একই অঙ্গে কত রূপ

চরিত্র একটি৷ মঞ্চও একটি৷ কিন্তু, কাহিনী দু’জনের৷ একটি সফল একজন নারীর৷যাঁর একই অঙ্গে একাধিক রূপ৷ আরেকটি একটি মেয়ের চরাই উতরাইয়ের কাহিনী৷ আর চরিত্রের নাম সুমা ভট্টাচার্য৷ ভারতের প্রথম মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন ক্যুইকওয়ালেটের সঙ্গে যাঁর নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷ যাঁর ব্যস্ত জীবনের বেশিরভাগটাই কেটে যায় বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের হিসেব নিকেশ করতে করতেই৷ কিন্তু, শুধু একজন সফল উদ্যোগপতি হিসেবেই যদি তাঁকে দেখেন, তাহলে হিসেব মেলাতে পারবেন না৷ কারণ, তাঁর এই উত্তরণ খুব একটা মসৃণ পথ ধরে হয়নি৷ ছেলেবেলাতে তাঁকে যুঝতে হয়েছে নানা সমস্যার সঙ্গে৷

0

তাঁর যখন মাত্র সাত বছর বয়স, তখনই সুমার মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়৷ সে যখন বেড়ে উঠছে, তখন অন্যান্য শিশুদের মতো বাবার সহচর্য পায়নি সুমা৷তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়র৷কর্মরত ছিলেন ব্রিটিশ রেলওয়েতে৷ আর লন্ডনে জন্ম হয় সুমার৷ কিন্তু, ১৯৯০ সালে তাঁর বাবার অবসরের পর থেকেই সবকিছু বদলাতে থাকে৷তাঁর মা ও বাবার মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব তৈরি হতে থাকে৷ এর পর বিবাহ-বিচ্ছেদ৷

ওই বয়সেই আদালতেও যেতে হয় তাকে৷ কার সঙ্গে সে থাকতে চায়? খুব অল্প বয়স হলেও বিচারকের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি সে৷ মায়ের সঙ্গেই থাকবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় সুমা৷

এর মাঝেই চলতে থাকে তার পড়াশোনা৷ সঙ্গে কত্থক নাচেরও প্রশিক্ষণ নেয় সে৷ ধীরে ধীরে ২০০৬ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হওয়ার পরই আসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়৷


একই সঙ্গে থিয়েটারের প্রতিও ভালোবাসা বাড়ে সুমার৷ কিন্তু, যখন প্রতিটি তরুণ-তরুণী ভবিষ্যত হিসেবে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং ও ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্সিকে বেছে নিচ্ছে, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে সেই পথে যাওয়ার কথাই প্রথমে মাথায় এসেছিল সুমারও৷ সেই দিকেই ধাপে ধাপে এগোতেও থাকে সে৷ লন্ডনে ক্রেডিট সুইস ইনভেস্ট ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপও করে সুমা৷ সেখানে কাজ করতে করতেই এই ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি সম্পর্কে জেনে যায় সে৷ এর মধ্যেই, কলকাতা থেকে বাবার অসুস্থতার খবর পায় সুমা৷ সন্তান হিসেবে নিজের দায়িত্ব কখনও ভুলবে না৷ ছেলেবেলায় মা-এর এই কথা মনে পড়তেই কলকাতায় ছুটে যান তিনি৷ প্রায় দু’মাস অসুস্থ বাবার সঙ্গে কাটান৷ সেই সময়ই, চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলন৷ কিন্তু, আকর্ষণীয় বেতন ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে চাকরি ছাড়তে দু’বার ভাবতে হয়েছিল তাঁকে৷ কিন্তু, এর পর সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন তিনি৷ সিদ্ধান্ত নিলেও ওই সংস্থা ছেড়ে আসতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যায় তাঁর৷ ২০০৯ সালে ফের অসুস্থ বাবার কাছে যান সুমা৷ সেই সময়, তাঁর বাবার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে৷ কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তিনি৷


এতদিন কাজ ছাড়া থাকতে থাকতে কিছুটা হলেও হাঁফিয়ে পড়েছিলেন সুমা৷ তাই কলকাতাতেই কোনও একটা কাজের জোগাড় করার চেষ্টা করেন ‘কাজের মানুষ’ সুমা৷ কিন্তু, কলকাতার কর্মসংস্কৃতি না-পসন্দ হওয়ায় অর্থ উপার্জনের জন্য মুম্বইয়ে পাড়ি দেন তিনি৷যুক্ত হন গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে৷ কিছু প্রোজেক্টে কাজও করেন তিনি৷ ছবি ও বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় হাতে খড়ি হয় তাঁর৷ সেখানে সলমন খানের সঙ্গে কয়েকটি বিজ্ঞাপনেও কাজ করে ফেলেন সুমা৷ আর এরই মাঝে মৃত্যু হয় তাঁর বাবার৷কিন্তু, সেই খবরও সময়মতো পাননি তিনি৷ তাঁর কথায়, ‘বাবার কিছু আত্মীয় তাঁর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করলেও ভারতে থাকা সত্ত্বেও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি৷’ তাঁর স্বপ্নের শহর না হলেও কাজের সন্ধানে পাকাপাকিভাবে মুম্বইতেই চলে যান তিনি৷ প্রথম প্রথম সেখানে নানা সমস্যার মধ্যেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে৷ রাস্তাঘাটে শিকার হতে হয়েছিল হেনস্থারও৷ এরই মাঝে তাঁর সঙ্গে থাকার জন্য লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে আসেন সুমার মা-ও৷ ২০১১ সাল নাগাদ তেলেগু এবং তামিল ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব পেতে শুরু করেন তিনি৷ আঞ্চলিক ছবিগুলিতে অভিনেত্রী থেকে বাছাই থেকে একাধিক ক্ষেত্রে পুরুষ অভিনেতাদের বক্তব্যই শেষ কথা ছিল বলে লক্ষ্য করেন তিনি৷ যা মোটেও মেনে নিতে পারেননি সুমা৷ শুধু পার্শ্বচরিত্র হিসেবে চিরজীবন কাজ করে যাওয়াটা তাঁর পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না৷এর পরই, নতুন করে পথচলা শুরু হয় তাঁর৷ ঘটনাচক্রে ফের পুরনো পেশাতেই ফিরে আসেন তিনি৷কিন্তু, প্রতিষ্ঠিত কোনও সংস্থায় নয়৷সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকলেও পিছিয়ে আসেননি সুমা৷ তাঁর কথায়, ‘২০১২ সালে যখন ক্যুইক ওয়ালেট তৈরির চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছিল, তখন তাঁদের হাতে কোনও অর্থ ছিল না৷’ কিন্তু, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলায়৷ এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হয়ে ওঠেন সুমা৷ সফলভাবে এগিয়ে চলে তাঁর সংস্থাও৷কিন্তু, লাভ-ক্ষতির অঙ্কের হিসেব কষে বেশিরভাগ সময় কাটলেও সংস্কৃতি তাঁকে বরাবরই আকর্ষণ করে৷ তাই, তা থেকেও দূরে থাকতে পারেননি তিনি৷বর্তমানে ড্যান্স প্রোডাকশন কোম্পানি খোলারও চেষ্টা করছেন তিনি৷ ব্যস্ততার মাঝেও কোরিওগ্রাফির কর্মশালাতেও যোগ দিয়েছেন৷

তিনি এখন সফল, পূরণ হয়েছে তাঁর বহু ইচ্ছে, স্বপ্নও৷ কিন্তু, ফেলে আসা জীবনের কিছু অধ্যায় দুঃস্বপ্নের মতো এখনও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায় বছর তিরিশের সুমাকে৷ আর তাঁর মধ্যেই লড়াইয়ের রসদ খুঁজে নেন তিনি৷

Related Stories