লজিস্টিকে ভারতকে জুড়তে চায় কানেক্টিং ইন্ডিয়া

0

লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্টে তিন দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। Connect India-র এল আর শ্রীধর এই ইন্ডাস্ট্রিতে তাই বর্ষীয়ান ও সম্মানীয় একটি নাম। ১৯৮১ সালে Express Logistics-এর হয়ে তাঁর কেরিয়ার শুরু করেন শ্রীধর। জিনিসপত্র পরিবহণের ডিজাইন ও রূপায়ন ছিল কাজের প্রথম ধাপ। পরবর্তী সময়ে SKYPAK, Overnight Express, Corporate Couriers-এর মতো সংস্থার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেও বড় ভূমিকা নেন তিনি। ২০০৬ সালে Sical Distriparks Limited কোম্পানির গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। Sical Group-এর অধীনস্থ সংস্থাগুলির বোর্ড অব ডিরেক্টরসেও ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে Sical Logistics অধিগ্রহণ করে নেয় Café Coffee Day. তখন নিজস্ব পরামর্শদাতা ও নিয়োগ কোম্পানি গঠনের সিদ্ধান্ত নেন শ্রীধর। লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেন ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর সেই সিদ্ধান্ত সময়ের প্রেক্ষিতে একেবারে সঠিক ছিল।

এর ঠিক বছর খানেকের মধ্যেই ২০১৩ সালে ভারতে ই-কমার্সের ধুম লেগে গেল। ব্যবসার বহুল সম্ভাবনা নিয়ে Last Mile Delivery (LMD)-রও সেই শুরু। এলএমডি ক্ষেত্রে যে ফাঁক রয়েছে তা পূরণ করতে শ্রীধর চালু করলেন তাঁর সংস্থা Connect India. বর্তমানে ই-কমার্স ও কর্পোরেট হাউসে জিনিসপত্র আদানপ্রদানে খুবই পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে তাঁর এই এলএমডি প্ল্যাটফর্ম। গ্রাম-গ্রামান্তরের সঙ্গেও (যেখানে বড়জোর হাজার পাঁচ লোকের বসবাস) বাকি ভারতের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে কানেক্ট ইন্ডিয়া। আর ভারতের সঙ্গে বাকি দুনিয়ার। শ্রীধর বললেন,"মোদী সরকার কানেক্টিং ইন্ডিয়ার কথা বলছিল। আমি ভাবলাম এটাই সঠিক সময়। একটা লাস্ট মাইল ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারলে একদিকে যেমন গ্রামীণ বাসিন্দাদের সুবিধা হবে, অন্যদিকে তাদের কর্মসংস্থানও হবে।"

ভারতে ছড়িয়ে পড়া

ছড়িয়ে পড়তে হবে ভারতের ৬৭৫টি গ্রাম আর ২৫ হাজার পিন কোড এলাকায়। এমনই স্বপ্ন দেখে কানেক্টিং ইন্ডিয়া। এজন্য গড়ে তোলা হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোগপতিদের নিয়ে ডেলিভারি নেটওয়ার্ক। যার ফলে তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এমন অনেককে নিয়োগ করা হয়েছে যারা ২০০ থেকে ৩০০টি গ্রামে পরিষেবা দিতে পারবেন। এলএমডি ইউনিট হিসাবে কাজ করার জন্য টাই-আপ গড়ে তোলা হয়েছে common service centres (CSC)-র সঙ্গে। বর্তমানে এই টাই-আপের সংখ্যা ৬০০ হলেও চলতি আর্থিক বছরের মধ্যে তা ১০ হাজারে নিয়ে যেতে চায় সংস্থা।

"দেশের শহর ও গ্রামগুলির মধ্যে লজিস্টিক পাইপলাইন গড়ে তোলা, এটাই আমার আইডিয়া", বললেন শ্রীধর। গ্রামীণ ভারতে কানেক্টিং ইন্ডিয়ার ডেলিভারি মডেলের কথা জানাতে গিয়ে শ্রীধর বললেন," গ্রামীণ এলাকায় একটি সেন্ট্রাল লোকেশন থেকে আমাদের ডেলিভারি ভ্যান বিভিন্ন জায়গায় পাঠান হয়। একটি পিন কোড এলাকার মধ্যে আমরা একটা Connect India Centre (CIC) রেখেছি। যা ৩০-৪০ টা শিপমেন্ট করে থাকে।" আর মেট্রো শহরগুলিতে CIC এক থেকে দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কাজ করে। গত চার মাসে এমন ২০০০টি CIC খুলেছে সংস্থা। যাঁরা ওই CIC চালান তারা আমাদের আয়ের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পান।"


কর্মসংস্থানের সুযোগ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন

ভারতে বর্তমানে দোকান, বাজার, ঘরোয়া ব্যবসার সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এইসব বিক্রেতাদের জিনিসপত্র দেশীয় ও বিদেশের বাজারে পৌঁছে দিতে ই-কমার্সের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে কানেক্টিং ইন্ডিয়ার সেন্টারগুলি (CIC)। শুধু বিক্রেতা নয়, লাভবান হচ্ছেন ডেলিভারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। তারাও মোটামুটি ৩৫-৪০ শতাংশ মার্জিন পাচ্ছেন।

কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতে ও কম্পিউটারে সড়গড় করতেও তৎপর কানেক্টিং ইন্ডিয়া। এজন্য গ্রামীণ এলাকার সেন্টারগুলির জন্য প্রশিক্ষক রাখা হয়েছে। প্রত্যেকটি জেলায়, যেখানেই কানেক্টিং ইন্ডিয়া কাজ করে থাকে, সেখানেই একটি করে ৫০০ স্কোয়ার ফুটের স্কিল সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষ লজিস্টিক ওয়ার্কফোর্স গড়ে তুলতেই তাঁদের এই পদক্ষেপ বলে জানালেন শ্রীধর।

বিজনেস মডেল

কানেক্টিং ইন্ডিয়া এমন একটা বিজনেস মডেল গড়ে তুলতে চায় যার প্রভাব পড়বে সর্বত্র। যার সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্ট সকলেই। কম খরচে সহজেই পৌঁছে দেওয়া যাবে মালপত্র। গ্রামীৎ এমন বহু এলাকা আছে যেখান থেকে মাল পাঠাতে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। কাজের জিনিস, কিন্তু আনার খরচ বেশি। এইসব জিনিসও একটি সফল ডিস্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে কিরাণা স্টোর্স (মুদির দোকান), ফার্মেসি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্স, বুটিকে পৌঁছে দিতে চান শ্রীধর। এটাই তাঁর 'শেষ কয়েক মাইল' ছুঁয়ে ফেলা।

এতবড় ব্যাপারস্যাপার আর প্রযুক্তির যোগ থাকবে না তা কি হয়? বিভিন্ন ধরনের কাজকর্মের হিসাব রাখার জন্য চালু হবে Single Terminal with Multiple Services (STEMS) মডেল। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে জানা যাবে ডেলিভারি স্টেটাস।


দ্রুত বাড়ছে ব্যবসা

চলতি বছরের অগাস্টে কানেক্টিং ইন্ডিয়াতে ৩২ কোটি টাকা লগ্নি করেছে Aavishkaar. যা কাজে লাগান হবে ১৭টি রাজ্যজুড়ে, ১৫০টি শহরে বাণিজ্যিক কাজকর্মের জন্য। সেইসঙ্গে শহর ও গ্রামে গড়ে তোলা হবে ১৫০০টি সিআইসি। এ প্রসঙ্গে শ্ৰীধর জানালেন, তাঁরা আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির মধ্যে দ্বিতীয় দফা লগ্নি চান। তখন তাঁরা অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পথে এগোবেন। দেশজুড়ে গড়ে তুলবেন মাইক্রো-ওয়্যারহাউসিং।

বর্তমানে সংস্থায় কর্মীর সংখ্যা ২০০। চলতি বছরের মধ্যেই তা বাড়িয়ে হাজারে নিয়ে যেতে চায় সংস্থা। আর ছড়িয়ে পড়তে চায় আরও ৩৫০টির মতো এলাকায়। যে নেটওয়ার্ক প্রায় ১৫ হাজার পিন কোড ঘিরে ফেলবে। ২০১৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৫ হাজারটি আউটলেট খুলবে সংস্থা। যার ফলে খুব কম করে হলেও ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। শ্রীধর আশাবাদী যে ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে ২৬০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার সংস্থা হবে তাঁর কোম্পানি। আর আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লক্ষ্য বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। সংস্থা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে তাঁর আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

লেখা - অপরাজিতা চৌধুরী