মহিলা ক্রেতাদের নতুন সঙ্গী - অনলাইন প্রোডাক্ট ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম

0

একটা সময় ছিল যখন দোকানের বাইরে থেকে কাচের ভিতরে সাজিয়ে রাখা একজোড়া জুতো বা কোনও ড্রেস দেখে পছন্দ হলেই আমরা দোকানে ঢুকে তা কিনে ফেলতাম। আবার অনেক সময় শুধু বাইরে থেকে জিনিস দেখেই চলে আসতাম। যাকে বলে 'উইন্ডো শপিং'। আর এখন, অনলাইন শপিংয়ের এই যুগে, বিভিন্ন প্রোডাক্ট ডিসকভারি পোর্টালই হয়ে উঠেছে নতুন 'স্টোর উইন্ডো'।

বেঙ্গালুরুতে তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় কর্মরত বছর পঁচিশের নীনা সুকুমার, লেটেস্ট ফ্যাশন ট্রেন্ডের সবরকম খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু ব্যস্ততার মাঝে সবসময় দোকান বা শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারে না। তাই তাঁর সহায় এখন Wooplr। এটি একটি সোশ্যাল ডিসকভারি অ্যাপ যা ফ্যাশন এবং লাইফস্টাইলের সুলুক সন্ধান দেয়। প্রতিদিন এই অ্যাপ বিভিন্ন অনলাইন স্টোরের নতুন স্টাইল এবং প্রোডাক্ট সম্পর্কে পোস্ট করে। 'আমি একদিন অন্তর Wooplr এর পোস্ট চেক করি। এতে সবরকম দামের এবং ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। ফলে আমিও সহজেই কত করচ হতে পারে, বা কদিনের মধ্যে ডেলিভারি পাব সেই সব তথ্য পেয়ে যাই।'এমনকী কোন জামার সঙ্গে ম্যাচ করে কী কী পরা যেতে পারে সেই মতামত পর্যন্ত এই অ্যাপ থেকেই নেন নীনা।

ক্রেতাদের ইন্টারনেটে নিয়ে এসেছে ই-কমার্স, আর কীভাবে তাঁরা শপিং করবেন সেই পথ দেখাচ্ছে অনলাইন প্রোডাক্ট ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম। আর বাড়তে থাকা ইন্টারনেটের ব্যবহার আর স্মার্টফোনের দৌলতে অধিকাংশ মহিলাই এখন অনলাইনে শপিং করছেন। গুগল এবং ফোরেস্টার কনসাল্টিং-এর রিসার্চ বলছে, ২০১৬য় ১০কোটি অনলাই গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ৪কোটি হতে চলেছেন মহিলা গ্রাহক। আর সেই কারণেই Wooplr, Roposo, Voonik, Redpolka-র মতো প্রোডাক্ট ডিসকভারি পোর্টালের এখন পাখির চোখ মহিলারা। যদিও এই প্রত্যেকটি সাইট-ই শপিং সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে, এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সাইটের প্রোডাক্ট সম্পর্কে খোঁজখবর দেয় এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী কার জন্য কোন্‌টা উপযুক্ত সেই প্রোডাক্ট নির্বাচন করে সেই অনুযায়ী অনলাইন শপিং স্টোরে তাদের পৌঁছে দেয়।

অনলাইনে ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট

''আমাদের সতেরো সদস্যের টিম প্রতিদিন ফ্যাশন ফোকাস এবং তার ট্রেন্ড সংক্রান্ত নিজস্ব রিপোর্ট তৈরী করে। সেই রিপোর্ট দেখেই বিভিন্ন অনলাইন স্টোরের প্রোডাক্ট একত্রিত করা হয়," জানালেন Wooplr এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রবীণ রাজারত্নম।

একদিকে যেমন ই-কমার্স সাইটের কয়েক হাজার প্রোডাক্ট ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করতে পারে, আর একদিকে তেমনই ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মগুলি এক একজন ক্রেতার জন্য এক একরকম প্রোডাক্টের পরামর্শ দিয়ে সেই বিভ্রান্তি দূর করতে পারে। "আপনার রুচি এবং আগ্রহ অনুযায়ী কোন জিনিস মানানসই তা আপনি খুঁজে বের করবেন কী করে? আমরা আপনাকে আপনার পছন্দ আর লেটেস্ট ট্রেন্ড দুটি বিষয়ই মাথায় রেখে জিনিস খুঁজে দিতে সাহায্য করব।" বললেন Roposo-র সহ প্রতিষ্ঠাতা ময়ঙ্ক ভাঙ্গাড়িয়া। এটি একটি 'ফ্যাশন সোশ্যাল নোটওয়ার্ক' যেখানে ক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন, এবং প্রোডাক্টের ছবি ও সেই সংক্রান্ত পরামর্শও দিতে পারেন। ব্যবহারকারীরা এই সাইটে যত বেশি তথ্য সম্পর্কে জানতে চান, ততই তাঁদর সম্পর্কে ধারণা পেতে সুবিধা হয় সফ্টওয়্যারের। ফলে সেই অনুযায়ী পরামর্শ দিয়ে থাকে এই সাইট।

Redpolka-র সহ প্রতিষ্ঠাতা বিশাখা সিং আবার জোর দিচ্ছেন ক্রেতাদের, বিশেষত মহিলাদের শপিংয়ের গতিপ্রকৃতি বোঝার উপর। তাঁর মতে,"ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল একটি জটিল ক্ষেত্র। তার কারণ এটি মূলত পছন্দ অর্থাৎ রুচিনির্ভর। মহিলারা উইন্ডো শপিং করতে পছন্দ করেন তার কারণ সেখান থেকে নানারকম নতুন জিনিস দেখা বা জানা যায়। এটি একটি স্বভাব। একই বিষয় প্রভাব ফেলে অনলাইন শপিংয়েও।"

অনলাইন সার্চের সঙ্গে এই প্ল্যাটর্মগুলির তফাত হল, এরা শুধুমাত্র ওয়েবসাইটের সন্ধান দেয় না। নির্দিষ্ট প্রোডাক্টও খুঁজে বের করে। তাছাড়া, এরা মানানসই জামাকাপড় খুঁজে বের করে কোনও বিশেষ লুক পেতেও সাহায্য করে। "আমরা গুগলের মতোই কোনও প্রোডাক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করি। তবে আমরা শুধু খুঁজে বের করতে সাহায্য করি, কোনও নির্দিষ্ট বিক্রেতার হয়ে সুপারিশ করি না," জানালেন Roposo-র ময়ঙ্ক।

বিজনেস মডেল - ব্যবসার চাবিকাঠি

খুব অল্প সময়ে এধরণের বহু সাইট এবং অ্যাপে বাজার ভরে গিয়েছে। প্রতিযোগীতার দৌড়ে এগিয়ে তাকতে প্রত্যেকেই একে অপরের চেয়ে অন্যরকম হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

মাই স্মার্ট প্রাইস, যা একইসঙ্গে প্রোডাক্ট ডিসকভারি এবং দামের তুলনামূলক বিচারের পরিষেবা প্রদান করে ইতিমধ্যেই হায়দরাবাদের কিছু অফলাইন বিক্রেতার সঙ্গে টাই-আপ গড়ে তুলেছে। "আগামী দু'বছরে আমরা বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন অফলাইন স্টোরে পৌঁছতে পারব। আর তখন আমাদের এই প্ল্যাটফর্মই হয়ে উঠবে একজন ক্রেতার জন্য আদর্শ শপিং ডেস্টিনেশন," দাবি সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুলক্ষণ কুমারের।

যেহেতু এদের কোনও নিজস্ব প্রোডাক্ট নেই, এই প্ল্যাটফর্মগুলি আয় করে কমিশন থেকে।

এরকমই আর একটি সংংস্থা Shopsity শুধুমাত্র বিভিন্ন বিক্রেতার জিনিস সম্পর্কে তথ্য একত্রিত করে এবং ব্যবহারকারীর নিকটবর্তী অফলাইন স্টোরে তা সরবরাহ করে।

অনলাইন ডিসকভারির এই দুনিয়া - যেখানে কেউ নিজের প্রোডাক্ট তৈরী করে না - এরা সরাসরি ই-কমার্স সাইটে গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। "আমাদের ওয়েবসাইটে কোনও ক্রেতাকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অনলাইন ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মগুলির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। এধরণের প্ল্যাটফর্ম হরেকরকম জিনিসের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট করে তাঁদের উপযুক্ত জিনিস খুঁজে দেয়।" বললেন অনলাইন ফ্যাশন রিটেলার StalkBuyLove এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা তুষার আলুওয়ালিয়া। তাঁর বিশ্বাস Roposo-র মতো পোর্টাল একদিকে যেমন সময় বাঁচিয়ে সঠিক দামে মানুষকে জিনিস কিনতে সাহায্য করছে, আর একদিকে গ্রাহকদের মতামত এবং তাঁদের দেওয়া তথ্যের সাহায্যে শপিংয়ের গুণগত মানও বৃদ্ধি করছে।

এখনও অনেক পথচলা বাকি

ক্রেতাদের জন্য লাভজনক হলেও অনলাইন ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মগুলির সামনে চ্য়ালেঞ্জ নেহাত কম নয়। বিশেষ করে অফলাইন বিক্রেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এধরণের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা বেশ কঠিন কাজ।

"অনলাইন এবং অফলাইনে ব্যবসার ধরণ একেবারে আলাদা। সেই যায়গা থেকে অফলাইনের বিক্রেতাদের অনলাইনে নিয়ে আসার কথা বোঝানে বেশ চ্যালেঞ্জিং। যে সংস্থা এই কাজ যত ভালো করতে পারবে তাদের বাজারে টিকে থাকার সম্ভাবনা তত বেশি," মত Helion Venture Partners এর অংশীদার রাহুল চৌধরীর। Shopsity-র প্রতিষ্ঠাতা দানিশ আহমেদও স্বীকার করছেন, এটি একটি চ্যলেঞ্জ। "এই ক্ষেত্রটা এখনও খুব একটা সংগঠিত নয়। বিক্রেতারা সহজভাবে ব্যবহার করতে পারবেন আবার ক্রেতাদের প্রয়োজনও মিটবে এমন টুল প্রস্তুত করা প্রয়োজন," বলছেন দানিশ।

তবে এক্ষেত্রেও বিকল্প রয়েছে। এই মুহূর্তে অন্তত ২,০০০ বিক্রেতা, প্রস্তুতকারক, বুটিক, খুচরো ও পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে কর্মরত Voonik-এর বিশ্বাস এবছরের শেষ পর্যন্ত তাঁরা সংখ্যাটা ১০,০০০ -এ নিয়ে যেতে পারবেন। তবে সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও সুজয়থ আলি জানালেন, অফলাইনে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সেরকম সাড়া না মেলায় বড় রিটেল চেন-এর দিকে ঝুঁকছে Voonik।

বাকি সংস্থাগুলির ইউজার কমিউনিটির প্রতি নির্ভশীলতা বাড়ছে। "পুরো ফ্যাশন দুনিয়া এখন অনলাইনে চলে এসেছে। সেক্ষএে আপনি আলাদা করে কোনও মহিলা ক্রেতার নজর কাড়বেন কী করে? এক্ষেত্রে ক্রেতাদের মতামতকেই কাজে লাগাতে হবে। তাঁদের কমিউনিটি এবং সেখান থেকে পাওয়া কন্টেন্টই আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলবে, " এমনটাই মত Wooplr-এর প্রবীণের।

অধিগ্রহণে 'না'

তবে এধরণের সংস্থার পরিণতি কী হতে পারে? এরা কী বিলিয়ন ডলার কোম্পানি হয়ে উঠবে, ছোট গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থেকে যাবে নাকি ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিলের মতো বড় সংস্থা এদের অধিগ্রহণ করবে? যেসব সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে ইওর স্টোরির সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁরা সকলেই তাঁদের সংস্থার নিজস্ব পরিচয় তৈরী করতে চান। তাঁদের বিশ্বাস এই ক্ষেত্রে সবে কাজ শুরু হয়েছে এবং এখনও এবিষয়ে কাজ করার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

"আমরা নিজেদের সংস্থাকে নিজেদের চেষ্টায় অনলাইন ডিসকভারি এবং প্রাইস কম্প্যারিজন-এর ক্ষেত্রে একটি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই," বলছেন মাইস্মার্ট প্রাইস-এর সুলক্ষণ কুমার।

যদিও বিশেষজ্ঞরা অধিগ্রহণের সম্ভাবনাকে একেবারে খারিজ করে দিচ্ছেন না। ই-কমার্স এবং ওমনি চ্যানেল রিটেল বিশেষজ্ঞ প্রথম নায়েক, যিনি Anheuser Busch Inbev এর Global Director of Strategy and Business Intelligence, তাঁর মতে অনলাইন ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মগুলির সাফল্য নির্ভর করছে তাদের বাছাই, দাম এবং দামের তুলনামূলক উদ্ধাবনের উপর। একই পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি প্রতিযোগীতার বাজারে টিকে থাকতে গেলে তাদের কর্মশক্তিকে একত্র করতে হবে। "যেহেতু সকলেই ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির অংশ হতে চায় সেই কারণে প্রোডাক্ট অথবা পরিষেবার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করা মুশকিল। সব সংস্থাকেই ঠিক করতে হবে, তাঁরা কীভাবে অন্যান্য সংস্থার চেয়ে আলাদা হয়ে উঠতে চান," বললেন প্রথম।

ইতিমধ্যেই অধিগ্রহণ শুরু হয়ে গেছে। ২০১৩য় স্থাপিত ফ্যাশন ডিসকভারি সাইট Doozton ইতিমধ্যেই স্ন্যাপডিলের অধীনে চলে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের এধরণের অনলাইন ডিসকভারি স্টার্ট আপের অধীগ্রহণের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে ব্রাজিলের Buscape সোশ্যাল কমার্স এবং ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম Shopcliq অধীগ্রহণ করে। ২০১৪-র শেষের দিকে মার্কিন ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম Wanelo একত্রিত হয়েছে Shopify-এর সঙ্গে। চলতি বছরের জুলাই মাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রসিদ্ধ ফ্যাশন ডিসকভারি অ্য়াপ Polyvore-কে অধিগ্রহণ করেছে Yahoo।

যদিও কোনও প্ল্যাটফর্মের, কারও সাহায্য না নিয়ে বাজারে টিকে থাকার বিষয়টি এই সেক্টরের পরিধির উপর নির্ভর করবে। Helion এর রাহুল বলছেন,অফলাইন সেক্টরের বিভিন্ন আলাদা আলাদা ব্যবসাকে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারে অনলাইনের এই ক্ষেত্র। "ফলে স্‌ট্যান্ডঅ্যালোন সংস্থা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। হয়তো বড় সংস্থাগুলি অনেক ছোট সংস্থার কাছেই অধিগ্রহণের প্রস্তাব রাখবে,তবে এই সংস্থাগুলির কিন্তু বাজারে একা টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে।"

যদিও এই ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষেত্রে গতিশীলতা এবং নিজেদের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতাই নিশ্চিত করবে কোনও সংস্থার টিকে থাকার বিষয়টি। Jabong-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রবীন সিনহার মতে, ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা থাকলেও তা এখনও অপরিহার্য নয়। "এই ক্ষেত্র কত বড় হবে তা নির্ভর করছে পুরো গোষ্ঠীর উপর। এখনও পর্যন্ত এই ব্যবসার কোনও নিশ্চিত মডেল নেই। সেই মডেল কীভাবে গড়ে উঠবে এবং এই ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করবে তা সময়ই বলবে।"