শিরদাঁড়ার অসুখকে পরাস্ত করে জয়ী রাহুলের শিরদাঁড়া

0

যারা এই হেডলাইনটা পড়ছেন তাঁরা হয়ত ভাবছেন এর মানে কী! আসলে প্রথম শিরদাঁড়াটা রাহুল সেনের শরীরের অংশ। পরেরটি ওর মনের। কথায় বলে দেবতার কৃপা হলে পঙ্গুও নাকি গিরিলঙ্ঘনের ক্ষমতা ধরেন। কিন্তু, সেই দেবতা কোথায় থাকেন তা এতদিনে জেনে ফেলেছেন ভারত-বাংলাদেশ অক্ষর অভিযাত্রী রাহুল সেন। কলকাতার ছেলে। পাহাড় চড়ার নেশা।সাইকেল চালাতে ভালোবাসেন। কিন্তু জানেন কি ২৬ বছরের এই তরুণ গত বছর মেরুদণ্ডের এমন দুরারোগ্য অসুখে ভুগছিলেন যে পঙ্গুই হতে বসেছিলেন। 

রাহুলকে দমিয়ে দিয়েছিল তাঁর মেরুদণ্ডের দুরারোগ্য ব্যাধি। গত বছর এপ্রিলে ওঁর মেরুদণ্ডে জটিল অস্ত্রোপচার হয়। এরপর দীর্ঘদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিলেন। রাহুল জানালেন, ২০১৪ সালে মেরুদণ্ডে অসহ্য যন্ত্রণা টের পান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ডাক্তারবাবুরা জানিয়েছিলেন, লুম্বার বোনে চোট আছে। জটিল অস্ত্রোপচার করতে হবে। সাফল্যের সঙ্গে ওই অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০১৫ সালের এপ্রিলে। রাহুলকে ডাক্তারবাবুরা বাঁচিয়েছেন‌। কিন্তু ওঁকে দাঁড় করিয়েছে ওঁর ভীষণ মনের জোর। ওর মনেই ওর ঈশ্বরের বাস।

দ্রুত আরোগ্যলাভের জন্য রাহুল সেই ঈশ্বরের স্মরণ নিয়েছিলেন। রাহুলের কথায়, আমার ভগবান আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। নইলে বাড়ির বিছানায় পঙ্গু হয়ে শুয়ে থাকাই হত আমার নিয়তি। নিয়তি নাকি মানুষের পুরুষকার, শেষ হাসি কে হাসে? এই তর্কে রাহুলের জীবনে জয়ী হয়েছে ওঁর পুরুষকারই। অভিযাত্রীর পায়ের নীচে মাটির বদলে সর্ষে থাকে। তাই, সাধারণ জীবন তাঁকে সন্তুষ্টি দেয় না। বনের পাখিকে শিকল পরালে সে পাখির যেমন যন্ত্রণা, একজন অভিযাত্রীর কাছে দশটা পাঁচটার গতে বাঁধা জীবনও তেমন বন্দিদশার মতো।

টাচ অব হেভেনের তরফে যে পাঁচজন সাইক্লিস্ট ১৪ ফেব্রুয়ারি ইডেন গার্ডেন থেকে পাঁচটি সাইকেলে চেপে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। ইওর স্টোরির ফ্ল্যাগ নিয়ে জনসংযোগ করে। সেই দলে ছিলেন গড়িয়ার বাসিন্দা রাহুল সেন। 

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আর ছেলেকে নিয়ে বাবা-মাও বেশ গর্বিত। ওঁরা মনে করেন, পথেঘাটে ঈশ্বরই তাঁদের সন্তানকে র‌ক্ষা করবেন। গত বছর ছিল এক ভীষণ শঙ্কা। রাহুলের মেরুদণ্ডের জটিল অস্ত্রোপচারটি আদৌ সফল হবে, নাকি ও চিরদিনের মতো বিছানায় বন্দি হয়ে পড়বে, এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন রাহুলের অভিভাবকেরা। শেষপর্যন্ত হাসি ফুটেছে মুখে। যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছেন রাহুল। 

রাহুল বলছিলেন, অভিযানে যাওয়ার টান ছেলেবেলা থেকেই। বিশেষত, পাহাড় ভালোবাসেন। পর্বত অভিযাত্রী সঙ্ঘ থেকে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন রাহুল। আর লেখাপড়া করেছেন আশুতোষ কলেজে। বিষয় ছিল গণিত। পিছুটান বলতে রাহুলের তেমন কিছু নেই। রাহুল বললেন, পাহাড়-টাহাড়ে গেলে অভিভাবকেরা একসময় দুর্ঘটনার ভয় পেতেন। কখন কী হয় আর কী! ওঁদের আমি বলেছি, ঈশ্বর আমার ভিতর আছেন। ভয় পেয়ো না। বিপদ থেকে রক্ষা করবেন তিনি। থেকে থেকেই রাহুল তাই মনে মনে রবীন্দ্রনাথ আওড়ান, বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়...