আমসত্ত্বও খুঁজছে একটা স্টার্টআপ, একটা Innovation

2

আমের সিজনটা এলেই মনে পরে যায় ছোটো বেলার কথা। কাঁচা আম চিলে কোঠায় বসে কাসুন্দি, লঙ্কা, আর নুন দিয়ে মাখা। সে সব জম্পেশ আয়োজন। কত বন্ধু জুটে যেত সেই পিকনিকে। আর আমে রঙ ধরলে, কালবৈশাখীর ঝড় এলে সবাই মিলে আম কুড়তাম। তারপর চুষে চুষে আম খাওয়া সে এক দৃশ্য। আমের রস বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝ খান দিয়ে নদীর মতো গড়িয়ে পড়ত। সেই অমৃত জিভ দিয়ে চেটে নেওয়ার শৈশব ছিল আমাদের। আমের সিজনের আরেকটা কথা মনে পড়ছে। ছাতে আমের আমসি বানাতেন ঠাকুমা। আর মা মোরব্বা বানাতেন। চিনির সিরা দিয়ে মৌরি ভাজা ছিটিয়ে আরও কতরকম মশলা কোনও টা ভাজা করে কখনও গোটা গোটা মশলা ছিটিয়ে কী শিল্পিত মোরব্বা হত। বয়ামে বয়ামে সাজানো থাকত ছাদের রোদে। খাবার টেবিলে। ক্রচেটের কাজ করা সাদা সাদা টেবিল ক্লথ পাতা থাকত, তার ওপর মোরব্বার মোহময়ী রূপ। রোদ এসে পড়লেই কী দারুণ সব রঙ খেলত টেবিল জুড়ে। আমরা দেখতাম। সাদা ওই টেবিলের মাঝখানে মা একটা কাচের গ্লাসে সাজিয়ে রাখতেন রঙিন পাতাবাহারের পাতা। পেঁচানো পেঁচানো লাল হলুদ আর সবুজের অনির্বচনীয় সেই শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। প্রতিবার। এবারও রেললাইন পেরবার সময় দেখলাম আমের দাম অনেকটা কমেছে। প্রচুর আম। গন্ধে মম করছে বাজার। আমসত্ত্বটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আজকাল। রবি ঠাকুরের সেই ছড়াটা, "আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি..."

হ্যাঁ আমসত্ত্বও বানানো হত। মা কিংবা ঠাকুমা কিংবা পিসি কে বানাতেন অত স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু ছোটবেলায় মনে আছে গাছের আম পাড়া হলে কিছু আম আলাদা করে রাখা হত আমসত্ত্ব বানানোর জন্যে। সারাদিন ধরে তারই মহাসমারোহ চলত। আম সেদ্ধ করে নিংড়ে রস বের করতেই কেটে যেত বেলা। তারপর মসলা, গুড় মেখে শুকোতে দেওয়া দিনের পর দিন। শুকিয়ে তুলে বয়ামে ভরে রাখা হত। আমসত্ত্ব।

স্কুলের গেটের বাইরে আচারকাকুর আমসত্ত্বও কম খাইনি। আমসিও খেয়েছি। তবে আমসত্ত্ব অমৃতের মতো লাগত, এখনও লাগে। মালদহে থাকেন আমার এক সাংবাদিক বন্ধু একবার খাঁটি আমসত্ত্ব এনেছিলেন, এই খাঁটি শব্দটা আমাকে স্পেশালি বলেছিলেন কারণ ওটা শক্ত আর ভীষণ কালো বিস্কুটের মতো বলে আমি একটু সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু ভেঙে ওই শক্ত আমসত্ত্ব মুখে দিতেই গলে জল। দোকান থেকে কেনা চৌকো চৌকো হলদেটে সেলোফেনে মোড়া মিষ্টি আমসত্ত্ব আবার অন্যরকম খেতে। চিনির দাগ থাকে। ওটা যেন মেকি। কিন্তু যাই বলুন আমসত্ত্ব মানেই এক সুস্বাদু ডেলিকেসি!

আমসত্ত্ব রফতানির তোড়জোড় চালাচ্ছে নবান্ন

শুনছি এবার বিদেশেও দারুণ রফতানি হবে রাজ্যের এই সম্পদ। নলেনগুড়, জয়নগরের মোয়া, বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানার মতো আমসত্ত্বও বাংলার গর্ব। বাঙালির রসনা বিলাসের এক অথেনটিক উপকরণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যতই নাক সিটকক, গোলাপ-খাস, ল্যাঙরা, হিমসাগর, বেগম-পসন্দ কিন্তু বেশ পছন্দ বিদেশিদের। সেই সুযোগকেই কাজে লাগাতে মরিয়া রাজ্য। বিশ্ববাজারে আমসত্ত্বের মহিমারও প্রচার চলছে।

বাঙালির রসনা বিলাসের এমন জনপ্রিয় উপকরণকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য তার উৎপাদন বাড়ানোর তৎপরতা এখন তুঙ্গে। এ বার আমের ব্যাপক ফলন হয়েছে। ফলে আমসত্ত্বের মূল উপকরণের অভাব আপাতত নেই। সাগরপারে আম রফতানির সঙ্গে সঙ্গে তাই আমসত্ত্বেও বিশ্বরসনা মোহিত করে দেওয়ার সুযোগ নিতে চাইছে নবান্ন। কিন্তু উৎপাদনে ঝক্কি আছে।

আমসত্ত্বের পীঠস্থান মালদহের সেই কোতোয়ালি। আমসত্ত্বের কারিগরেরা জানাচ্ছেন, সেরা আমসত্ত্ব পাওয়া যায় ঘন, আঁশওয়ালা রসের আম থেকেই। গোপালভোগ ও হিমসাগরের আমসত্ত্বের জুড়ি নেই। এক ফোঁটা চিনির রস বা অন্য কোনও উপাদান তাতে মেশানো হয় না। গুড়ের মতো মিষ্টি হয় আমসত্ত্ব, লজেন্সের মতো চুষে বা বিস্কুটের মতো ভেঙে খাওয়া যায়। কিন্তু আমসত্ত্ব বানানোর ঝক্কি তো কম নয়। তাই মালদহের এমন উৎকর্ষ সৃষ্টিতেও ভাটার টান।

প্রযুক্তি হাতড়ে বেড়াচ্ছে আমসত্ত্ব

এই রিয়েল লাইফ সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি দিয়ে করতে পারলে সব থেকে ভালো হত। এমন কোনও স্টার্টআপ যদি আমসত্ত্ব তৈরি করার প্রক্রিয়া সরল করতে পারত তবে সোনার খনির হদিস পেত মালদহ। আর সমৃদ্ধ হতে পারত বাংলা। এখানেই একটি স্টার্টআপ আইডিয়া খুঁজছেন মালদহের মানুষ। 

কথা হচ্ছিল মালদহ ম্যাঙ্গো মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কর্তা উজ্জ্বল চৌধুরীর সঙ্গে। ওদের ৪৫ বিঘা আমবাগান। আগে ঘরের মেয়েরাই আমসত্ত্ব বানাতেন। এখন সে সব হয় না। অত সময় কোথায়। উজ্জ্বল বলছিলেন বেশি উৎপাদনের জন্যে যন্ত্রের ওপর ভরসা করতেই হবে। অটোমেশন ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়। আমকে লাভজনক করতে আমজাত পণ্য তৈরি বাড়াতেই হবে। মালদহে ব্যাপক ফলন হয় আমের। ভাল আমের দর প্রতি কিলো ২০-২৫ টাকা‌। সেরা আমসত্ত্ব কিন্তু ৫০০-১৫০০ টাকা কিলো দরে বিক্রি আছে। আমের আচার, জ্যাম জেলি, আম-কাসুন্দি ইত্যাদির মধ্যে আমসত্ত্বই রাজা। জেলায় ফি-মরসুমে ৮০০-৯০০ কুইন্টাল আমসত্ত্ব তৈরি হয়। সেই উৎপাদন আরও যাতে বাড়ে, তার জন্য চলছে প্রযুক্তির খোঁজ।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কৃষি বিপণন দফতরের কর্তারা বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় আলোচনায় বসছেন। তবে ব্যাপক পরিমাণে রফতানি-যোগ্য উন্নতমানের আমসত্ত্ব তৈরির পরিকাঠামো রাজ্যে যে নেই সেকথা মানছেন দফতরের কর্তারাও। ইদানীং কমবেশি যন্ত্রের প্রয়োগ হলেও আমসত্ত্বের কারিগররা বলছেন, মেশিনে আমসত্ত্ব তৈরির ফলে রসের ঘনত্ব মাপমতো হচ্ছে না। রসের গাঢ় প্রলেপ শুকোনোর কসরতও ‘ড্রায়ারে’ ঠিক জমছে না। রাজ্যের কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার অবশ্য আশাবাদী, রাস্তা ঠিক বেরোবেই। কেরল তো দিব্যি যন্ত্রে তৈরি আমসত্ত্বেই বাজার মাতাচ্ছে। এখানেও কথা চলছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। উপায় বেরিয়ে গেলেই আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। বাংলার আমসত্ত্ব যে বিশ্ব মাতাবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।