‘বিটগিভিং’, একটি অফবিট উদ্যোগ

0

লাগাতার ভাল ফল করেও কেবল অর্থের অভাবে গোটা দলটাই বাদ হয়ে যাচ্ছিল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে। জাতীয় আইস হকি টিমের এই দুঃসময়ে তারা অর্থের জন্য বিটগিভিংয়ের দ্বারস্থ হয়। বিটগিভিং হল ভারতের সবচেয়ে বড় ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ সংগঠন। যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনও প্রকল্প বা উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে সকলের কাছে সামর্থ মত অর্থ দানের আবেদন জানায়। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারবেন না মাত্র ২০ দিনের মধ্যে আইস হকি টিমের জন্য সাড়ে ছ’লক্ষ টাকা তুলে দেয় বিটগিভিং। এই ঘটনা সামনে আসার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জাতীয় আইস হকি টিমকে। আনন্দ মহিন্দ্রা মত শিল্পপতি থেকে শুরু করে মাইক্রোম্যাক্সের মত সংস্থা, সকলেই দলটির পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন। ‌যে দলে একটাও স্পনসর ছিল না, ‌যারা অর্থের অভাবে দেশের হয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ দিতে পারছিল না, তাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে দেশের ক্রীড়ামন্ত্রকও। এত সাহায্যের হাত ধরে আরও ভালভাবে অনুশীলন করতে কুয়েত উড়ে যায় দলটি। যাওয়ার আগে একটি অনুষ্ঠানে দলের সহ-অধিনায়ক বিটগিভিংয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ঈশিতা আনন্দকে জানিয়ে যান, এই প্রথম তাঁর মনে হচ্ছে তিনি একটি জাতীয় দলের প্রতিনিধি। যা বিটগিভিংয়ের জন্যই সম্ভব হয়েছে।

২৬ বছরের ঈশিতার মতে, সে অবাক হয়ে গিয়েছিল এটা দেখে যে আইস হকির কোনও জাতীয় দল যে ভারতের আছে তাই কারও জানা ছিল না। টুইটারে একথা জানানোর পর বহু মানুষ এ সম্বন্ধে কথা বলা শুরু করেন। অনেকেই এই আপাত আসহায় দলটিকে সাহায্যের জন্য দরাজ হাতে এগিয়ে আসেন।

ঈশিতার কর্মজীবন শুরু হয় ২২ বছর বয়সে। ‘ডিইউ বিট’ নামে একটি নিউজলেটারে ডিজাইন হেড হিসাবে জীবন শুরু করেন তিনি। এরপর ফিল্ম মেকিং থেকে অ্যানিমেশন সবই আঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন ঈশিতা। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ঘেঁটে দেখার পরই তিনি বুঝতে পারেন আসলে তিনি মনে প্রাণে একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পোকা তখন তাঁর মাথায় ঘুর ঘুর করছে। সে আবেগ থেকেই প্রথমে তিনি চিত্রকরদের জন্য একটি ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্ঠা করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে দ্রুত সেই ব্যবসা লাটে উঠে যায়। কিন্তু হাল ছাড়েননি এই তরুণী। এভাবেই টলমলে পায়ে এগোতে এগোতে ২০১৩ সালে অবশেষে ঈশিতা আনন্দের হাত ধরে জন্ম নেয় বিটগিভিং।

বিটগিভিং প্রথমদিকে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছিল। কয়েকটি প্রকল্পের জন্য টাকা তোলার কাজও শুরু করেছিল তারা। কিন্তু কাজে নেমে ঈশিতা অনুভব করেন ভারতে এ ধরণের উদ্যোগের দরকার থাকলেও, এর সঙ্গে ভারতীয়রা ততটা পরিচিত নন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই বিটগিভিং বেশ কয়েকটি অপ্রচলিত আকর্ষনীয় প্রকল্পের প্রচারের কাজ শুরু করে। যার মধ্যে একটা ছিল ক্রমশ বিলুপ্ত হতে বসা কলকাতার ফিসিং ক্যাট সম্বন্ধে মানুষকে অবগত করা এবং এদের রক্ষা করতে অর্থ যোগাড়ের আবেদন জানান। হালফিল হয়ে যাওয়া নেপালের ভূমিকম্পে সাহা‌য্য পৌঁছতেও প্রচার শুরু করে বিটগিভিং। ঈশিতা জানলেন এই প্রচারে ৬০ লক্ষ টাকা তাঁরা তুলতে সমর্থ হন। তাঁর দাবি টাকা দেওয়ার ব্যপারে অনেকটাই এগিয়ে দেশের নতুন প্রজন্ম। তারা যথেষ্ট বুঝেশুনেই এই অর্থ দান করেন বলে দাবি করেছেন ঈশিতা।

বাবা চাকুরিজীবী। মা গৃহিনী। এমন এক পরিবারে জন্ম নেওয়া ঈশিতার দাদা বরুণ আনন্দও তার কাছ থেকেই ব্যবসার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বলে জানালেন গর্বিত ঈশিতা। তাঁর আক্ষেপ অনেক মহিলাই ব্যবসার জগতে সফল। কিন্তু তাঁদের অনেকেই নিজেদের সাফল্যের কথা জানাতে চান না। এমনকি অনেকে তো শুধু সংসারের জন্য অনেক লড়াই করে তৈরি ব্যবসা ছেড়েও দিয়েছেন। ঈশিতার দাবি, তিনি এমন মহিলাদেরও চেনেন যাঁরা নিজেদের কাজকে গুরুত্বই দিতে চান না। আর প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে তো মেয়েদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ঈশিতা মনে করেন এমন বহু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আছেন যাঁরা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও কোনও মহিলা সফল হতে পারেন একথা আজও বিশ্বাস করেন না।

বিটগিভিং ছাড়াও ঈশিতা আনন্দ মহিলাদের সাহায্যের উদ্দেশ্য তৈরি একটি অনলাইন কমিউনিটির সঙ্গে ‌যুক্ত আছেন। ‘লিন ইন ফাউন্ডেশন’ নামে এই কমিউনিটি মহিলাদের নিজেদের কাঙ্খিত লক্ষ্য ছুঁতে সবরকম সাহায্য করে। মার্কিন লেখিকা তথা সমাজকর্মী শেরিল স্যান্ডবার্গের আদর্শে অনেকটাই অনুপ্রাণিত ঈশিতা আনন্দ। লিন ইন ফাউন্ডেশনের সূত্রে শেরিলের সঙ্গে একবার দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সেই একদিনের সাক্ষাতেই শেরিল তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানালেন ঈশিতা।