ড্রাইভারি করে পেট চালায় জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ন তবু স্বপ্ন উড়ান স্বর্ন পদকের

সিনেমার দৌলতে আজ মেরিকমের নাম অনেকেই জানেন।হাজার হাজার মেরিকমদের একজন ম্রুনাল ভোঁসলে। ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপ ব্রোঞ্জ মেডেলজয়ী।পেট বড় বালাই তাই পুনের ম্রুনাল এখন মালবাহী গাড়ির ড্রাইভার! অবাক হলেন? আমাদের দেশে ক্রিকেটের জৌলুস থেকে বেরিয়ে এসে দেখুন চারপাশে ম্রুনালের মত উদাহরণ কয়েকহাজার ছড়িয়ে ।তবু দেশের জন্য অলিম্পিকে স্বপ্ন স্বর্ন পদক আনার স্বপ্ন দেখেন লড়াকু এই মুষ্টিযোদ্ধা।

0

ম্রুনাল ভোঁসলে। ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপের ব্রোঞ্জ মেডেলজয়ী। আরও একটা পরিচয় আছে তাঁর। পুণের একজন মালবাহক! অবাক হলেন? আমাদের দেশে ক্রিকেটের জৌলুস থেকে বেরিয়ে এসে চারপাশটা দেখলে ম্রুনালের মত উদাহরণ কয়েকহাজার ছড়িয়ে রয়েছে।


সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এই চ্যাম্পিয়নশিপে পদক পেলে চাকরি দেবে। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে ম্রুনাল চোট নিয়েও নেমেছিলেন চ্যাম্পিয়ানশিপ খেলতে। শুধু খেলাই নয়, পদকও জিতেছিলেন। কিন্তু চাকরির প্রতিশ্রুতি প্রতিশ্রুতিই থেকে গিয়েছে। পরিবারের জন্য মালবাহকের চাকরিই আপাতত বেছে নিয়েছেন ম্রুনাল। কিন্তু কাঁধে ব্যথাটা সারেনি। হয়ত অস্ত্রোপচারেরও দরকার হতে পারে।

ম্রুনালের পরিবারে ছ’জন সদস্য। বাবা শ্রমিক, মা গৃহবধূ। বড় দুই দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোটবোন পুলিশ কনস্টেবলের ট্রেনিং নিচ্ছে। এরই মধ্যে মালবাহকের কাজ করে পরিবারে অল্পস্বল্প কিছু যোগাতে পারছেন ম্রুনাল। কিন্তু এর মধ্যেও স্বপ্ন দেখছেন দেশের জন্য পদক নিয়ে আসার।

‘সোশ্যাল স্টোরি’ ম্রুনালকে প্রশ্ন করেছিল, ক্রিকেট খেললেন না কেন? ম্রুনাল জানালেন, যখন ছোট ছিলেন, স্কুলের পর অনেকটা সময় পেতেন। সেই সময় শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর বাবামা ঠিক করেছিলেন, কোনও একটা খেলার সাথে ম্রুনালকে যুক্ত করে দেবেন। ম্রুনালের প্রথম পছন্দ ছিল ক্রিকেট। কিন্তু ক্রিকেট প্রশিক্ষণের খরচ তাঁর বাবামা দিয়ে উঠতে পারলেন না। এক আত্মীয় তাঁকে পরামর্শ দেন বক্সিং শেখার। কারণ বক্সিং প্রশিক্ষণে অনেক কম টাকা লাগে। ১২ বছর থেকে সেই শুরু। ধীরে ধীরে ম্রুনাল বুঝতে পারেন বক্সিং শিখতে পারলে কেরিয়ারে অনেকগুলি দিক খুলে যাবে। নেহেরু স্টেডিয়ামের মহারাষ্ট্র ইনস্টিটিউট অফ গেমস অ্যান্ড স্পোর্টস (এমআইজিএস) ক্লাবে অনুশীলন করতে শুরু করেন ম্রুনাল। টিজে নায়েক ছিলেন ম্রুনালের কোচ। নায়েক মারা গিয়েছেন ২০১২ সালে। তার আগে ২০০৮ সালে বাইক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন ম্রুনাল। পায়ে এক গুরুতর চোট লাগে। প্রায় দু’ বছর প্রশিক্ষণ করে উঠতে পারেননি তিনি। ২০১০ সালে ফিটনেস টেস্টে পাশ করেন। ম্রুনালের জীবনে দু’জন অতি নামি বক্সারের অবদান অস্বীকার করা যায় না। একজন ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমস-এ সোনাবিজয়ী মনোজ কুমার এবং ২০০৮ সালে অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী বিজেন্দ্র সিং।

ম্রুনাল জানিয়েছেন, ন্যাশনাল খেলার সময় তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল চরমে। তিনি জানতেন এই চ্যাম্পিয়ানশিপে মেডেল যেভাবেই হোক, তাঁকে জিততে হবেই। মেডেল জিতলেই চাকরি নিশ্চিত। সরকারি চাকরি করলে বাড়তি অনেকটা সময় পাওয়া যাবে অনুশীলনের জন্য। তাঁর পরবর্তী স্বপ্নপূরণের জন্য। দেশের জন্য অলিম্পিক থেকে সোনা আনাই যে তাঁর বর্তমান লক্ষ্য। কিন্তু পদক জেতার পরও সরকারি চাকরি পাননি ম্রুনাল। যতবার সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছেন, ততবার একই উত্তর, বয়সটা নাকি তাঁর বেশি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবুও চাকরির আসা এখনও ছাড়েননি ম্রুনাল। তবে একটাই সমস্যা, মালবাহকের এই চাকরিতে অনুশীলনের সময় পাওয়া যায় না। কারণ এই কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। কাজ সেরে খুবই ক্লান্ত লাগে তাঁর। তাও এর মধ্যেই ম্রুনাল স্নাতকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এতদিন পর্যন্ত নানা প্রতিযোগিতা থাকার জন্য পরীক্ষা দিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশুনাটা শেষ করতে, এতে চাকরি পেতেও সুবিধা হবে।

ক্রিকেট নিয়ে সরকারের এরকম পক্ষপাতিত্বের জন্য যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে ম্রুনালের। আইপিএল-এ কোটি কোটি টাকা রোজগার করছেন এক-একজন খেলোয়াড়। না খেললেও, সামান্য কিছু অবদান রাখলেই আইপিলে তাঁর পকেট ভর্তি। কিন্তু বক্সিং-এর ক্ষেত্রে সরকারের যেন সৎ-সন্তানের মত ব্যবহার করা। ক্ষোভ থাকলেও ম্রুনাল আশা করছেন এই পরিস্থিতির নিশ্চয়ই একদিন পরিবর্তন হবে।


শুধুমাত্র সরকারি সাহায্য নয়, দরকার বেসরকারি সাহায্যও। এইসব খেলার সাথে যাঁরা যুক্ত, তাঁরা বেশির ভাগই দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করছেন। তাঁদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য দরকার কিছু মানুষের নিঃস্বার্থ দান। যে কেন্দ্রে ম্রুনাল অনুশীলন করেন, তাতে প্রশিক্ষণের উপযুক্ত সামগ্রী নেই। এমন অনেক প্রতিভা আছেন, যাঁরা উপযুক্ত সহায়তা না পেয়ে, হারিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের জন্য রুজিরোজগারের অন্য পথ বেছে নিচ্ছেন। অর্থের অভাবে ‘প্র্যাকটিস কিট’, প্রয়োজনীয় জুতো, এমনকি চোট পেলে চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকে না।

কোচ মারা যাওয়ার পর ম্রুনাল প্রশিক্ষণ নেন সিনিয়রদের কাছ থেকে। আবার কখনও জুনিয়রদের নিজেই প্রশিক্ষণ দেন ম্রুনাল। কখনও নিজের কেন্দ্র গড়ে তুলে প্রশিক্ষণের কথা চিন্তাও করেন না। তাঁর ইচ্ছে, যেখানে ম্রুনাল নিজে বক্সিং শিখেছেন, সেখানেই তাঁর পরবর্তী ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন। তাঁর কোচেরও সেই ইচ্ছে ছিল। তাঁর স্বপ্ন পুরণ করবেন ম্রুনাল।