মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন

0

নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে দিদির জয়জয়কার। ক্ষমতায় ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সবুজ আবীরে কালীঘাটের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুভেচ্ছার প্লাবন আছড়ে পড়ছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসস্থান, হরিষ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের সেই বিখ্যাত একতলার টালির ঘরে। ছোট্ট ঘরে এখন ফুলের পাহাড়। মানুষের ভিড়। হবে নাই বা কেন, তিনি যে জীবন্ত অনুপ্রেরণা। কোটি কোটি মানুষের রোল মডেল। তাঁকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই।

১৯৫৫ সালে জন্ম। জন্মেছেন গরিব ঘরে। বিনা চিকিৎসায় বাবাকে মরতে দেখেছেন। তখন তার সতের। বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। প্রমীলেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। এক ডাকে লোকে চিনত। সম্মান ছিল। কিন্তু অর্থ ছিল না। ফলে ছোটবেলা থেকেই অভাবের মুখ দেখে ঘুম ভাঙত মমতার। লড়াইয়ের রাস্তাটা চিনে নিয়েছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পরে সেই রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াত করতে করতে লড়াইয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারার প্রতিনিধি হিসেবে আশৈশব লড়েছেন বেঁচে থাকার লড়াই। পড়াশুনো চালিয়ে যাওয়ার লড়াই। অন্যায়ের মুখে জবাব দেওয়ার লড়াই। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করেছেন। বাম বিরোধী রাজনীতি। তথাকথিত স্বর্বহারার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ হিসেবে দাঁড়িয়েছন মমতা। ১৯৭০ এর দশকে তিনি যখন রাজনীতি শুরু করেন তখন ইন্দিরা গান্ধী মধ্যগগণে। গোটা দেশের আকাশ জুড়ে আছেন। দিল্লির মসনদ নিয়ে তখন টাল মাটাল অবস্থা। রাজ্যেও স্থিতাবস্থা নেই। একদিকে নকশাল আন্দোলন। অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রেখে তোলপাড় বাংলার যৌবন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই উত্তাল সময়ের ফসল। অত্যন্ত অল্প বয়সে কংগ্রেস (আই) দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্মজীবনের হাতে খড়ি। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্থানীয় কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৭৬ সাল। বয়স তখন একুশ। টানা চার বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করে ফেলেছেন মমতা। সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হতে শুরু করে দিয়েছেন।

কিন্তু সবাইকে চমকে দিলেন ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হলেন ২৯ বছরের এই মেয়ে। সেই সময় তিনিই ছিলেন দেশের সর্বকনিষ্ঠ সাংসদের অন্যতম। রাজীব গান্ধীর স্নেনধন্যা ছিলেন মমতা। এই সময় তিনি সারা ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকও মনোনীত হন। ১৯৮৯ সালের কংগ্রেস-বিরোধী হাওয়ায় তিনি অবশ্য তাঁর কেন্দ্রে পরাজিত হন। কিন্তু ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনেই কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্র থেকে পুনরায় মানুষের ভোটে জিতে সংসদে ফিরে আসেন। ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও মন্ত্রিসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মানব সম্পদ উন্নয়ন, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে খেলাধুলার প্রতি সরকারি উদাসীনতার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। ১৯৯৩ সালে তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়।

চিরকালই মমতা মানে প্রতিবাদী মুখ। মমতা মানে মানুষের পক্ষে। মমতা মানে সরলতার সৌন্দর্যে উজ্জ্বল। পায়ে হাওয়াই চটি, পরনে সাদা তাঁত, নীল পাড়। কোনও আড়ম্বর নেই। মানুষ মমতাকে চেনেন অন্যায়ের সঙ্গে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে।

১৯৯৩ সাল। এই বছরই ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযান চলাকালীন পুলিশের গুলিতে মারা যান ১৯ জন তরতাজা যুব কংগ্রেস কর্মী। প্রতিবাদী জনতার ওপরে অকথ্য লাঠি চালায় পুলিশ। গুরুতর জখম হন মমতাও। এরপর থেকে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ান অগ্নিকন্যা। অগ্নিকন্যা এই নাম তখন মমতার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। একা একটি মহিলা। আর তার সামনে পাহাড় প্রমাণ একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। অসম এই লড়াই ক্রমাগত সততার সঙ্গে লড়ে গিয়েছেন তিনি। যেখানে যখনই শুনেছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক আক্রমণের খবর, ছুটে গিয়েছেন মমতা। আহত আক্রান্তদের পাশে থেকেছেন। ক্রমান্বয়ে তিনিই উঠে এসেছেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ছাপিয়ে। আর এভাবেই বিরোধের সূত্রপাত।

১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি তাঁর দলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-কে সহায়তা করার অভিযোগ আনেন। নিজেকে দলের একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ বলে উল্লেখ করে তিনি এক "পরিচ্ছন্ন কংগ্রেস"-এর দাবি জানান। কলকাতার আলিপুরে একটি জনসভায় গলায় শাল পেঁচিয়ে আত্মহত্যারও হুমকি দেন। ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে পেট্রোলিয়ামের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে লোকসভার ওয়েলে বসে পড়েন। এই সময়ই সমাজবাদী পার্টি সাংসদ অমর সিংহের জামার কলার ধরে তাঁর সঙ্গে হাতাহাতিতেও জড়িয়ে পড়েন মমতা। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লোকসভায় রেল বাজেট পেশের সময় পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদ তুলে রেল বাজেট পেশ চলাকালীনই তদানীন্তন রেলমন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ানের দিকে নিজের শাল ছুঁড়ে দেন। পরে তিনি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফাও দেন। কিন্তু লোকসভার তদানীন্তন অধ্যক্ষ পি. এ. সাংমা তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেন। পরে সন্তোষমোহন দেবের মধ্যস্থতায় তিনি ফিরে আসেন।

১৯৯৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন। আর তাঁর পর থেকেই রাজ্যে নতুন করে ক্ষমতার মেরুকরণ হয়। একদিকে দীর্ঘকালের শাসক দল বামফ্রন্ট আর অন্যদিকে রাজ্যের প্রধান বিরোধীশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তৃণমূল কংগ্রেস।

তারপরের ইতিহাস বয়েছে অন্য খাতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম বাম-জমানা। মমতার রাজনৈতিক উত্থান পতনের গ্রাফটা সুদীর্ঘ। ১৯৯৭ থেকে ২০১১ এই চোদ্দ বছরের লড়াইয়ের লম্বা ফিরিস্তিতে যাচ্ছি না। কিন্তু দুটি জিনিস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চোদ্দ বছরের প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে তিনি বাংলার ভালো চান। তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও অস্ফুটে মমতার বেঙ্গল প্যাকেজের প্রশংসা করেছিলেন।

নিজের রাজনৈতিক লড়াই টিকিয়ে রাখতে প্রাণ পণ করেছিলেন মমতা। এমন একটা সময় ছিল সংসদে যখন একমাত্র তিনি একা দলের সাংসদ। তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করছেন তাঁর কাছের মানুষ জন। নির্বাচনে খারাপ ভাবে হেরেছে তাঁর দল। আবার যখন ক্ষমতা বেড়েছে, জনসমর্থন পাচ্ছেন, আন্দোলন তুঙ্গে, তখন তিনি দেখেছেন তাঁর পাশে তৈরি হচ্ছে সুবিধেবাদীদের বলয়। কখনওই তিনি বিচলিত হননি। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা দিয়ে ষড়যন্ত্র কেটেছেন। নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে রাজ্যের মসনদ থেকে ৩৪ বছরের বাম শাসনকে সরিয়েছেন। রাজ্যে শিল্প বান্ধব পরিবেশ ব্যহত হয়েছে অভিযোগ উঠেছে। তখনও তিনি অবিচল। শিল্পের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করে উদ্যোগপতিদের ভরসা অর্জন করতে পেরেছেন। মুকেশ আম্বানি থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের বিভিন্ন শিল্পপতির, বণিকসভার সার্টিফিকেট পেয়েছেন। উদ্যোগপতি মোহনদাস পাইয়ের নেতৃত্বে স্টার্টআপ সংস্থাগুলোকে আরও সুযোগ সুবিধে দেওয়ার রোড ম্যাপ তৈরি করে প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি আদতে বাংলার ভালো চান।