আভিমান থেকে পেশা, মূর্তিই প্রেরণা ভাগীরথের

0

নিচু জাতের ছেলে বলে তাঁর বানানো সরস্বতীর পুজো হয়নি স্কুলে। ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রতিমা। রাগে সেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে দিতে চেয়ছিলেন। মা বাধা দেন। বলেছিলেন, ‘স্কুলে পুজো হয়নি তো কী হয়েছে? আমরা বাড়িতে পুজো করব’। তারপর সেই প্রতিমা বাড়িতে এনে পুজো হয়। সে দিনের ছোট ছেলেটির সেই অভিমান থেকে জেদ চেপে যায়। ঠিক করে নেয়, ‘এমন প্রতিমা গড়বো কেউ ফেরাতে পারবে না’। শুরু হল তালিম নেওয়া। সেই দিনের সেই ছেলে আজ সফল প্রতিমা শিল্পী ভাগীরথ সরকার।

কাদা মাটি দিয়ে মূর্তি গড়ার নেশা ভাগীরথের মাথায় চেপে বসেছিল সেই ছোট্টবেলা থেকে। অন্য বন্ধুরা যখন মাঠে খেলে বেড়াত, ভাগীরথ তখন নদীর পাড়ে মাটি দিয়ে মূর্তি গড়তে ব্যস্ত। মূর্তি গড়ে কাউকে দেখাতো না। ছুড়ে ফেলে দিত নদীতে। এইরকম করতে করতে এক সরস্বতী পুজোয় দেবীর মূর্তি গড়ে স্কুলে গিয়ে হাজির। সেই মূর্তিতে অবশ্য পুজো হয়নি। সেই ফিরিয়ে দেওয়াই মনে দাগ কেটেছিল। গুরু কালিপদ মণ্ডলের কাছে প্রতিমা তৈরির তালিম নিতে শুরু করে। চেষ্টা বৃথা যায়নি। বনগাঁর কাছে গোবরাপুরে ভাগীরথের এখন প্রতিমা তৈরির বিশাল স্টুডিও। সেদিন যারা প্রতিমা নিতে চায়নি আজ তারাই ছুটে আসে সবার আগে ভাগীরথের স্টুডিওয়।

কেমন লাগে এখন? উত্তরে খানিক হেসে ভাগীরথ বলেন, ‘এতো পরম পাওয়া। আমার খুব দুখ হয়েছিল জানেন। তারপর ভাবলাম এমন ঠাকুর গড়ব সবাই আসবে। এখন আমার দেওয়া প্রতিমায় পুজো হয় স্কুলে স্কুলে গ্রামে গ্রামে। ভীষণ ভালো লাগে’। ভাগীরথের বানানো দুর্গার চাহিদা শুধু এলাকায় নয়। রাজ্যের বাইরে, এমনকী বাংলাদেশেও। এবার পুজোয় বারোটি প্রতিমা গড়েছেন ভাগীরথ। প্রতিমা যেমন গড়েন, গড়া শেখানও অন্যদের। শুধু দুর্গা, সরস্বতী নয়, ভাগীরথের স্টুডিওয় তৈরি হয় হরেক মূর্তি। বনগাঁর স্টুডিও থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা রাজ্যে এমনকী রাজ্যের বাইরেও।

সাধ করে প্রতিমা গড়লেও ডেলিভারির সময়খুঁজে পাওয়া যায় না ভাগীরথকে। ‌যখন বুঝতে পারেন পুজো আয়োজকরা এসেছেন প্রতিমা নিতে, তখন মন খারাপ হয়ে যায় শিল্পীর। কারণটা জানা গেল তাঁরই মুখে। ‘মেয়ে বিয়ের পর বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় যেমন কষ্ট হয়, আমারও তেমন কষ্ট হয়। আমি ওসব দেখতে পারি না। ভাবি এতদিন যত্ন করে গড়লাম।গায়ে একটু ধুলো জমতে দিলাম না। আর ওরা কেমন টেনে হিঁচড়ে প্রতিমা গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। সব প্রতিমা চলে যাওয়ার পর ফাঁকা স্টুডিও দেখে বুক খাঁখাঁ করে। আমিতো বিসর্জনও দেখি না’।

তবু রোজগারের পথ হিসেবে প্রতিমা তৈরিকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। শিল্পীর মন যেমন ভরে পেটও ভরে। ৬ জন সরকারি আছে তাঁর। স্টুডিওটাকে আরও বাড়ানোর ইচ্ছে আছে। আরও বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন বনগাঁর এই শিল্পী।