হাতিদের জন্য পিয়ানো বাজান পল

0

জঙ্গলের ভিতর থেকে টুং টাং শব্দ ভেসে আসছে। বেজে উঠছে পিয়ানোর সুর। বিষাদ জড়ানো সেই সুর যেন কান্না ভেজা গলায় বলতে চাইছে, মার্জনা করো...। বন্য প্রাণের ওপর মানুষের করা বর্বরতার জন্যে মার্জনা চাইছেন এক সুরকার। তাঁর সুর দিয়ে। প্রতিবন্ধী হাতিদের ক্ষতে প্রলেপ দিচ্ছে পলের পিয়ানো।

পঞ্চাশোর্দ্ধ পল বার্টনের হাতের জাদুতেই পলকে মুখের চেহারা বদলে যাচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হস্তীকুলের। হ্যাঁ, হাতি। মানুষের নৃশংসতার প্রমাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাতিগুলির কেউ অন্ধ, কারও বা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন দগদগে।

থাইল্যান্ডের সেগুন কাঠ পৃথিবী বিখ্যাত। এই সেগুন কাঠের ব্যবসা করতে গিয়ে উনবিংশ শতকে এই দেশের জঙ্গলের আধিক্য কমে দাঁড়িয়েছে ৬১ শতাংশ থেকে ৩৪ শতাংশে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে যে পরিসংখ্যান পাওয়া গিয়েছে, তা আরও মারাত্মক। থাইল্যান্ডে বর্তমানে যে জঙ্গল পড়ে রয়েছে তার মধ্যে ২৮ শতাংশই নিঃশেষিত। আর এই নির্বিকার জঙ্গলচ্ছেদনে সব দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই হাতিরাই। জঙ্গল কাটার ফলে তারা নিজেদের বাসস্থান হারিয়েছে। আবার তাদেরকে দিয়েই জঙ্গলের কাঠ বয়ে নিয়ে যেতে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাঠ বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ই কাঠের খোঁচা খেয়ে এদের কেউ অন্ধ হয়ে গিয়েছে, আবার কারও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে। কাজ করতে অসমর্থ এই সব হাতিদের অব্যবহৃত জিনিসপত্রের মতো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এই সব হাতিদের বাঁচাবার জন্য পল বার্টন তৈরি করেছেন ‘এলিফান্ট’স’ ওয়ার্ল্ড’। যা সম্পূর্ণভাবে চালিত হয় অর্থসাহায্যের মাধ্যমে। ১৯৯৬ সালে থাইল্যান্ডে আসেন লন্ডনের বিখ্যাত পিয়ানোবাদক পল বার্টন। সেদিন তিনি এসেছিলেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। এখানে এসে তিনি খুঁজে পান তাঁর জীবনসঙ্গিনীকে। তারপর থেকে গত দু’দশক ধরে এই সব হাতিদের পুনর্বাসনেরই চেষ্টা করছেন বার্টন। নিজের পঞ্চাশতম জন্মতিথিতে তাঁর মাথায় এল এক অভূতপূর্ব পন্থা। নিজের পিয়ানোটিকে টানতে টানতে নিয়ে এলেন পর্বতের সেই জায়গায়, যেখানে হাতিরা একত্রিত হয়। তারপর বাজাতে শুরু করলেন পিয়ানোটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে ঘিরে ধরল একদল হাতি। অন্ধ তাঁরা, শরীরে ক্ষতের দাগ স্পষ্ট। সেই পিয়ানোর সুরে বদলে যেতে লাগল তাঁদের মুখের চেহারা।

এই পল বার্টনের মুখোমুখি ইয়োরস্টোরি

সুরের সঙ্গে সম্পর্ক কবে থেকে?

তখন আমার বারো বছর বয়স। বাবার কাছেই আমার হাতেখড়ি। ব্রিটেনের উত্তরে একটি ছোট শহরে সমুদ্রের ধারে বসে চলত আমাদের সাধনা। আমি ছবি আঁকতেও ভালবাসি। সেটাও আমার বাবাই আমাকে শিখিয়েছে। ১৬ বছর বয়সে আমি লন্ডনের ‘রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ আর্টসে’ ভর্তি হলাম।

হঠাৎ থাইল্যান্ডে এলেন কেন? আর হাতিদের সঙ্গে এই কথোপকথন, কী ভাবে সম্ভব হল?

১৯৯৬ সালে আমি ‘থাই পিয়ানো স্কুলে’ পড়ানোর সুযোগ পাই। তিন মাস এখানে থেকে এশিয়াকে আর কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমি হারাতে চাইনি। সেই সময় আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। ১৮ বছর হয়ে গেল আমাদের বিবাহিত জীবনের। ওঁর পশুদের সঙ্গে কথোপকথনের, কিংবা যোগাযোগের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। ওঁর কাছ থেকেই এই ব্যাপারে আমি প্রেরণা পেয়েছি।

অন্ধ হাতিরা যে সুর পছন্দ করে, এই ধারণা হল কী ভাবে?

কিছুদিন আগে সরকার থেকে গাছ কাটা বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে। এর ফলে হাতি এবং মাহুত দুজনেই বেকার হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি অসুবিধে হয়েছে প্রতিবন্ধী হাতিগুলির। হাতিদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেছে। কাঞ্চাবুরিতে কোয়াই নদীর ধারে গড়ে ওঠা এই ‘এলিফান্ট’স’ ওয়ার্ল্ড’ তার মধ্যে একটি। প্লারা হচ্ছে এমনই এক অন্ধ হাতি। যাকে এক সময় ব্যবহার করা হয়েছিল তারই বাসস্থান ধ্বংস করতে। সেই সময় গাছের ডাল তার চোখে ঢুকে যায়। অন্ধ হওয়ার প্লারার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। আমি এর আগে দুবছর অন্ধ শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। তখন দেখেছি সুরের প্রতি রয়েছে তাদের আশ্চর্য এক মাদকতা। হাতিরা এমনিতেই খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। হাতিদের ওপরও সুরের এই পরীক্ষা করে আমি একটা চেষ্টা করেছিলাম মাত্র। আর সাফল্যও পেয়েছি।

কী দেখলেন?

হাতিদের খাবারের অভ্যাস অনেকটা কুকুরদের মত। একবার খেতে শুরু করলে কিছুতেই তাদেরকে খাবারের জায়গা থেকে সরানো যায় না। তাদের ধারণা খাবার একবার ছাড়লে, তা হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। এরকমই এক সকালে প্লারা নিজের মনে খাচ্ছিল। আমি পিয়ানোটা নিয়ে তার সামনে বসে বাজাতে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি প্লারা খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে মুখ ঘুরিয়েছে। সেই সময় তার মুখের সেই অভিব্যক্তি ভোলার নয়।

তারপর থেকে বছরের পর বছর আপনি হাতিদের জন্য পিয়ানো বাজাচ্ছেন। শ্রোতা হিসেবে একজন মানুষ এবং একজন হাতির মধ্যে কী পার্থক্য?

প্রত্যেক প্রাণী সুর ভালবাসে। কুকুর, বেড়াল, সকলে। কিন্তু হাতিদের সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠতা দেখার মত। মস্তিষ্কে মানুষের যে নিউরন থাকে, তার সঙ্গে হাতির মস্তিষ্কের নিউরনের মিল পাওয়া যায়। হাতিদের স্মৃতিশক্তিও মারাত্মক। একটা বাচ্চাকে যদি ছোটবেলায় খুব অত্যাচার করা হয়, সেটা সে সারা জীবন মনে রাখবে। হাতিদের ক্ষেত্রেও তাই। ওদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা ওরা সারা জীবনেও ভুলতে পারে না। ক্ল্যাসিকাল মিউজিক যেমন মানুষ শুনতে ভালবাসে, তেমনি যে হাতি কোনওদিন গান শোনেনি, তার সামনে বাজানো যায়, তখন তার মুখের যে অভিব্যক্তি হয়, তা এককথায় মূল্যহীন। পিয়ানোর এই সুর আমাদের দুজনের মধ্যে এমন এক ভাষার অবতারনা করে, যার বর্ণনা করা যায় না। সেই ভাষা আমার না, তারো না। অথচ সেই ভাষার যাদুতে এই অবলা জীবটি মুখের অভিব্যক্তি বদলে যেতে থাকে।

কখনও কখনও তো পিয়ানো শোনানোর জন্য আপনাকে পিয়ানো নিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠতে হয়, বয়েস হয়েছে আপনার, সঙ্গে পিঠের ব্যথা, তাও এই কষ্টকর কাজ কেন করেন?

আমাদের জন্য এই হাতিগুলো কী না করেছে বলুন তো? একসময় যুদ্ধ করেছে, আমাদের ব্যবসায়িক চাহিদার জন্য নিজেরাই নিজেদের বাসস্থান ভেঙে ফেলেছে, আমি আর কী করতে পারছি ওদের জন্য? শুধু ওদের প্রাতরাশের সময় পিয়ানোটা বয়ে নিয়ে গিয়ে বাজাই। ক্ষমা চাই ওদের কাছে।