শুরুতেই চোখে পড়ছে মল্লিকার লেদার লনড্রি

0

মল্লিকা শর্মার যখন ২৩ বছর বয়স তখন সে একদিন কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলেছিল তুমি খুব বোরিং মানুষ। সারক্ষণ শুধু কড়া নিয়মানুবর্তিতার কথা বল। আর চেয়ে থাক আমি কী করছি সেদিকে। মল্লিকার ক্ষোভ, ‌যখন তাঁর বন্ধুরা মাঝেমধ্যেই ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে , পার্টি করছে, তখন তাঁর প্রহরগুলো কেটেছে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে। সেদিনের সেই ক্ষোভ কিন্তু এখন আর নেই। বরং মল্লিকার দাবি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এখন বুঝতে পারেন একজন ভাল ছাত্র হওয়ার সুবিধাটা কতখানি। আজ তিনি যে কাজ করছেন তার চালিকা শক্তি লুকিয়ে রয়েছে সেদিনের সেই নিয়মানুবর্তিতা আর পড়াশোনার মধ্যে। এখন তিনি নিয়মানুবর্তিতা পছন্দ করেন, নিজের পড়ে থাকা কাজ নিয়মিত নোট করে রাখেন, ভবিষ্যতে কী করবেন সেই লক্ষ্য স্থির করেন, নিজের করণীয় কাজের যোগান তিনি নিজেই দেন। বর্তমানে তিনি একজন সময়নিষ্ট, আন্তরিক এবং একাগ্রচিত্ত মানুষ। মল্লিকার আজ আর কোনও সংশয় নেই যে তিনি ভাল ছাত্রী ছিলেন। তাঁর ছাত্রাবস্থার কোনও পরিশ্রমই বিফলে যায়নি বলে বিশ্বাস করেন তিনি। তাই আজ তাঁর সাফল্যের যাবতীয় কৃতিত্ব তিনি তাঁর সেই বোরিং মাকেই দিতে চান।

লেদার লনড্রি। মল্লিকার হাতে তৈরি সংস্থা। চামড়ার পোশাক থেকে শুরু করে জুতো বা অন্যান্য চামড়ার জিনিস পরিষ্কার করা, তাতে রং করা, সেগুলিকে দুর্গন্ধমুক্ত করা বা সেগুলিকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার জন্য আর যা যা করা যায় তা এক ছাদের তলায় করে দেয় এই লেদার লনড্রি।

মল্লিকার পরিবারে নতুন ব্যবসা দাঁড় করানোর একটা পরম্পরা ছিল। তাঁর বাবা প্রায় ১১ বছরের চেষ্টায় একটা ব্যবসাকে দাঁড় করান। বাবার কাছেই তাঁর ব্যবসার হাতেখড়ি। বাবার প্রখর ব্যবসা বুদ্ধি তাঁকে সবসময় আকৃষ্ট করত। ব্যবসা চালু করার ক্ষেত্রে স্বামীর মতই, মেয়েরও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। মল্লিকার দুই বড় বোনও নিজের নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। এককথায় মল্লিকা শর্মার পুরো পরিবারই ব্যবসায়ী পরিবার।

এত ব্যবসা থাকতে লেদার লনড্রি কেন? কীভাবেই বা মাথায় এল এই ব্যবসার ভাবনা। আসলে মল্লিকার বোন নেহা খুব অবহেলার সঙ্গেই চামড়ার জিনিসপত্র সাফাইয়ের লনড্রি খোলে। সেই শুরু। মল্লিকার ভাল লেগে যায় ব্যবসাটা। শুরু হয় লেদার লনড্রির পথচলা।

ব্রিটেন থেকে বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ওপর স্নাতকোত্তর করা শর্মা বোনেরা লেদার লনড্রির এই ব্যবসাকে দাঁড় করাতে আদা জল খেয়ে লেগে যান। প্রতি মুহুর্তে নতুন নতুন ভাবনা ও আরও ভাল কিছু করার খিদে তাঁদের দ্রুত ব্যবসাকে দাঁড় করানোর পথে এগিয়ে নিয়ে ‌যায়।

ব্রিটেনের অন্যতম লেদার কেয়ার সংস্থা এটিটি থেকে লেদার কেয়ার টেকনিশিয়ানের কোর্স করায় মল্লিকার পক্ষে ব্যবসা দাঁড় করানো অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছিল। চামড়ার সাফাই থেকে শুরু করে চামড়াজাত দ্রব্যের ‌যাবতীয় যত্নের তালিম এলটিটি থেকেই পান মল্লিকা। ‌মল্লিকার দাবি, লেদার লনড্রি চালু করার আগেই তিনি এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও নির্ভুল পরিকল্পনা করে নিয়েছিলেন। গ্রাহকরা অনেক সময়ই অভিযোগ করে থাকেন চামড়ার জিনিসপত্র কাচাকাচি বা মেরামতির জন্য দিলে তা আবার ফেরত পেতে মাস ঘুরে যায়। এতটা সময় নষ্ট করায় তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ২৬ বছরের উদ্যোগী যুবতী মল্লিকা লক্ষ্য করেন, দোকানে চামড়ার জিনিস দিলে তা তারা দেশের কোনও প্রান্ত বা অনেক সময় বিদেশে মেরামতির জন্য পাঠিয়ে দেয়। ফলে তা কাচা বা মেরামতি হয়ে ফিরতে অনেক সময় লেগে ‌যায়। শুধু সময় লাগাই নয়, এসব দোকানে দিলে বিশাল অঙ্কের বিলও গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। এখন প্রশ্ন হল সেক্ষেত্রে গ্রাহকরা স্থানীয় লনড্রিগুলিতে চামড়ার জিনিস কাচতে দেন না কেন? এসব ভাবতে গিয়ে মল্লিকা সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা বড় বড় লেদার ব্র্যান্ডগুলির কাছে ‌যাবেন। প্রাথিমকভাবে দুটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে লেদার লনড্রির কথা হয়। তারা তাদের গ্রাহকদের লেদার লনড্রিতে পাঠাতে সম্মত হন। মল্লিকা এবার চেষ্টা করতে থাকেন কিভাবে অন্যা অন্য শহরেও লেদার ব্র্যান্ডগুলির সঙ্গে কথা বলে লেদার লনড্রির পরিষেবা চালু করা যায়। এমনকি আগামী দিনে গ্রাহক ফোন করলে তাঁর বাড়ি থেকে চামড়ার জিনিস নিয়ে এসে তা মেরামত বা কাচাকাচি যা করার করে তা ফের বাড়িতেই পৌঁছে দেওয়া শুরু করবে লেদার লনড্রি।

চামড়ার জিনিসপত্র সংক্রান্ত যে কোনও সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে নিজেদের মুশকিল আসান হিসাবে তুলে ধরতে ব্র্যান্ডগুলো বিশেষ সাহা‌য্য করেছে বলেই জানিয়েছেন মল্লিকা। তাঁর মনে হয়, এখনও ভারতে চামড়াজাত দ্রব্যের যত্ন নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়নি। তবে তাঁর এও বিশ্বাস যে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। ফলে খুব দ্রুতই চামড়াজাত দ্রব্য কেনা ও তার যত্ন সংক্রান্ত বিষয়ে মানুষের ঝোঁক চোখে পড়বে। তবে মল্লিকার লেদার লনড্রি বানানোর ভাবনা একেবারেই নতুন এমন নয়। ইতিমধ্যেই ভারতে সাতটি এমন সংস্থা কাজ করছে। এখন মল্লিকা এদের চেয়ে আলাদা কী পরিষেবা দিতে পারেন তাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করবে।

কম দামে পরিষেবা দিয়ে প্রতিযোগীদের মাত দেওয়া নয়, বরং তাঁর কাজের গুণগত মানের জোরেই গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোয় জোর দিতে চান মল্লিকা। সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের পরিষেবা দিতে পারাও তাঁর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। মল্লিকার মূল লক্ষ্য শিক্ষিত গ্রাহক। যাঁরা গুণগত মানে জোর দেন, অযথা অর্থ অপচয়ে যাঁদের আপত্তি আছে এবং যাঁরা নীতিগতভাবে চিরাচরিত কেনাকাটায় বিশ্বাসী। মল্লিকার সবচেয়ে পছন্দের গ্রাহক হলেন তাঁরা, যাঁরা বাপ-ঠাকুরদার সময়ের চামড়াজাত দ্রব্য নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হন। তাঁরা এসব পুরানো জিনিসপত্রের কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ বা যত্ন করা যায় সে সম্বন্ধে মল্লিকার কাছে পরামর্শ চান। এটা তাঁর ভীষণ ভাল লাগে বলে জানিয়েছেন নারীবাদী মানসিকতার মল্লিকা। ব্যবসার বাইরে অবসর সময়ে ঘুরে বেড়াতে আর বই পড়তে পছন্দ করেন মল্লিকা। ভালবাসেন টেনিস খেলতেও। বর্তমানে দিল্লির আইআইএইচআর থেকে মানবাধিকার নিয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করছেন ২০১৫-এ লেদার লনড্রি ব্যবসায় পা রাখা এই তরুণী শিল্পোদ্যোগী।