হাসিটা ক্রমশই চওড়া হচ্ছে ইছাপুরের সৌরভের

5

পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলারের ফান্ড পেল iManageMyHotel নামে কলকাতার একটি Software as a service (SaaS) সংস্থা। দেশের অন্যতম অগ্রণী স্টার্টআপে বিনিয়োগকারী জারভিস অ্যাক্সিলেরেটরের কাছ থেকে এই লগ্নি তুলে নিলো সৌরভ গোস্বামীর আই ম্যানেজ মাই হোটেল। পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার বা মাত্র তেত্রিশ লাখ টাকার অঙ্কটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই খবরের আড়ালে যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল এই শহরের স্টার্টআপদের আত্মবিশ্বাসের প্রশ্ন। প্রায়ই শোনা যায় কলকাতার স্টার্টআপরা বিনিয়োগে বঞ্চিত। আই ম্যানেজ মাই হোটেল সেই প্রবাদের ব্যতিক্রম। এবং এটা সম্ভব হয়েছে ওদের লাগাতার ভালো পরিষেবা দিয়ে যাওয়ার দৌলতে।

এটা আপনারা নিশ্চয়ই সকলেই বিশ্বাস করেন যে, কোনও নবগঠিত সংস্থা যদি পরিষেবা কিম্বা তাদের সামগ্রী নিয়ে বাজারের অধিকাংশের সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং নিজেদের কাজটা লাগাতার সফল ভাবে করে যেতে থাকে তাহলে সাফল্য সে পাবেই এবং সেই সাফল্যের ভাগীদার হতে উৎসাহিত হবে বিনিয়োগকারীরাও। দুনিয়ার যেকোনও জায়গাতেই এই সত্য কার্যকর। এই যুক্তি কলকাতাতেই বা খাটবে না কেন।

সৌরভদের এই সংস্থা গত কয়েক বছর ধরে দুর্দান্তভাবে নিজেদের কাজটা করে গেছে। ইআরপি সলিউশনের কাজ। ওরা হোটেলগুলি পরিচালন করার ক্ষেত্রে অটোমেশনের সুবিধে দিয়ে থাকে। বছর আড়াই হল ওদের স্টার্টআপ iMangeMyHotel শুরু হয়েছে। ন্যাসকম দশহাজার স্টার্টআপের তালিকায় কলকাতা থেকে ছিল সৌরভের এই সংস্থা। ক্লিয়ারটিপের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেও কিছুদূর পথ চলেছেন ওরা। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ একটা সমতল খুঁজে পেয়েছেন সৌরভ। যখন ওর গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে। ওদের দেওয়া পরিষেবায় গ্রাহক সংস্থাগুলিও বেশ খুশি। আর সেই সাফল্যের প্রভাব পড়েছে জারভিসের সিদ্ধান্তেও। জারভিসের কো প্রিন্সিপাল সৌম্যজিত গুহ বলছিলেন, দুর্দান্ত কাজ করছে সৌরভের সংস্থা। মাত্র দেড় দু বছরেই শদুয়েক বাজেট হোটেল ওদের ক্লাউড সিস্টেমে পরিষেবা নিচ্ছে। এবং দিনে দিনে হোটেলের সংখ্যাটা বাড়ছে। বাজেট হোটেল গুলি যেমন ওদের টার্গেট কাস্টোমার তেমনি রেস্তরাঁগুলিও নিচ্ছে ওদের পরিষেবা। শুধু দেশে নয় গোটা এশিয়া জুড়েই এই ইআরপি সলিউশন দেওয়ার ক্ষমতা রাখে আই ম্যানেজ মাই হোটেল। সৌম্যজিতের কথায় স্পষ্ট জারভিসের এই বিনিয়োগ আসলে সৌরভের ব্যবসার বিপুল সম্ভাবনা দেখেই হয়েছে। সবে শুরু এখনও অনেক রাস্তা পেরবেন ইছাপুরের সৌরভ গোস্বামী।

কে এই সৌরভ?

কলকাতায় যারা আজ স্বপ্ন দেখছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যে তারা আর অন্য শহরে মরীচিকা খুঁজে মরবেন না। ফুল ফোটাতে পারলে এই এবড়ো খেবড়ো মরুভূমিতেই বাগান করবেন। তাদেরই একজন সৌরভ গোস্বামী।

পরিবারে ও প্রথম ব্যবসায়ী। তিন কূলে কেউ কোনওদিন ব্যবসা করেননি। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সরকারি চাকরিই পরিবারের মাপকাঠিতে সাফল্যের শীর্ষ বিন্দু ছিল। ওকেও উৎসাহিত করা হয়েছিল সরকারি চাকরি করার জন্যে। উচ্চমাধ্যমিকের পর ইছাপুর গান অ্যান্ড শেলে অ্যপ্রেন্টিস হিসেবে যোগ দেন। লেদ মেশিন চালানো শেখেন। কেন্দ্র সরকারি চাকরি। মোটা বেতন। নিশ্চিন্ত জীবন। এসবের স্বপ্ন দেখতেই বাবা মা উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সৌরভকে। কিন্তু ইছাপুরের এই দামাল ছেলেটি চেয়েছিলেন নিজে কিছু করে দেখাবেন। ছোটবেলা থেকেই তাই উদ্যোগ টানতো। নর্থল্যান্ড হাইস্কুলের চনমনে ছেলেটা সব ব্যাপারেই তাই একপায়ে খাড়া। সে ক্যুইজ কম্পিটিশন হোক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন অথবা বিজ্ঞানের প্রদর্শনী। সবেতেই নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন সৌরভ। স্বাধীন হয়ে মাথা তুলতে চাইতেন। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

গান অ্যান্ড শেলে ট্রেনিং নেওয়ার সময় পড়াশুনো সেখানে ইতি টানার পক্ষপাতী ছিলেন না। প্রাইভেটে লেখা পড়া চালিয়ে যান। ডিস্ট্যান্স এডুকেশনের মারফত কম্পিউটার সায়েন্স, প্রো গ্রামিং নিয়ে স্নাতক হন। এবং পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজও করতে থাকেন। অনলাইনে, বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার জন্যে ওয়েবসাইট তৈরি করে দেওয়া থেকে শুরু করে সফ্টঅয়্যার বানিয়ে দেওয়া, ডিজাইন করে দেওয়ার কাজ করতে থাকেন।

এরপর এক বন্ধুর সঙ্গে শুরু করেন Crystal Planet Solutions নামে তাদের সংস্থা। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন থেকে শুরু করে সফ্টঅয়্যার তৈরির মত সব রকমের কাজই করতেন তখন। পাশাপাশি গান অ্যান্ড শেলের চাকরিটাও ততদিনে হয়ে যায়। আট ন মাস সেই চাকরিও করেছেন সৌরভ। কিন্তু টের পেয়েছেন দশটা পাঁচটার নিশ্চিন্ত জীবন তার কম্ম নয়। ফলে সেখানে ইতি টেনে চলেছেন নিজের পথে। কঠিন হলেও সেই রাস্তাটাই ওকে তৃপ্তি দিয়েছে।

Related Stories