কুর্তির কীর্তি, ১৭ বছরেই বিল্ডার

0

মেয়েটির বয়স তখন মাত্র আট। আবাসিকদের হাতে সোসাইটি প্ল্যান তুলে দেওয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে সেদিন ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন তার বাবা। পাশে তুলনায় বড় চেয়ারটি ছোট্টো মেয়েটির দখলে চলে গিয়েছিল। আর খুব মন দিয়ে দেখছিল বাবা কী করছেন। সেই শুরু। ওইটুকুন বয়েস থেকেই কুর্তি জৈনের পেশাগত যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

কুর্তি জৈন,ডিরেক্টর, কুমার আরবান ডেভেলপমেন্ট, পুনে
কুর্তি জৈন,ডিরেক্টর, কুমার আরবান ডেভেলপমেন্ট, পুনে

পুনের কুর্তি জৈন মাত্র সতেরো বছর বয়সে কুমার বিল্ডার্সের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হন। এত দ্রুত সাফল্যের বেশ কিছু স্বীকৃতি ইতিমধ্যে পকেটে পুরে ফেলেছেন। মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল এসএম কৃষ্ণার হাত থেক ২০০৪-০৫ এর ‘দ্য টপ ম্যানেজমেন্ট কনসোরটিয়াম অ্যাওয়ার্ড অফ একসেলেন্স’ পুরস্কার তাদের মধ্যে অন্যতম। ২০১২ সালে এনডিটিভির একটি অনুষ্ঠান, ইয়ং গানস অব দ্য রিয়েল এস্টেটে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু উত্থানের সিঁড়িটা অত সহজ ছিল না। সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন ২৬ বছরে পা দিয়ে জানাচ্ছিলেন এই জায়গায় পৌঁছতে প্রতিটি পদক্ষেপে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে।

শুরুটা হয়েছিল তেরো বছর বয়সে। বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর প্রবল ইচ্ছে থেকে সেবার গ্রীষ্মের ছুটির পুরও সময়টা বাবার অফিস এবং কনস্ট্রাকশন সাইটে কাটছিল আর সবসময় কিছু না কিছু বাহানায় চাইতেন বাবা যেন কাজ ছেড়ে মেয়ের সঙ্গে সময় কাটান। মজার বিষয় হল, যে কাজ নিয়ে বাবা সময় দিতে পারতেন না বলে তাঁর এত বিরক্তি ছিল, সেই রিয়েল এস্টেটই এত অল্প বয়সে কুর্তিকে এই সাম্রাজ্যে নিয়ে এল। ‘আমি চাইতাম বাবাকে বের করে আনতে, বদলে বাবা আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিতেন’, বলছিলেন তিনি। প্রায় প্রত্যেকটা মিটিংয়ে বাবাকে বেরিয়ে আসার জন্য গুঁতোতেন, কখনও বা তাঁর কম্পিউটার সারাদিন দখল করে মাইক্রোসফট পেন্টিং এ আঁকিবুকি করতেন। গুরুত্বপূর্ণ মিটংগুলিতেও থাকতেন, নোট নিতেন আর বোঝার চেষ্টা করতেন সেই ভাষা। আইনজীবীদের সঙ্গে তেমনি এম মিটিংয়ের কথা বলতে গিয়ে হেসে ফেললেন কুর্তি। পরদিন যখন পার্টির সঙ্গে আসল মিটিং শুরু হল কুর্তি এমন একটা ধারার কথা বললেন য়েটা সবার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। পাঁচ সেকেন্ড সবাই স্তব্ধ হয়ে যান, তারপর হাসিতে ফেটে পড়েন। ‘আমি একটু বেশিই কথা বলতাম আর সব বিষয়ে কোনও না কোনও মন্তব্য করে বসতাম’, বলেন কুর্তি। আইনজ্ঞদের সেই প্রশংসাটাই ছিল আসল খোঁচা। স্থপতি হওয়ার বাসনা দ্রুত চলে গেল আইন (রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় খুব প্রয়োজন) পড়ার দিকে। সবটা অত সহজ ছিল না। দশম শ্রেণির পরীক্ষা যেদিন শেষ হল সেদিনই, মাত্র পনেরো বছর বয়সে কুর্তি খাতায় কলমে কাজে যোগ দিলেন। যোগ দিলে কী হবে, অত সহজে মেয়েকে কুর্সি দিতে রাজী নন বাবা। কাজ শেখানোর ব্যাপারে বেশ কঠোর ছিলেন। পরের দু বছর ২৩ টি বিভাগে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হয়েছে কুর্তিকে। সেই সময় যাদের কাছে রিপোর্ট করতেন এখন তাঁরাই কুর্তিকে রিপোর্ট করেন।

একটা লক্ষ্য ছিল যেখানে পৌঁছাতে হবে, সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, বসের মেয়ে হওয়াটা আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে তাঁর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে দিয়েছিল। নিজের ব্যাপারে ‘রূপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো’র কথা তিনি শুধু সেই সময় মেনে নেন, যখন তাঁর মনে পড়ে এই সেক্টরের সেরা লোকজনের সঙ্গে কত কম বয়সে তাঁর আলাপ হয়। বাবা ললিতকুমারের ব্যাপক যোগাযোগ ‘বাস্তু’ এবং ‘ভেন্টলেশন’এর নকশা এবং তৈরি করার ক্ষেত্রে কুর্তির সব ধরণের প্রশ্নের উত্তরে সাহায্য মিলত শুধু এটা ছোট্ট ফোনেই। সেটাই কাজ শেখার ক্ষেত্রে বড় বড় বাঁকগুলিকে সহজ করে দিয়েছিল। দুবছর পর তাঁর প্রশিক্ষণ শেষ হল এবং পদোন্নতি ঘটল সংস্থার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পদে, তাঁর শহরে তিনিই হয়ত সবচেয়ে কম বযসে এতবড় দায়িত্ব পেলেন।

পাশাপাশি চলছিল পড়াশোনাও। বিবিএ-এলএলবি সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেন। এত অল্প বয়েসে যে আত্মবিশ্বাস তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল তাতে লিঙ্গ বৈষম্যের কোনও প্রশ্নই মনে আসেনি। কনস্ট্রাকশন সাইটে তিনিই একমাত্র মেয়ে অথবা আরও ৯০ জন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিদেশ ঘুরে আসা- ‘টমবয়’ কুর্তির কাছে এগুলি কোনও ব্যাপারই নয় । কুর্তি এখন সেসব মনে করে নিজেই হাসেন। এই ব্যবসায় তিনিই যে একমাত্র মেয়ে, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন পাঁচ বছর আগে, নির্মান ব্যবসায়ীদের এক সভায় পুনের ক্রেডাই(CREDAI)এর চেয়ারম্যান প্রায় দুশো জনের ওই ভিড়টাকে সম্বোধন করছিলেন, ‘আমার নির্মান ব্যবসায়ীরা এবং ভদ্রমহিলা’-এই বলে। ‘উনি আমাকে ভদ্রমহিলা বললেন’, মনে করে হেসে গড়িয়েই পড়লেন কুর্তি।

কাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হন কুর্তি? জবাবে মাত্র দুটি শব্দ খরচ করেন, ‘আমার বাবা’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবসা করে আসছে কুর্তির পরিবার। উচ্চাখাঙ্কা তাঁর রক্তে মিশে। বাবাকে নিয়ে গর্বভরে কুর্তি বলেন, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এবং সবচেয়ে মূল্যবান পথপ্রদর্শক। বড় স্বপ্ন দেখতে বাবাই উৎসাহ দেন কুর্তিকে। কালাট্রাভা, জাহা হাদিদের কাজ দেখে উদ্বুদ্ধ হতে বলেন। পরামিতি আকারের বহুতলের কথা ভাবতে বলেন যখন এই সময় ভারতে এই ধরণের কাঠামো অপ্রসঙ্গিক। বিদেশে নতুন পার্টনারশিপ এবং জমি নিয়ে নানা চুক্তি হত নৈশভোজে। সেখানে বাবাকে দেখতেন কীভাবে সবার সঙ্গে কথা বলতেন। আসলে কুর্তির বাবা চাইতেন অল্প বয়স থেকেই মেয়ে সেই ভাষা বুঝুক এবং উচ্চাকাঙ্খী হোক।

কুর্তি বলেন, ব্যাক্তিগত অথবা কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য স্থির লক্ষ্য এবং শৃঙ্খলা সমান দরকার।১১ বছর বয়সে জাতীয়স্তরে হকি খেলতেন। এমনকী তেরো বছর বয়সে যখন ধনু ভাঙা পণ করেছিলেন বাবাকে ছুটিতে নিয়ে যাবেনই, তখন প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় তাঁকে ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা যেত বাবার সঙ্গে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে। যে সময় বেশিরভাগ টিন এজাররা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটায়, তখন মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার অফিসে কঠিন অনুশীলণে মগ্ন কুর্তি। এবং ১৭ বছর বয়সে যখন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হলেন তখনও ঠিক সকাল আটটায় তাঁর কাজ শুরু হত, আগের দিন বন্ধুবান্ধদের সময় দিতে গিয়ে যতই রাত হোক না কেন। ‘কীভাবে আমার বন্ধুরা যে এইসব সহ্য করত’, হাসেন কুর্তি। তাঁকে মেনে নেওয়ার জন্য বন্ধুদের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ। ১৭ বছরের কাউকে ক্যারিয়ার নিয়ে এতটা লক্ষ্যস্থির এবং সচেতন হতে দেখে প্রথম প্রথম বন্ধুরা অবাক হয়ে যেতেন। পরে অবশ্য তারাই কুর্তিকে সবরকম ভাবে উৎসাহ দিতেন। পড়াশোনায় সবরকম সাহায্য করে, কোনও প্ল্যান করলে তাতে কুর্তিকে রেখে এবং তাঁর কাজের সময় মাথায় রেখে তাঁকে সবসময় উৎসাহ যুগিয়ে গিয়েছে বন্ধুরা। অল্প বয়েসে কাজে ঢুকে পড়লেও তাঁর কখনও মনে হত না অনেক কিছু মিস করছেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে যখন থাকতেন চেষ্টা করতেন কাজকে এক হাত দূরে রাখতে। ‘আমি খুশি যে ওদের কাউকে কাউকে ব্যবসায়িক মনেভাবাপন্ন করে তুলেত পেরেছিলাম। এখন আমার ১৭ থেকে ৭০ সব রকম বন্ধু আছে। আমার বয়সের নতুন বন্ধু পাওয়া আজকাল মুশকিল হয়ে উঠছে, কারণ ছেলেবেলার মতো এখনও তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গেই আমার বেশি বন্ধুত্ব হয়ে যায়’, হাসেন কুর্তি