে নেমেই পড়েছো তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই করো। ঘরোয়া মেয়েদের মত কান্নাকাটি ছাড়ো আর দুনিয়ার মুখের ওপর জবাব দাও। সাত বছর পর এই সেদিন আমার আবারও ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হল। ওই ভদ্রলোক আমাকে বললেন দেখো শ্রদ্ধা আমি তো তোমার ভালোর জন্যেই বলেছি। আমি তোমার উৎসাহ বাড়াতে চেয়েছিলাম। তাই ওসব বলেছিলাম। দেখো তো কী দারুণভাবে সেটা কাজে লেগে গেছে। আজকে তুমি কত সফল। আমি তখন শুধুই হাসলাম।"

শ্রদ্ধা মনে করেন লাগাতার হাসি মুখে কাজ করে যাওয়াটা একটা তপস্যার মত। নিরন্তর এই তপস্যাটা যে বা যারা করে যেতে পারবেন তাঁরাই দুনিয়ার মুখের ওপর জবাবটা দিতে পারবেন।