মনুশ্রীদি আছেন, চিন্তা নেই চণ্ডীতলার মেয়েদের

0

সংসার সামলে ব্যাগ তৈরি করেন ওঁরা। অনেকে আবার নিজেদের হাতে গড়া স্বনির্ভর গোষ্ঠী থেকে ঋণ নিয়ে বাড়িতে কাঁথাস্টিচের ওপর শাড়ি বোনেন। কেউবা বাড়িতেই তৈরি করেন ক্রিস্টালের নানা সামগ্রী, গয়না। হুগলির চণ্ডীতলার পাঁচঘরা পঞ্চায়েত এলাকার মহিলারা এখন এভাবেই স্বাবলম্বী। আর এসবের পিছনে পিছনে আছেন মধ্য চল্লিশের মনুদি, মনুশ্রী পাল। তাঁকে দেখে এলাকার মেয়েরা অনেক স্বপ্ন বুনে চলেছেন।

২০০৫ সালের কথা। আচমকাই মারা যান মনুশ্রীদেবীর স্বামী। পরিবারের একমাত্র রোজগেরেকে হারিয়ে কার্যত অথৈ জলে পড়েন তিনি। শাশুড়ি, চতুর্থ শ্রেণির পড়া ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন সাধারণ পরিবারের এক বধূ। তাঁর কথায়, “বিপদই নতুন সম্ভাবনার পথ দেখায়। স্থানীয় পাঁচঘরা পঞ্চায়েতে গিয়ে নানারকম কাজের খোঁজ করি। কিন্তু সেখানেও জোটে নানা গঞ্জনা। বাড়িতে যখন মেয়েদের নিয়ে স্বনির্ভর দল গড়ে তোলেন তখন পরিবারের থেকেই অনেক কথা শুনতে হয়েছিল।”

অনেক উতরাই পিছনে ফেলে গ্রামের মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ বাতলে দেন মনুশ্রী পাল। আশেপাশের মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে মনুশ্রীদেবীর বুঝতে অসুবিধা হয়নি সংসারে যত সমস্যার মূলে আর্থিক অনটন। মেয়েদের বোঝান হাতের কাছে অনেক কিছু আছে যা দিয়ে অনেক অভাবই মিটতে পারে। মনুশ্রীদেবীর পরামর্শে কেউ পাটের কাজ শুরু করলেন, কেউ আবার ব্যাগ, কারও হাতে ফুটল ক্রিস্টালের নানা জিনিস। কেউ কাঁথাস্টিচের ওপর পাউঞ্জাবি, চুড়িদার, শাড়ি তৈরি করতে লাগলেন। বছর দশক আগে সেই উদ্যোগের শুরু কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে চণ্ডীতলার আনাচে-কানাচে। এখন ৯২টি দলের প্রায় ১০০০ এর ওপর মহিলা রয়েছেন।

চণ্ডীতলার পাঁচঘরা পঞ্চায়েতের এই মুহূর্তে কমিউনিটি সার্ভিস প্রোভাইডারের দায়িত্বে রয়েছেন মনুশ্রীদেবী। নতুন দল গঠন করা, তাদের পরিচালনা করা, কাজের লক্ষ্য বাড়ানো, বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনীতে যাওয়া। কাজের শেষ নেই তাঁর। মনুশ্রীদেবী বলেন, মেয়েদের কাজের প্রতি স্পৃহা মারাত্মক। সংখ্যালঘু পরিবারের মেয়েরা যারা এক সময় বাড়ি থেকে বের হত না, তারা কাজ করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। ওদের মধ্যেও এমন শিল্পকর্ম আছে তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কেউ কেউ ১০০ দিনের কাজ করেন। সেই সব কাজ সামলে আবার ব্যাগ বা কাঁথাস্টিচ করতে বসে পড়েন তারা। এরা এতটাই পরিশ্রমী যে ভোরবেলায় উঠে রান্না সেরে নেন। তারপর নানারকম কাজ করেন।

মনুশ্রীদেবীকে দেখে প্রভাবিত সাফিউন্নেসা, শঙ্করী হালদার, অপর্ণা মাইতিদের। সাফিউন্নেসা বিধানচন্দ্র রায় মহিলা সংঘ নামের স্বনির্ভর দলের প্রশিক্ষণ দেন। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীর পাশাপাশি বেঙ্গালুরুতেও গিয়েছেন তিনি। গত অক্টোবরে ওই প্রদর্শনীতে মাত্র তিন দিনে ওই গোষ্ঠীর প্রায় দেড় লক্ষ টাকার সামগ্রী বিক্রি হয়। ভদ্রমহিলার কথায়, “প্রদর্শনীতে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যখন ঘরে ফিরি তখন তৃপ্তি পাই। বুঝতে পারি যে লক্ষ্যে এগোচ্ছি তাতে মনে হয় কিছুটা সাফল্য পেয়েছি।” সাফল্যেনর সরণির ঠিকানা পেয়ে ফুটছেন এইসব মহিলারা। কেউ কেউ ব্য ক্তিগত কলকাতা ও বিভিন্ন জায়গার ব্য বসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রচুর সামগ্রী বিক্রির অর্ডার পেয়েছেন।

Related Stories