শূন্য থেকে শুরু করে আকাশ ছুঁলেন ২২ বছরের ইশান

0

২২ বছরের ঈশান ভ্যাসের অ্যাসপ্রিকটের উপস্থিতি ৩৬টি দেশে, অফিস হলিউডে,কোম্পানির মূল্য ধার্য্য ২ মিলিয়ন ইউএস ডলার

জুলাই ২০১৩, সঙ্গী একটি ল্যাপটপ, একটি ডেস্কটপ ও দুই বন্ধু। এই নিয়ে কোনও মূলধন ছাড়াই নিজের ওয়েব-ডিজাইনিং ও ডিজিটাল বিজনেস কোম্পানি শুরু করেন ২০ বছরের ঈশান ভ্যাস। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ টাকার অর্ডার পায় ঈশানের অ্যাসপ্রিকট। মাত্র দু’বছরে অ্যাসপ্রিকট এখন ২ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের কোম্পানি, অফিস রয়েছে হলিউডে, উপস্থিতি ৩৬ টি দেশে। গুণ মানের সঙ্গে এতটুকুও আপোষে অরাজি অ্যাসপ্রিকট চায় ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইনিং এর ধারণায় আমূল পরিবর্তন।


টিম অ্যাসপ্রিকট
টিম অ্যাসপ্রিকট

অন্যান্য ডিজিটাল বিজনেস কোম্পানির থেকে একাধিক কারণে আলাদা অ্যাসপ্রিকট। প্রথমত, নকল বা কপি-পেস্টের বিরোধী অ্যাসপ্রিকট, তাদের তৈরি প্রতিটি ডিজাইন একটির থেকে অন্যটি সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক সময়ই ক্লায়েন্ট এমন অনেক সুবিধার কথা জানে না যেটা তাদের কাজে লাগতে পারে, অ্যাসপ্রিকট ওয়েব ডিজাইনের সময় সেই সমস্ত সুবিধাই ওয়েবসাইটে রাখে এবং একটি প্রজেক্ট শেষ করতে সময় নেয় মাত্র ছ’দিন। “আমরা সবসময়ই রেসপন্সিভ ওয়েবসাইট বানাই এবং সর্বতোভাবে প্রযুক্তিগত গুণ মান অনুসরণ করি। একাধিক ডিভাইসে ওয়েবসাইটটি পরীক্ষা করে দেখা হয় যাতে ডব্লিউথ্রিসি অনুযায়ী কোনও ভুল না থাকে, এবং আমরা এদিকেও নজর রাখি যাতে ওয়েবসাইটটির গুগল পেজ স্পিড টেস্টে স্কোর ৮০ এর ওপরে থাকে। এই একই সাইট আমরা দ্বিতীয়বার অন্য কোনও ক্লায়েন্টের জন্য আর ব্যবহার করি না,” জানালেন ঈশান।

দ্বিতীয়ত, অ্যাসপ্রিকট নিজেদের কোম্পানির জন্য একটি সুবিন্যস্ত পদ্ধতি তৈরি করেছে। ঈশানের মতে, “বেশিরভাগ শুরুয়াতি ব্যবসা কোনও সুবিন্যস্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে না। শুরুর দিকে অনভিজ্ঞতার কারণে আমি নিজেও সেই ভুল করেছি। কিন্তু সেই ভুল গুলো বিশ্লেষণ করে পরে আমি এই পদ্ধতি তৈরি করি, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কাজের ক্ষেত্রে সমমান, এটাই চাবিকাঠি”।

কোম্পানির একটি অত্যন্ত দক্ষ সেলস ও সাপোর্ট টিম রয়েছে, রয়েছে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা। যেমন সেলসের কোনও কর্মী যদি ১৫ মিনিটের মধ্যে ইমেল-এর উত্তর না দেন তাহলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই কোম্পানির ৬০ শতাংশ কর্মী মহিলা এবং দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত। এই লিঙ্গ অনুপাত বদলের কোনও ইচ্ছা নেই অ্যাসপ্রিকটের।

অ্যাসপ্রিকট মনে করে, “শিল্প আপোষহীন আর জীবন আপোষে ভরা”।

প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ

ইন্দোরের ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম ঈশানের। বাবার বিয়ে বেশি বয়সে, তাই ঈশান কৈশোরে পৌঁছতেই বাবার অবসরের সময় চলে আসে। তবে ছেলেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে কোনও ত্রুটি রাখেননি তিনি।

কিশোর বয়েসে বাকি সব বন্ধুরা যখন ভিডিও গেমে বুঁদ, ঈশান তখন ব্যস্ত থাকত ওয়ার্ডপ্রেস ডিজাইনে। ২০০৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়েসে একটি কোম্পানির ওয়েব-ডিজাইন করে পায় ৩,৫০০ টাকা। এটা সেই সময়ের কথা যখন অফিসে কম্প্যুটার না থাকলেও নিজেদের বিজনেস কার্ডে একটি ওয়েব অ্যাড্রেস রাখতে চাইত কোম্পানিগুলো।

ঈশান ভ্যাস
ঈশান ভ্যাস

ক্লাস টেনে অঙ্কে ফেল করেন ঈশান, ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় ১১ মাস একটি কোম্পানিতে কাজও করেন। পরে বেঙ্গালুরু যান বিবিএ পড়তে। সেখানে পড়ার সময় একটি শুরুয়াতি কোম্পানির খবরের পোর্টালে কাজ করেন ঈশান। সেই অভিজ্ঞতাই সাহায্য করে নিজের ব্যবসা শুরুর উদ্যোগে।

“বাবা মায়ের সহযোগিতা পেয়েছি সব সময়, আমাদের মত ব্রাহ্মণ পরিবারে ব্যবসা নিয়ে ছুৎমার্গ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আমার ওপর যে ভরসা ও সমর্থন দেখিয়েছেন, আমি কৃতজ্ঞ”, বললেন ঈশান।

তবে অন্য চ্যালেঞ্জ ছিলই। মানুষ এখনও বয়েস দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করে। তাই শুরুর দিকে মানুষকে এটা বোঝানই মুশকিল হত যে আমার কোম্পানির একটি নির্ভরযোগ্য মডেল রয়েছে ও আমি বেতন দিতে পারব,” বললেন ঈশান।

এই ২২ বছরের উদ্যোগপতির কোম্পানি ইতিমধ্যেই রিয়্যাল এস্টেট, স্বাস্থ্য পরিষেবা, জামাকাপড়, মোবাইল অ্যাপ সহ বিভিন্ন ধরণের ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। ক্লায়েন্টের তালিকায় রয়েছে CISCO, IBM, দুবাই এয়ারশো-এর মত কোম্পানি। কোম্পানির হেড কোয়ার্টার ইন্দোরে, এছাড়াও অফিস রয়েছে হলিউডে। কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা চলছে যারা এ পর্যন্ত কোম্পানির মূল্য ধার্য করেছে ২ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

ঈশান জানালেন, “সকলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়াই আমাদের শেখার পথ। আমরা ভাল ও মন্দ বিচার করি। হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করতে গিয়ে ব্যর্থ হই, কিন্তু এভাবেই একই জিনিস আরও ভালভাবে করতে শিখি আমরা”।

আগামীর পরিকল্পনা

নিজেদের কাজে নতুনত্ব আনতে সবসময়ই নানা জিনিসকে মেলানো ও খুব তাড়াতাড়ি নতুন প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেওয়ায় বিশ্বাস করে অ্যাসপ্রিকট। “আমরা ওয়্যারেবলে কাজ শুরু করছি, ইতিমধ্যেই অ্যাপেল ওয়াচ অ্যাপের সঙ্গে কাজ করছে অ্যাসপ্রিকট। এর পরের লক্ষ্য অকুলার ভিআর”। বললেন ঈশান।

বর্তমানে কর্মী সংখ্যা ২২, এই বছরের শেষে ১০০ জনে পৌঁছতে চান ঈশান। আগামী বছর হাজারে। “আমি চাই ভারতের সবথেকে বড় ডিজিটাল ব্যবসা পরিষেবার কোম্পানি হয়ে উঠুক অ্যাসপ্রিকট,” বললেন আত্মবিশ্বাসী ঈশান।