শুরুয়াতির পনের কথা

0

ভারতীয় স্টার্টআপদের জন্যে ২০১৫ সাল ছিল রোলার কোস্টার সাফারির মত। ছোট-বড়, বুটস্ট্র্যাপড-ফান্ডেড সব স্টার্টআপই নিজের মত করে খুশি। ইনফোসিস বা আলিবাবার মতো রাঘব বোয়াল বিনিয়োগকারী দেবদূত হয়ে খবরের শিরোনামে। 

তবু ২০১৬-র দোরগোড়ায় স্টার্টআপরা ভবিষ্যতের দিকে সংশয় নেত্রে তাকিয়ে! কী জানি কী হয়! এই খেলায় ওঠাপড়াই তো দস্তুর। কেউ উন্নতির শিখরে উঠবে, কেউবা অনেকটা পিছিয়ে পড়বে। ভো কাট্টা হবে। আবার প্রতিবন্ধকতাকে দুয়ো দিয়ে তড় তড় করে উড়বে তাদের ঘুড়ি। ইওর স্টোরি স্টার্টআপের আকাশের দিকে তাকিয়ে। গ্যালারিতে আপনিও থাকুন। একটা খবরও মিস হবে না।

অর্থ, অর্থাৎ সামর্থ

অবাক না হয়েই জেনে রাখুন, Sequoia Capital India এ বছর ৩২ টি সংস্থায় বিনিয়োগ করেছে। তারপরেই জায়গা Tiger Global Investments এর। তাঁরা বিনিয়োগ করেছে ২৯ টি স্টার্টআপে। এবার বিনিয়োগ করার তালিকায় যে নামগুলি নেব সেগুলো আপনাকে চমকেও দিতে পারে। ময়দানে নেমে পড়েছেন রতন টাটা, কুনাল ব্যহেল, এন আর নারায়ণ মূর্তির মতো দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব। আছে ইনফোসিসের মতো সংস্থা। খুব শিঘ্রই ভারতে আসছে চাইনিজ আলিবাবা। অনেকেই জানেন চিনের সবচেয়ে বড় এই ই কমার্স সংস্থা Paytm এ বিনিয়োগ করেছে এবছরই। তা ছাড়াও বেঙ্গালুরুতে একটি মোবাইল ও কমার্স ইনকিউবেটরে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আরও একটি চিনা ইলেকট্রনিক্স দৈত্য Xiaomi ই কমার্স ওয়্যারহাউস বানিয়ে ভারতে বিনিয়োগ করতে চায়।

ট্যাক্সি বিপ্লব

মুম্বইয়ে, কেরলে ট্যাক্সি ইউনিয়ন আর রাজনৈতিক চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই রমরমিয়ে চলছে ওলা উবেরের ব্যবসা। চালকদের ইনসেন্টিভ কমালেও মহীরূহে পরিণত হচ্ছে ওলা এবং উবের। ময়দান ফাঁকা নয়। মেরু এবং জুগ্নুর মতো খিলাড়িও নেমে পড়েছে মাঠে। মার্কিন ট্যাক্সি সংস্থা উবেরের জন্য ভৌগোলিক দিক থেকে ভারত এইসময় দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। ১০০ কোটি টাকা উবের ভারতীয় স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে চায়।

কর্তৃপক্ষের হুকুমে ২০১৫ সালের তৃতীয় ভাগে ওলা তাদের দিল্লীর সব দ্রুতগামী যানকেই CNG(Compressed Natural Gas) সিস্টেমে পরিবর্তিত করে দিয়েছে। যদিও তারা রাজধানী শহরে লাইসেন্সের দাবি নিয়ে আদালতে লড়ছে। সরকারি কিছু নির্দিষ্ট আইনে তারা কিছুটা স্বস্তিতে। অক্টোবরে পরিবহন মন্ত্রক থেকে ‘Advisory for Licensing, Compliance and Liability of On-demand Information Technology-based Transportation platforms’ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এটি স্পষ্ট ভাবে প্রযুক্তি নির্ভর যান সংযোগকারী এবং ট্যাক্সি কোম্পানীর পার্থক্য বুঝিয়ে দেবে।

রাজধানী আমাদের একটা চমক দিল। মজার এক জোড় বিজোড় আইন। বিজোড় নম্বরের গাড়ি চলবে বিজোড় তারিখে। এতে কমবে বায়ুদূষণও। ওলা,উবের,মেরু এমনকি জিপগো বাসও আগামী জানুয়ারী থেকে রাজধানী শহরের এই হুকুম তামিলে তৈরি।

সরকারী নীতি

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের এমন বৃদ্ধি অনুপ্রাণিত করে। এবছর সরকারও তাই এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু কোমল নীতি নিয়ে। জুলাই মাসে Union Cabinet রাজি হয়েছে Alternative Investment Funds (AIFs) এ বিদেশী বিনিয়োগে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের অনুমতি পেলে ছোট ও মাঝারি স্টার্টআপরা আরও পুঁজি পাবেন।

দেশের বাজারের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা Securities and Exchange Board of India (SEBI) বলছে প্রয়োজনীয় যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনে তাঁরা রাজি। একটি নীতি নিয়ন্ত্রক প্যানেল তৈরি হয়েছে যার প্রধান স্বয়ং নারায়ণ মূর্তি। পুঁজি সংগ্রহ এবং স্টার্টআপদের মধ্যে পুঁজি বন্টন সবটাই হচ্ছে খুব সুচারু পদ্ধতিতে।

সুখবর হল প্রবাসী ভারতীয়দের বিনিয়োগ করা অর্থকে ঘরের টাকার মতোই দেখা হবে। এই টাকা foreign direct investment (FDI) এর আওতায় পরবে না। তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়। মাসখানেক আগেই দিল্লী হাইকোর্ট সরকারকে ২১ টি ই কমার্সের ওয়েব সাইট পরীক্ষা করার হুকুমও দেয়। অভিযোগ এরা নাকি ভেঙ্গেছে FDI নীতি। কিন্তু রঙ্গ হল এই ২১ টি ই কমার্স কোম্পানী FDI বিনিয়োগ পায়নি। FDI নীতির স্পষ্টতার প্রশ্নে বেশ কিছু স্টার্টআপ foreign direct investment থেকে হাত গুটিয়েছেন।

কিছু স্টার্টআপ তবু বিদেশী পুঁজি ব্যবহারে সাহসী। হোটেল বুকিং অ্যাপ RoomsTonite পনেরো কোটি ডলারের পুঁজি জোগাড় করেছে। তাদের দুবাইতে ব্যবসা বাড়ানোর প্ল্যান আছে। অনলাইন টিকিট বুকিং সংস্থা RedBus পেয়েছে আশি কোটি ডলারের পুঁজি। মালয়শিয়া ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি তারা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়তে চায়। Jugnoo ফিলিপিনসের দিকে এগোচ্ছে। হোস্টেল চেনের ব্যবসায়ী Zostel কর্তৃপক্ষ খুঁজছে ভিয়েতনামের বাজার।

ওলা, দিদি কুয়াদি, গ্র্যাব ট্যক্সি আর লিফটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাতারাতি খবরের শিরোনামে। চারটি কোম্পানির মোট সাতশো কোটি ডলারের বিশাল পুঁজি। Didi Kuaidi প্রধানত ওলা,GrabTaxi ও Lyft এ টাকা ঢেলেছে। চীনের তিনশো ষাটটি শহর Didi Kuaidi-র আয়ত্তে,আমেরিকার দুশোটি শহরে Lyft চলে। GrabTaxi রাজত্ব করছে মালয়শিয়া,সিঙ্গাপুর,ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম,ফিলিপিনস এবং থাইল্যান্ডে। এই গাঁটছড়ার জন্য বিদেশেও ভ্রমণকারীরা স্থানীয় যানবাহনের স্বাদ পান। ২০১৬ র প্রথমভাগ থেকে এই মৈত্রী অবশ্যই উবেরের জন্য বড় হুমকি।

এবছর unicorn ক্লাবে Paytm, Zomato ও Quikr হাত মিলিয়েছে Ola, Flipkart, Snapdeal, Inmobi এবং Mu Sigma-র সঙ্গে। মার্কিন শহরবাসীর দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের থালা সাজিয়ে Zomato সারা বছরই খবরের পাতায়। অধিগ্রহণ করে Urban Spoon। পাশাপাশি নভেম্বরে এসে তিনশো কর্মী ছাঁটাই। ভ্রমণসঙ্গী TripHoboর সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক গাঁটছড়া। ট্রিপহোবোর মারফত বেড়াতে গেলে Zomato রেস্তোরায় খাওয়ার অফার।

unicorn এর ক্ষমতা আরেকবার টের পাওয়া গেল যখন Forbes’ Billionaire এর তালিকায় নাম পাওয়া গেল ফ্লিপকার্টের শচীন বনসল ও বিনি বনসলের। Flipkart, Ola এবং Amazon স্থানীয় Peppertap, Grofers, এবং Jugnoo-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। Snapdeal, FreeCharge এবং অন্য স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে একশ কোটি ডলার।

খাই খাই কর কেন? এসো বোসো... আহা! রে...

এবছরেই ভরাডুবি দেখেছে বহু ফুড টেক স্টার্ট। পুঁজির অভাবে Spoonjoy, Eatlo ও Dazo-র গণেশ উল্টেছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে TinyOwl, এতটাই যে দুশো কর্মী ছাঁটাই করতে নাস্তানাবুদ অবস্থা। কোথাও ক্ষতিপূরণ দিতে পেরেছে কোথাও স্রেফ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে অফিস।

ই-কমার্সের বড়কর্তারা সারা বছরের বিনিয়োগ,উৎসব মরশুমের বিক্রিবাট্টা,অ্যাপ ও অধিগ্রহণের মারফত খবরের শিরোনামে। অনলাইন শপিং এর জগতে ঢেউ তুলেছে Unicorn Paytm, যেমন করে “lite”মোবাইল সাইট বানিয়ে কিস্তিমাত করেছে Flipkart আর Snapdeal। ২০১৫র দেওয়ালিতে সেভাবে ছাড় দেয়নি ই-কমার্স বিক্রেতারা। এদের ৬০% অর্ডারই আসে টিয়ার টু এবং টিয়ার থ্রি শহর থেকে। আর ব্যবসার বেলুন ফুলেছে গত বছরের তুলনায় দু থেকে তিনগুণ।

"পিকচার আভি বাকি হে মেরে দোস্ত"

২০১৬-র জানুয়ারী মাস। ‘Startup India Stand Up India’ ক্যাম্পেনের থেকে পর্দা উঠবে। একটি সফল বছরের শেষ। এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি স্টার্টআপরা উত্তর পাননি অনেক প্রশ্নেরই। Grofers এবং OYO Rooms, $100 million clubএ যোগ দিয়েছে। তবে কি এরাই পরবর্তী unicorns? Snapdeal আর Quikr স্থানীয় অনেক ভাষায় আসছে। হাইপার লোকাল হওয়ার দৌঁড়ে তীব্র গতিতে ছুটছে অন্যান্য স্টার্টআপও।

কিন্তু আরও একটি দিক উল্লেখ না করলে সুবিচার হবে না। ইনফোসিস ছ'টি স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে, যার একটিই মাত্র ভারতীয়। এই ধারা কি আগামী বছরেও অব্যাহত থাকবে? নাকি ভারতীয় স্টার্টআপরা দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হবে? উবের হায়দরাবাদে পাঁচশো কোটি ডলার ঢালতে তৈরি। তৈরি হবে উবেরের বৃহত্তম অফিস। তাহলে কি প্রতিযোগিতার বাজারে মানুষ পেতে চলেছেন আরও ভালো যানবাহন পরিষেবা? শুধু সময়ের ঝুলিতেই আছে সব উত্তর। আমরা বরং স্টার্টআপ আকাশের ঘুড়ি ওড়ানো দেখি। চলুন।

লেখা ( অথীরা এ নায়ার ) অনুবাদ ( এষা গোস্বামী )