সাফল্যের সাতটি সুলুক দিলেন মার্টিন সেলিগম্যান

1

সমস্যা ছাড়া জীবন হয় না। সাফল্য কোনও সহজ নাগালের আপেল নয় যে আপনি হাত বাড়াবেন আরে পেয়ে যাবেন। হয়ত সেই মগ ডালে ঝুলছে সাফল্যের ফল। আপনাকে গাছে উঠতেই হবে ফলটাকে পেড়ে আনতে চাইলে। আসলে সবটাই দেখার ভঙ্গিমা। সবাই একথা বলেন। সম্প্রতি কথা হচ্ছিল মার্টিন সেলিগম্যানের সঙ্গে। সেলিগম্যান প্রথিত যশা মনস্তত্ববিদ। পেন পজিটিভ সাইকোলজি সেন্টারের ডিরেক্টর। আমাদের এক ইমেল সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন জীবনের মোক্ষম কিছু শিক্ষা। বলছেন অনেক সময়েই ব্যর্থতা আসে। ব্যক্তিগত অপরিপূর্ণতার জন্যেই আসে ব্যর্থতা। কিন্ত তা থেকেও শিক্ষা নিতে পারাটাই সফল লোকের কাজ। সেলিগম্যান বলছেন, যে সমস্ত মানুষ ব্যক্তিগত কারণে অসফল হন তাঁদের বেশিরভাগই তীব্র হতাশার শিকার। জানবেন, হতাশাই অসাফল্য টেনে আনে। যদি সিনিকাল হতেই হয়, তবে নিজের ব্যাক্তিগত ত্রুটি খোঁজার ব্যাপারে হোন। আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে নিজের সমালোচনা করুন। নিজের ত্রুটি খুঁজে বের করে সেটা মেরামতের চেষ্টা করুন। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল আশা হারাবেন না।

ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত কিছু কারণবশত অসাফল্য হিসাবে যদি দেখেন তবে ভবিষ্যতে নিজের কাজকর্মগুলি আরও ভালভাবে করতে পারবেন। বলাবাহুল্য, নিজেদের ব্যর্থতা থেকেই আপনাকে শিক্ষা নিতে হবে। খোলা মনে। খেলোয়াড়ি মানসিকতা দিয়েই এ কাজটা আপনাকে করতে হবে।

জেনে রাখবেন সাফল্য এবং অসাফল্যের পিছনে একটি রহস্য আছে। সে রহস্যের নাম ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স। কয়েক মিলিয়ন মানুষের প্রতিভা পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে ইমোশনাল ইনটেলিজেন্সে এগিয়ে থাকার জেরে মানুষ সাফল্য পান। অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সাফল্যের কারণ এটাই।

তবে সফল হওয়ার মানসিকতা বজায় রাখাটা সোজা নয়। এখানে সাফল্যের সাতটি অন্তরায় উল্লেখ করা হল। সেলিগম্যান বলছেন সেই কঠিন অন্তরায়গুলোকে কীভাবে আপনি হ্যান্ডেল করবেন। যেমন ধরুণ বয়স, অনেকেই বলেন বয়স সাফল্যের প্রধান অন্তরায়। কিন্তু জানবেন বয়স নিতান্তই একটি সংখ্যা মাত্র। সফল ব্যক্তিরা নিজেদের বয়সকে খুব একটা গুরুত্বই দেন না। বরং তাঁরা দেখে নেন, তাঁরা কী পারবেন এবং কতটা ভালোভাবে পারবেন। বহু মানুষ আছেন যাঁরা আপনাকে উপদেশ দেবেন কোন বয়সে আপনার কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। ওসবে কান দেবেন না। সফল ব্যক্তিরা নিজেদের হৃদয়কে অনুসরণ করে কাজ করেন। লোকের কথায় কান ওরা দেন না।

কোনও নেতিবাদী মানসিকতা মনে আসতে দেবেন না। সফল ব্যক্তিরা তাঁদের নিজেদের সময়ের হিসাব রাখেন। তাঁরা সাধারণত কাজটি কীভাবে হলে ভালো হত কিংবা কী করা উচিত তা নিয়ে অভিযোগ করেন না। নিজের কাজটি ভালোভাবে করার দিকেই তাঁদের ঝোঁক। সমস্যার নানা দি‌ক খতিয়ে দেখে তাঁরা শ্রেষ্ঠ সমাধানটি খুঁজে নেন।

তবে কেউ যদি নেতিবাদী মনোভাব ঢুকিয়ে হতাশ করতে চেষ্টা করে, সফল ব্যক্তিরা সেইসব মানুষজনের সংসর্গ পরিহার করেন। আর একটা কথা, যাঁরা কথায় কখায় অভিযোগ তোলেন তাঁদের বলুন, কীভাবে সমস্যার মোকাবিলা করলে কাজ হয় সে ব্যাপারে বরং মত দিক।

সফল মানুষ সব সময় ঘোরে থাকা মানুষজন। ওঁরা গড়পড়তা নন। মহান ব্যক্তিরা যেমন আপনাকে সহযোগিতা করবেন – অন্যদিকে হিংসা, নেতিবাচক মনোভাব ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু মানুষ আপনার এগিয়ে চলার পথের বাধা হয়ে দাঁড়বেন।

যদি নিজেকে অসুখী বলে মনে করেন তাহলে পরিপার্শ্ব সম্পর্কে সচেতন হোন। চারপাশে যে মানুষগুলি রয়েছেন তাঁরা ঠিকঠাক না হলে আপনি সফল হবেন না। সফল হওয়ার জন্যে প্রয়োজন সঠিক সঙ্গ।

যতক্ষণ আপনি নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা টানবেন আপনি শান্তি পাবেন না। আসলে এটা মনে রাখবেন, অন্য মানুষজন আপনার সম্পর্কে কী ভাবছেন তা কোনও বিষয়ই নয়। নিজের ভিতর থেকে আপনি কী চান, সেটাই বড় কথা। সফল মানুষজন জানেন, অন্যে আপনার সম্পর্কে কী ভাবছে সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা মানে সময় নষ্ট করা। তাঁরা অন্যের মতামত খুব একটা গ্রাহ্য করেন না।

পাশাপাশি নিজের কাজের কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ আপনরা বন্ধুরা কখনওই আপনার কাছে ব্যাখ্যা চাইবে না। আর আপনার শত্রুরা আপনার ব্যাখ্যা বিশ্বাসই করবে ন। ফলে নির্ভীক হয়ে কাজ করে যান।

ভয় পাবেন না। বিপদ জিনিসটি বাস্তব। কিন্ত ভয় হল আপনার আবেগজনিত সমস্যা। ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসার কোনও মানে হয় না। আপনার বিরুদ্ধপক্ষ আপনার কী ক্ষতি করতে পারে? বড়জোর আপনাকে মেরে ফেলতে পারে? মনে রাখবেন, মৃত্যুই সবচেয়ে খারাপ নয়। জীবন্মৃত অবস্থাটিই আপনার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে।

আপনার অতীতকে আপনি নিজেই তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও এই একই অঙ্ক সত্য। তবে আপনি যদি উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আপনার ভবিষ্যতের পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন না। যে সমস্ত মানুষ সফল তাঁরা এটা খুব ভালোমতোই জানেন। ফলে তাঁরা বর্তমানেই বসবাস করেন।

বর্তমানে থাকতে হলে আপনাকে যা করতে হবে

অতীতকে স্বীকার করে নেওয়া। অতীত সর্বদাই আপনাকে অনুসরণ করবে। অতীতে যদি আপনি কোনও ভুল করে থাকেন, তাহলেও মনঃকষ্টে ভুগবেন না। এটা যে করা উচিত সফল ব্যক্তিরা তা খুব ভালোমতোই জানেন। ফলে তাঁরা বর্তমানে বসবাস করেন।

মার্ক টোয়েন এ‌কবার বলেছিলেন, উদ্বেগ হল এমন একটি ঋণ যা আপনি কখনও শোধ করতে পারবেন না। ভবিষ্যতের ফোল্ডারে অনিশ্চয়তা নামের ফাইল থাকবেই। ওই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করে নিন।

দুনিয়ায় সব সময়ই বিপন্নতার শিকার। যুদ্ধ, হিংসা কিংবা আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণ চলছেই। এছাড়াও আছে আপনার সংস্থার নিজস্ব সমস্যা। যেমন ধরুণ বড়, ছোট মাঝারি বিপর্যয়, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি। তবে সফল ব্যক্তিরা এসব নিয়ে মাথাই ঘামাতে চান না। কেননা তাঁরা জানেন যে, তাঁরা এগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বরং তাঁরা পৃথিবীর ইতিবাচক দিকগুলি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে ভালোবাসেন। আর তাঁদের জীবনদর্শন হল, প্রতিদিনের জীবনে যদি তাঁরা ভালো কাজ করেন তবে পৃথিবী ধীরে ধীরে পাল্টাবে।

আর একটা কথা বারং বার আমাদের জোর দিয়ে জানিয়েছেন মার্টিন সেলিগম্যান, সেটা হল-

আপনি যদি সফল হওয়ার মত মন তৈরি করে নেন, তাহলে সাফল্যের স্পর্শ থেকে কেউই আপনাকে রুখতে পারবেন না।