স্কুলছুট যে মানুষটির উদ্ভাবন বড়সড় বদল এনেছে কৃষিব্যবস্থায়

0

রাজস্থানের শিকার এর বাসিন্দা মদনলাল কুমাওয়াত স্থানীয় কৃষক ও নিজের অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে একটি অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। এবং পরিচিতির কারণ হল তৃণমূল স্তরের এই উদ্ভাবকের তৈরি করা জ্বালানি সাশ্রয়ী একটি মাল্টি ক্রপ থ্রেশার, যা সাহায্য করেছে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটাতে। ২০১০ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে অন্যতম প্রভাবশালী ‘গ্রামীণ উদ্যোগপতি’র স্বীকৃতি দেয়। তবে স্বীকৃতি অনেক এলেও, সাহায্য কিন্তু বলতে গেলে তিনি সেভাবে প্রায় কিছুই পাননি।


মদনলালের পিতা পেশায় ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রি। তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। ১১ বছর বয়সে ১১ কিলোভোল্টের বৈদ্যুতিক তারে তিনি তড়িতাহত হন। এই ঘটনার পর ১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে তাঁর চিকিৎসা চলে। আর্থিক অনটন ও পাশাপাশি শারীরিক অসুবিধার কারণে চতুর্থ শ্রেণি শেষ করার পর তিনি স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন।

এরপর তিনি বাবার কাজে সাহায্য করতে শুরু করেন এবং রপ্ত করে ফেলেন জিনিস তৈরির প্রাথমিক কলাকৌশল । কিন্তু পাঁচবছর মত কাঠের কাজ করার পর তিনি বুঝতে পারেন যে এই কাজ তাঁর শরীরের ক্ষতি করছে। কারণ কাজের প্রয়োজনে বেশিরভাগ সময়েই তাঁকে ভারি জিনিস তুলতে হত, কষ্টকর ভঙ্গিতে বসে থাকতে হত, এবং সারাক্ষণই কাজ করতে হত কাঠের গুঁড়োর মাঝে। তাই তিনি কাঠের কাজ ছেড়ে নিজের পছন্দের কোনো কাজে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন।


এরপর শুরু করলেন একটি ওয়ার্কশপে কাজ করা। এখানে তিনি ট্রাকটর বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় লোহা ও অন্যান্য ধাতুর কাজ করার তালিম পেলেন। স্থানীয় কৃষকদের জীবনে এই কাজের একটা সরাসরি প্রভাব থাকায়, এই কাজ ওনার বেশ পছন্দ ছিল। কিন্তু একবার কাজ শিখে যাওয়ার পর, প্রত্যহ একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি করাটা তাঁর কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ওয়ার্কশপে মূলত সারাইয়ের কাজ হয় । নতুন কোনোকিছুর উদ্ভাবন এখানে প্রায় হয়ই না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে আর নয়, এবার নিজের উদ্যোগে কিছু গড়ে তুলবেন।

উনি একটা ‘থ্রেশার’ বানাবেন ঠিক করলেন। ডালপালা, বোঁটা ও ভূষি থেকে শস্যদানাকে পৃথক করার কাজে ব্যবহৃত হয় এই যন্ত্র। প্রথম মডেলটা তৈরি করতে বেশ অনেক মাস সময় লেগেছিল এবং ওনার তৈরি করা থ্রেশারটি বাজারে চালু আর পাঁচটা থ্রেশারের মত একইরকম কর্মক্ষম ছিল। কিন্তু নিজের কাজে উনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বরং ক্রমশই ওনার এই উপলব্ধি হচ্ছিল যে, এই যন্ত্রটাকে বিভিন্নভাবে আরো উন্নত করে তোলা যেতে পারে।

একাধিক শস্য পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাজারে চালু থ্রেশারগুলি বেশ অসুবিধাজনক ছিল। কারণ এগুলিতে শস্যের পৃথক পৃথক ধরন অনুযায়ী যন্ত্রের মধ্যের ‘ফিটিং’ বদলাতে দুই ঘন্টারও বেশি সময় লেগে যেত। সহজে বের করে নেওয়া যায়, এরকম অনেকগুলি ভিন্ন ভিন আকারের জালি বসিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের থ্রেশারের মডেলকে আরো উন্নত করে তুললেন। এর ফলে যেটা হল যে, এখন শস্য অনুসারে ‘ফিটিং’ পাল্টানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় দুইঘন্টার বদলে নেমে এসে দাঁড়াল মাত্র ১৫ মিনিটে।

থ্রেশারের মধ্যে উনি একটি ব্লোয়ারও লাগালেন। বাতাসের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য যোগ করলেন গিয়ার ও পুলি ব্যবস্থা । এর ফলে বিবিধ ধরনের, বিবিধ আকারের ও বিবিধ ঘনত্বের শস্য নিয়ে কাজ করাটা সহজ হয়ে উঠল। এবং রোটেটিং ড্রাম এর ব্যাস কমিয়ে ফেলায় ঘন্টাপ্রতি এক লিটার করে ডিজেলের সাশ্রয়ও সম্ভব হয়ে উঠল।

মদনলালের তৈরি করা এই থ্রেশার থেকে কৃষকরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছিলেন। নিজের জন্য খুব সামান্য লভ্যাঙ্ক রেখে তিনি ন্যায্যমূল্যে নিজের উদ্ভাবিত যন্ত্র বিক্রয় করতেন। “আগে নিজেদের শস্য পরিষ্কার করতে হলে উপযুক্ত বাতাসের জন্য কৃষকদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করে থাকতে হত। আর তাছাড়া, বেশিরভাগটাই ছিল ‘ম্যানুয়াল প্রসেস’। কিন্তু আমার থ্রেশার এইসব সমস্যা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। এখন যন্ত্রে প্রক্রিয়াকরণ হওয়া শস্যদানা আগের থেকে অনেক বেশি পরিষ্কার হয়,” বললেন মদনলাল।

খুব দুঃখের সাথে তিনি বললেন যে, আহমেদাবাদ ন্যাশনাল ইনোভেশান ফাউন্ডেশানে নিজের এই উদ্ভাবন নথিভুক্ত করার জন্য কতটা চেষ্টা করতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু অবশেষে যখন নথিভুক্ত করার সুযোগ এল, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। কারণ ইতিমধ্যেই বড় বড় কম্পানিগুলি তাঁর ডিজাইন ব্যবহার করতে শুরু করে দিয়েছিল এবং প্রচুর লাভও করছিল সেখান থেকে। মদনলাল এর মতে, বাজারে আজকাল যত থ্রেশার পাওয়া যায়, তার মধ্যে অধিকাংশই তাঁর উদ্ভাবিত মডেলের অনুকরণে তৈরি করা।

মদনলালের নিজের ব্যবসা ক্রমেই বাড়ছে। “একদম প্রথমদিকে এটার বিক্রয়মুল্য ছিল এক লাখ টাকা। বর্তমানে এটার দাম হল তিনলাখ, এবং প্রযুক্তিগতভাবেও এটা এখন আরো অনেক বেশি উন্নত,” জানালেন মদনলাল। এইমুহুর্তে ওনার দুটি ওয়ার্কশপ রয়েছে – একটি শিকারে, যেটি তিনি নিজে চালান, এবং অপরটি যোধপুরে, যেটা চালাচ্ছেন ওনার ছোটো ভাই।

বর্তমানে মদনলালের তৈরি করা থ্রেশারের চারটে মডেল পাওয়া যায়। ছোটো কৃষক থেকে শুরু করে বৃহৎ চাষী, সমস্ত অংশের প্রয়োজনিয়তাকে মাথায় রেখে ভিন্ন আকার, ভিন্ন পরিমান জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা ও ভিন্ন কর্মক্ষমতা সম্পন্ন আলাদা আলাদা এই মডেলগুলি তৈরি করা হয়েছে।


লেখক - সৌরভ রায়

অনুবাদ - সন্মিত চ্যাটার্জী