সিকিমে বস্তিবাসী ছেলেমেয়ের জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল

1

পশ্চিম সিকিমের একটা গ্রাম বুরিওখোপ। পাহাড় ঘেরা এই গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটাই স্কুল। সিকিম হিমালয়ান অ্যাকাডেমি। ইংরেজি ভাষাশিক্ষার একটা ক্ষুদ্র উদ্যোগ। এমন এক জায়গা যেখানে প্রযুক্তির আলো এখনও পৌঁছয়নি। স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই মানুষের বেঁচে থাকা। স্বাস্থ্য পরিষেবা বলতে প্রায় কিছুই নেই। প্রাকৃতিক সান্নিধ্যের মধ্যেই মানুষের বসবাস। চলতি বছরে জেমস সুরেশ আম্বাত এখানে এসে দেখেছিল, সব শিশুর শিক্ষার জন্য কোনও ব্যবস্থাই নেই। দুর্গম এই অঞ্চলে দরকার বহু স্কুলের, যা স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করবে।

ভারতের এমনই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় হয়েছিল অম্বাত। ছয় সন্তানের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে বড়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সে জানত এই রকম অঞ্চলে বেঁচে থাকা, বড় হওয়ার চ্যালেঞ্জটা কেমন হয়। মনে করতে পারে সেইসব দিন, যখন সে খালি পায়ে স্কুলে যেত। জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। বাহুল্য বলতে কিছুই নেই।

সে যখন কলেজে পড়তে গেল, পরিচয় ঘটল অন্য এক জীবনের সঙ্গে। যেখানে মিশেছে বহু সংস্কৃতি। প্রাচুয্য কাকে বলে সেটাও দেখল সে। "যেদিকেই তাকাই দেখতে পাই লোকে খালি টাকা-টাকা করছে, কীভাবে ধনী হওয়া যায় তা নিয়ে কথা বলছে এবং সেসব দেখতে-দেখতে আমিও তাঁদের দলে মিশে গেলাম", নিজেই একথা জানালেন অম্বাত। এরপর আর পাঁচজনের মতোই চাকরি, টাকা আর সংসারের আবর্তে জীবন এগিয়ে চলল। কিন্তু এভাবে চলল না। একঘেষে এই জীবনে বিরক্তই হয়ে পড়লেন অম্বাত। "বেঁচে থাকার কীসের জন্য? এ আমি কী করছি? আমি মরেই গেলেই বা কী?", নিজের কাছেই বারবার একই প্রশ্ন করতে লাগলেন অম্বাত। উত্তর পেতে অনেকের সঙ্গে কথাও বললেন। শেষপর্যন্ত বুঝলেন, অন্যর ভালোর জন্য কিছু করতে পারার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে আনন্দ। অম্বাতের সেই অপরের জন্য বাঁচার যাত্রা শুরু হয়েছিল তিরিশ বছর আগে। এরপর আর সে ফিরে তাকায়নি। অম্বাতের কথায়,"একজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়াটাও কম কিছু নয়। এতেই সভ্যতার অগ্রগতি। জীবনের পূর্ণতা। বিশেষ করে আমি যখন মারা যাব, কিছুই তো সঙ্গে নিয়ে যাব না, তাহলে বিষয়আশয় নিয়ে এত ভেবে লাভ কী ?"

দার্শনিক এই চিন্তাকে মাথায় রেখেই ২০০৪ সালে বেঙ্গালুরুর উলসুরে 'বিল্ডিং ব্লকস' চালু করে দেন অম্বাত। সেই স্কুলে একজন শিক্ষক আর পড়ুয়া বলতে পাশের একটি বস্তির চার-পাঁচজন ছাত্রছাত্রী। পরিকাঠামো বলতে প্রায় কিছুই নেই। কয়েকজনের দানের টাকায় সেইসব পড়ুয়াদের বইখাতা, খাবার কিনে দেওয়া হত। আর আজ? বিল্ডিং ব্লকসের আওতায় রয়েছে সাতটি স্কুল। যেখানে শিক্ষাদানের জন্য রয়েছেন ৭৯ জন শিক্ষক। আর পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় সাতশো। বস্তিবাসী সেইসব ছেলেমেয়েরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেখানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। শিক্ষাদানের জন্য রয়েছে সব ধরনের আধুনিক সুযোগসুবিধা। দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এব্যাপারে বিল্ডিং ব্লকসের একটি বিশেষ সুবিধাও রয়েছে। বস্তিবাসী, পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের কীভাবে পড়ানো উচিত তা শিক্ষকদের বোঝাতে নিয়মিত সেমিনার, ওয়ার্কশপে এগিয়ে আসেন নামি শিক্ষাব্রতীরা।


বর্তমানে ৩ থেকে ৬ বছর বয়সি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে থাকে বিল্ডিং ব্লকস। এরপর নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে সেইসব ছেলেমেয়েদের ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে অবশ্য বেতন দিতে হয়। এজন্য কয়েকটি স্পনশরকে পাশে পেয়েছে অম্বাতের সংস্থা। তারাই কিছু ছাত্রছাত্রীর খরচখরচা বহন করেন। কিন্তু অর্থের অভাবে বাকিদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বিল্ডিং ব্লকসকে। এখানে দু-বছর ইংরেজি শেখানোর পরে দেখা যাচ্ছে অভিভাবকরা সাধারণ কন্নড় স্কুলে ভর্তি করছেন নিজেদের সন্তানদের। ফলে প্রথম দু-বছরের উদ্যোগ কিছুটা হলেও বিফল হচ্ছে। অম্বাত মনে করেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়েদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এজন্য স্বপ্নটাকে আরও বড় করে নিয়েছেন অম্বাত। এমন একটি বড় স্কুল তিনি গড়ে তুলতে চান যেখানে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা ফ্রি-তে শিক্ষার সুযোগ পাবে। বিনামূল্যে সেই শিক্ষার সুযোগ মিলবে কলেজ শিক্ষা পর্যন্ত।

তবে আশা ছাড়ছেন না অম্বাত। দেশে চালু হয়েছে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার (রাইট টু এডুকেশন)। তাঁর আশা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভালো স্কুলে শিক্ষার সুযোগ মিলবে বস্তিবাসী ছেলেমেয়েদেরও। আর নিজেরাও পৌঁছে যেতে চান আরও শয়ে-শয়ে বস্তি এলাকায়। পৌঁছে দিতে শিক্ষার আলো।