লন্ডনের কেরিয়ার ছেড়ে ট্যাক্সি-ক্যানভাসে মত্ত মুম্বইয়ের ডিজাইনার

0

শিল্পী মন যেকোনও সাধারণ জিনিসের মধ্যেই খুঁজে নেয় তাঁর শিল্প, সৃজনশীলতায় তা থেকেই তৈরি করে অনন্য শিল্পকর্ম। মুম্বইএর শিল্পী সংকেত অভলানি তেমনই ট্যাক্সিকে বেছে নিয়েছেন তাঁর ক্যানভাস হিসেবে। শুরু করেছেন ডিজাইন প্রজেক্ট Taxi Fabric, বর্তমানে যা হয়ে উঠেছে তরুণ প্রতিভাবান শিল্পীদের শিল্প প্রদর্শনের এক মঞ্চ। ব্যবসার পরিকল্পনা নয় প্রজেক্টটির শুরু আগ্রহ ও শৈল্পিক তাগিদ থেকেই।

“প্রতিদিন ট্যাক্সিতে অফিস যাওয়ার সময় ট্যাক্সির আসনের কভারগুলি লক্ষ্য করতাম, একেকটির নকশা একেকরকম, বেশ লাগত, আগ্রহের বশেই সেগুলির ছবি তুলে ক্যাটালগ তৈরি করে একটি ব্লগে তুলতে শুরু করি। ব্যবসার জন্য নয়, নিছকই একজন শিল্পীর খেয়াল। আবার শিল্পী হিসেবে এটাও মনে হয় যে ট্যাক্সির আসনের এই ক্ষেত্রটিকে অন্য ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক বেশি সমসাময়িক ও সৃজনশীলভাবে, মানুষের কাছে পৌঁছনোর মাধ্যম হতে পারে এটি। যদিও অনেকেই বলছিল আমার এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই,” বললেন সংকেত।

কিছুদিন আগে পর্যন্তও এটি শুধুমাত্র একটি ডিজাইন প্রজেক্টই ছিল। “ট্যাক্সিতে যদি আমি আমার কাজ রাখি তাহলে হাজার হাজার মানুষ সেই কাজ দেখবে, এই ভাবনাটাই ছিল মূল। এখন এই প্রজেক্টই হয়ে উঠেছে নতুন উদীয়মান শিল্পীদের মঞ্চ”, বললেন সংকেত।


সংকেত তাঁর পরিচিত আরও কিছু ডিজাইনারের সঙ্গে ট্যাক্সির সিট কভার ও ভিতরের দেওয়ালের কভারের জন্য প্রথম কয়েকটি ডিজাইন তৈরি করার চেষ্টা করেন।

“ডিজাইনগুলিকে ফেব্রিকে তৈরি করে সেটাকে ট্যাক্সির উপযুক্ত করে তোলার দায়িত্ব ছিল আমার। ফেব্রিকের গুণমান, সেলাই, সঠিক কারিগর ও ছাপাখানা খুঁজে বের করা, খুবই পরিশ্রমসাধ্য ছিল কাজটা। অন্য ডিজাইনার, ট্যাক্সি ড্রাইভার, উদ্যোগপতি ও বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় একবছর আলাপ আলোচনা চালিয়ে বুঝতে পারি কাজটা শুরু করে দেওয়া প্রয়োজন, তারপর বাকিটা কাজ করতে করতেই শেখা যাবে”। সংকেত এই সময় একবছরের জন্য লন্ডনে যান কাজে, সেখানে তিনি এই প্রজেক্টটি নিয়ে যান। সেখান থেকেই মুম্বইয়ের ট্যাক্সিতে প্রথম কাজটি করা ঠিক হয় এবং সেই সময়ই আলাপ হয় নাতালি গর্ডনের সঙ্গে, তাঁকে পুরো পরিকল্পনাটির কথা জানান সংকেত। কিকস্টার্টারে প্রজেক্টটি নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন নাতালি, সৃজনশীল প্রজেক্টের জন্য ক্রাউডফান্ডিংএর সবথেকে জনপ্রিয় মঞ্চ কিকস্টার্টার।

“আমি ওদের নানা ক্যাম্পেন পর্যবেক্ষণ করি, বোঝার চেষ্টা করি কী ধরণের প্রজেক্ট টাকা পাচ্ছে! কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আমাদের ক্যাম্পেন তৈরি করে ফেলি। শুরুতে পাঁচটি ট্যাক্সিতে কাজ করি। গৌরব ওগালে করেন প্রথম ট্যাক্সির ডিজাইন, দ্বিতীয়টি করি আমি, বাকি তিনটি আরও তিনজন ডিজাইনার। আমরা পুরো পদ্ধতিটি ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া, ছবি ও লেখার মাধ্যমে নথিবদ্ধ করি। তারপর কিকস্টার্টারের কাছে পুরো বিষয়টি রাখি, বলি, এটা এমন একটা মঞ্চ যার মাধ্যমে ডিজাইনাররা তাঁদের কাজ মুম্বইয়ের অন্যতম জনপ্রিয় যানে প্রদর্শন করতে পারবে”।

জিবিপি-৮000 (ভারতীয় টাকায় মূল্য আট লাখ) অনুমোদন মেলে, যাতে ২৫ টি ট্যাক্সির কাজ করা যেতে পারে।

“লন্ডনে আমার কোম্পানি প্রাথমিক ১ লক্ষ টাকা দেয় কাজ শুরুর জন্য। এখনও আমাদের ক্যাম্পেনের একটা বড় অংশের বিনিয়োগ আসে আমেরিকা থেকে।

৩০ টি ট্যাক্সিতে কাজের টাকা পাওয়ার পর প্রথম ভাবনা ছিল কীভাবে সেই টাকার সদ্ব্যবহার হবে। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা বিনামূল্যে তাঁদের ডিজাইন প্রদর্শনের জায়গা দিচ্ছিল। পরিবর্তে তাঁরা দিচ্ছিলেন ফেব্রিক ও কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের ভাড়া।

প্রত্যেক শিল্পীকে তাঁর ট্যাক্সিতে ইচ্ছে মতো কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রত্যেকে একটি থিম ধরে কাজ করে। শহর, দেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের ছবি উঠে আসছিল সূক্ষ, স্মার্ট আধুনিক তুলির টানে। একটি যেমন ছিল মুম্বইয়ের বিবর্তনের ওপর, বাড়ির গঠনের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তা বোঝানো হয়। অন্য এক শিল্পী ইলেক্ট্রিক নীল এর ওপর এঁকে দেন মুম্বইয়ের প্রিয় পানীয় চায়ের গ্লাস। সবকটি ডিজাইনই ভীষণভাবে আদৃত হয়।

“শিল্প প্রদর্শনের পাশাপাশি সামাজিক কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে এই মাধ্যমকে। ডিজাইন, যোগাযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যমও বটে, এবং তা পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতে পারে, পৌঁছে দিতে পারে একটি বার্তা ও তা সৌন্দর্যের সঙ্গে,” বললেন সংকেত।

সংকেতের প্রিয় এরকমই একটি ক্যাম্পেন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ থিম। “ভারত পাকিস্তানের শত্রুতা আমার খুবই খারাপ লাগার একটি জায়গা, আজ এতদিন পরেও দু দেশের মানুষের মধ্যে এত তিক্ততা, এত ভুল ধারণা একে অপরের সম্পর্কে। আমরা করাচির ডিজাইনার সামিয়া আরিফের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। সামিয়াও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। আমাদের একটি বড় পাওনা হল, সামিয়ার কাছে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আসা একটি ইমেল যেখানে তাঁরা আমাদের শান্তি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়”, বললেন সংকেত।

এখনও এই উদ্যোগ লাভের মুখ না দেখলেও কিছু প্রতিষ্ঠিত ডিজাইনার নিজেদের কাজের ফেব্রিকের টাকা নিজেরাই দেন, ফলে টিমের ভার কিছুটা লাঘব হয়। আরও একটি ক্যাম্পেন ছিল ভারতীয় সাংকেতিক ভাষা প্রজেক্ট। ভারতে শ্রবণে অক্ষম মানুষের সংখ্যা গোটা ইউরোপের থেকে বেশি, কিন্তু তাঁদের ভাবের আদান প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা বোঝার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ট্যাক্সি ফেব্রিক একটি ট্যাক্সিকে সাংকেতিক ভাষার গাইডলাইন দিয়ে সাজায়। শ্রবণে অক্ষম কিছু শিশুকে যখন সেই ট্যাক্সি দেখানো হয় তাঁদের খুশির অন্ত ছিল না। তাদের ভাষা এরকম লোকসমক্ষে আগে দেখেনি তারা। ট্রাকে যে ধরনের রাস্তায় সুরক্ষার বার্তা থাকে সেই ট্রাক শিল্পকে নিজেদের ডিজাইনের আওতায় আনার ইচ্ছে রয়েছে সংকেতের।


“বিভিন্ন সংস্থায় হয়ে কাজ করতে চাই আমরা। যেকোনও ব্র্যান্ড, যারা সুস্থ সাংস্কৃতিক প্রচারে ইচ্ছুক তাদের সঙ্গেই কাজ করব আমরা। বিভিন্ন ব্র্যান্ড আমাদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে, কিন্তু আমরা আমাদের মূল জায়গা থেকে সরতে রাজি নই তাই এখনও পর্যন্ত কারোও প্রস্তাবই গ্রহণ করিনি। আমরা চাই অর্থবহ সৃজনশীল ডিজাইন তৈরি করতে। স্বপ্ন, সরকারের তরফ থেকে আমাদের শিল্পকে বিভিন্ন জায়গায় জনসমক্ষে নিয়ে আসার প্রস্তাব পাওয়া”, বললেন সংকেত।