কতটুকু সৃজনশীল হবেন দুহাজর ষোলোয়?

0

ও হ্যাঁ! এটা একটা প্রশ্ন বটে। এর মধ্যেই একটা উত্তর আছে। আমার বয়সী যে কোনও মহিলা এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন আমার ঠাকুমা যখন আসেন লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সকলে শুনতে পাবে এমন ভাবেই জিজ্ঞেস করেন আমি সন্তানাদির বিষয়ে কী ভাবছি। তিনি থামেন না বলতেই থাকেন, অনেক রকম 'পরীক্ষা নিরিক্ষার এখন ব্যবস্থা আছে' ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বিরক্ত হই। ঝগড়া করি। এবং নিরন্তর ঝগড়াই করে যাই। কত বিষয় উঠে আসে, সত্যিকারের নারীত্বের মানে, আধুনিকতা, বিয়ে, কাজ এবং এরমধ্যে যা যা পড়ে সবকিছু নিয়েই তুমুল ঝগড়া হয়। আর শেষ লাইনটা থাকে তুমি যদি বন্ধা হও লজ্জা পাওয়ার কী আছে! এখন চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে, ক্লিনিক আছে সেখানে গেলে তোমার সব সমস্যার সামাধান হয়ে যাবে। সত্যি!

আমি বলি আমি লজ্জিত নই। আমি সুস্থ আছি ঠিক আছি। আমাকে করুণার দৃষ্টিতে মায়ামাখা চোখে দেখেন। এবং এই একই নাটক যখনই আমার সঙ্গে ঠাকুমার দেখা হয় আবার বারবার হয়। আর এই প্রশ্নটা পরিবারের সবাইকে একজোট করে। এটা যেন জাতীয় সমস্যা আর গোটা পরিবারের কাছে এটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ওরা জানতে চান।

কিন্তু আজকে আমি সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা যা আমাদের অনেকেরই পরিবারের লোকেদের মুচমুচে আলোচনার বিষয় সেসব নিয়ে বকবক করতে চাই না। বরং আমি অন্য একধরণের সৃজনশীলতার গল্প বলব। যা নিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের ভাবতে হবে বৈকি!

আপনারা যারা এই লেখাটা পড়ছেন তাদের অনেকেই হয়ত জানেন ২০১৫ টা ইওর স্টোরির জন্যে একটি অসামান্য বছর গিয়েছে। সাত বছর পর আমরা সিরিজ এ ফান্ডিং পেয়েছি। আমরা ২৩ হাজার কাহিনি লিখেছি। এখন ইংরেজি ছাড়া আরও বারোটা ভারতীয় ভাষায় বেরচ্ছে ইওর স্টোরি। ৬৫ জনের একটা রক সলিড টিম তৈরি করতে পেরেছি। আমরা নতুন নতুন মিডিয়া নিয়ে কাজ করছি। আরও অনেকগুলো নতুন ব্র্যান্ড, সরকারি দফতরের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছি। একটা বছরে অনেকগুলো মাইলস্টোন আমরা পেরিয়ে এসেছি। এক সময় মনে হয়েছে এতদিন ধরে এই পাগলের মত দৌড়নোর যেন একটা সুফল পেলাম।

প্রত্যেকটা উচ্চতায় ওঠার সময়, প্রত্যেকটা মাইলস্টোন পেরনোর সময় আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে মিশে আছে একাকিত্ব আর যন্ত্রণা। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম যা নিয়ে এত মাতামাতি করে সেই ফান্ড জোগাড় করার প্রক্রিয়াটা আমার কাছে সব থেকে হৃদয় বিদারক ছিল। রাতারাতি দেখলাম বন্ধুরা বদলে গেল। লোকজনের ব্যবহার বদলে গেল। অনেকের ব্যবহারই এক ঝটকায় বদলে গেল। এটা ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে রক্তাক্ত করল। আর জাতীয় স্তরে কানাঘুষো আর চর্চার বিষয় হয়ে গেল এটা। অনেক তীর্যক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই সব আমাকে আরও গভীর খোলসের ভিতর সেধিয়ে দিতে চেয়েছে। আমি তাজ্জব বনে গেছি। বারবার ভেবেছি এরকম অসুস্থ পরিবেশে আমার টিকবার মুরোদ আছে তো! আমি কি এই পরিবেশের জন্যে উপযুক্ত?

এগিয়ে থাকার তাগিদ আর পিছিয়ে না পরার পণই ২০১৫-য় আমাকে ক্রমাগত দৌড়নোর ইন্ধন জুগিয়েছে। আমি গুণেছি সারা বছরে ৬৪ টি ইভেন্টে ভাষণ দিয়েছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সপ্তাহের শেষ দিনগুলোয়। আমার ডেস্কের বিজনেস কার্ডের তাকে কম করে ৬ হাজার কার্ড জমে গিয়েছে। মানে এত মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি। ৬ হাজার মেলের উত্তর দিয়েছি। আর হাজার দশেক মেলের উত্তর দিতেই পারিনি। সেই সবগুলো মেইল যার উত্তর আমি দেব ভেবও দিতে পারিনি। সেই সব ফোন কল যেগুলোর ক্ষেত্রে 'রিং ব্যাক করব' এই কথা দিয়েও কথা রাখতে পারিনি সেই সব প্রতিশ্রুতি ভাঙার ঘটনা আমাকে রীতিমত তাড়িয়ে মারে। নিজেকে মনে হয় জম্বির মতো। সবাইকেই জায়গা দিতে চেয়েও না দিতে পারায় কত মানুষকে হতাশ করেছি, কত মানুষ ক্ষেপে গেছেন অবশ্যই আমার ওপর বিরক্ত হয়েছেন।

এক কথায় আমি যত দিয়েছি তত মানুষ বলেছে আমি নাকি ফোন করলে মেল করলে আগের মত তুরন্ত উত্তর দিচ্ছি না। মানুষ হতাশ হয়েছেন। তারা আমাকে ছেড়ে গেছেন। কিছু টিমের লোকজন কিছু পরিবারের লোকজন সবাই ভেবেছে আমি ওদের পাশে ছিলাম না। আমি একদম অনুভব করতে পারছিলাম যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না। আর এসবই আমার ভিতর একটা হাহাকার তৈরি করেছে। কী করি! একটা মানুষ কোন দিকে যাই। এত অসহায় লেগেছে যে কী বলব। এবং শেষমেশ একদিন আমি কেঁদেই দিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না এগুলো কেন হচ্ছে। একটা প্রশ্ন আমার সামনে উঠে এল ২০১৫ সালে পাওয়া আমার সাফল্যে কি আমি খুশি হব, নাকি আরও আরও বেশি বেশি করে নিজেকে ম্যানেজ করতে শেখা উচিত ছিল আমার?

বছরের শেষদিকটা মূলত নভেম্বরে নিজেকে সকলের থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিলাম। নিজের কাছে ফিরতে চেয়েছিলাম। শুনতে চেয়েছিলাম নিজের কথা। শান্তি পেতে চেয়েছিলাম। উত্তর খুঁজছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল নিজেকে সময় দেওয়া দরকার। মনে পড়ে গেল বছর পনের আগের কথা। যখন কলেজে পড়তাম এরকমই একটা খারাপ সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তখন মনোবিদের সাহায্য নিই। অনেক উপকার হয়েছিল। উনি একটা সাধারণ উদাহরণ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের উত্তরাঞ্চলের গাঙ্গেয় সমতলভূমি দুনিয়ার সব থেকে উর্বর জমি। এখানে দারুণ ফসল হয়। কারণ এই অঞ্চলের খণিজ সমৃদ্ধ পলি মাটি। আরও একটি কারণ এখানকার কৃষকরা একবার চাষের পর জমি ফেলে রেখে দেন বেশ কিছু দিন। যাতে পরের চাষের জন্যে জমি তৈরি হতে পারে। বিরতি না দিলে জমি উর্বর থাকবে না। সৃজনশীলতা নষ্ট হবে। এযুক্তি মানুষের জন্যেও খাটে। যদি তুমি নিজের মনের এবং আবেগের জমি ঠিকঠাক যত্ন না নাও তাহলে মনের ভিতর বিষ তৈরি হতে বাধ্য যা কেবলই তোমাকে ক্লান্ত করবে বিষণ্ণ করবে। এবং তুমি সমাজকে কোনও উন্নত ফসল স্বাভাবিকভাবেই দিতে পারবে না। তাই থামো। একটু না হয় স্বার্থপরই হলে। কিন্তু নিজের দিকে তাকাও নিজেকে সময় দাও। না হলে কীভাবেই বা অন্যকে ভালোবাসবে, অন্যের প্রতি যত্নশীল হবে এবং অন্যের ত্রুটিগুলো মেরামত করবে যখন তুমি নিজেই এত ত্রুটিপূর্ণ।

কথাগুলো এখন আবার মনে পড়ে গেল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। যখন মনে পড়লই তখন নিজেকে সুস্থ করার কাজটা করেই ফেললাম। গোটা ডিসেম্বর নিজের কথা শুনেছি। নিজের সঙ্গে প্রেম করেছি। নিজেকে প্যাম্পার করেছি। খুব একটা সোজা ছিল না। কিন্তু কী মনে হয় এটা কি সোজা হওয়া উচিত নয়।

থিচ নাহত হান নামের এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর একটি বই পড়লাম। দ্য মিরাকেল অব মাইন্ডফুলনেস। দারুণ বই। বিষয়গুলোর ওপর আরও ভালো দখল এনে দিলেন এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। ফোন স্যুইচ অফ করাটা দারুণ কাজে দিয়েছে। আমি যদি কারও ফোন না ধরি কেউ যদি আমাকে ফোনে না পান তাহলে কারও কোনও বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে না। এখন আমি আমার চায়ের কাপ নিয়ে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া শুরু করলাম। আজকাল আমার দুটো কুকুরের সঙ্গে দিব্যি সময় কাটাচ্ছি।

আমি এই কথাগুলো সেই সব অদম্য উদ্যোগপতিদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই যারা কেবল নিজের সাফল্যের পিছনে ছুটছেন। তাদের সকলকে বলতে চাই ২০১৬-য় আপনারা অনেক পরিশ্রম করুন। অনেক সফল হোন। অনেক দৌড়ন কিন্তু নিজেদের সময় দিতে ভুলবেন না। মনে রাখুন আপনি যদি নিজের জমিকে উর্বর না রাখেন তা হলে আর কেউ আপনাকে সেই সাহায্য করতে পারবে না। কারণ আপনার কাহিনির আপনিই একমাত্র হিরো।

(লেখা- শ্রদ্ধা শর্মা, প্রধান সম্পাদক ইওর স্টোরি , অনুবাদ- এষা গোস্বামী)