আশা নিরাশা টপকে বড়দিনের অ্যালেন পার্ক

0

পুরনো বছরকে ভুলে নতুনকে বরণের অপেক্ষায় দিন গুনছে গোটা বিশ্ব। ক্রিসমাস, নিউ ইয়ারের এই কটা দিন যেন বছরের বাকি সময়টার চেয়ে একেবারে আলাদা। দুপুরের পর থেকেই পড়তে থাকা হালকা শীত, সন্ধ্যের চা বাদ দিয়ে মাঝেমাঝেই কফির কাপে আলতো চুমুক, পরিবার-বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পিকনিকের প্ল্যানিং - এসব তো আছেই। কিন্তু কলকাতার কাছে আরও একটা জিনিস আছে, যা অন্তত এদেশের আর কোথাও নেই। পার্ক স্ট্রিট। বছর শেষের এই কয়েকটা দিনে কীভাবে যেন বদলে যায় এই এলাকা। শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, নেচার পার্ক যেখানেই যান না কেন, একবার অন্তত আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিট না দেখলে ক্রিসমাস যেন সম্পূর্ণ হয় না। গত কয়েক বছরে পার্ক স্ট্রিটকে আরও বদলে দিয়েছে অ্যালেন পার্কের উৎসব। পোশাকি নাম কলকাতা ক্রিসমাস ফেস্টিভ্যাল। তবে পার্ক স্ট্রিট চত্বরে গেলেই বুঝতে পারবেন, একে ফেস্টিভ্যাল না বলে কার্নিভাল বলাই ভালো।

তা গোটা শহরের যখন ডেস্টিনেশন পার্ক স্ট্রিট, তখন আমরাই বা বাদ যাই কেন? শীতের সন্ধ্যেয় হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম অ্যালেন পার্ক। সেখানে তখন পুরোদমে গানের লাইভ পারফরম্যান্স চলছে। থিকথিক করছে মানুষের ভিড়। অনেকটা ষষ্ঠীর সন্ধেয় নামকরা কোনও ক্লাবের দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের মতো চেহারা। গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে লাল জামা, সাদা দাড়ি সান্তা দাদুকে নিয়ে সেলফি তোলার হিড়িক। পার্কের বেঞ্চে, স্টেজের সামনে পাতা চেয়ারে মানুষ তোরয়েছেনই। তবে ভিড়ের অধিকাংশটাই কিন্তু পার্কের ডানদিকে সার দিয়ে পসরা সাজিয়ে বসা স্টলগুলিতে। পর্যটন বিভাগের সরকারি স্টল থেকে শুরু করে, হোমমেড কেক চকোলেট, জুটব্যাগ, এমনকী সিঙিড়া, জিলিপি, নলেনগুড়ের মিষ্টি - অ্যালেনপার্কের এই হট্টমেলায় সবই উপস্থিত। একে একে সকলের সঙ্গে কথা বলতেই বোঝা গেল কেউ পেটের টানে, কেউ নেহাতই ঝোঁকের বশে, আবার কেউ সংস্থার প্রমোশনের জন্য, রোজ বিকেলে হাজির হচ্ছেন অ্যালেন পার্কে।

ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে প্রথমেই চোখে পড়লেন কেক, প্যাটিস, ব্রাউনি নিয়ে বসে থাকা এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা। কথা বলে জানতে পারলাম স্টলটি তাঁর মেয়ে, নিউটাউনের বাসিন্দা কলিন গ্লাইক-এর। বছর দেড়েক হল নিজের বাড়ি থেকেই নানারকম কেক, ব্রাউনি এবং স্ন্যাক্স বানিয়ে বিক্রি করেন কলিন। মেয়ের উদ্যোগ দেখে হাতে হাতে তার সঙ্গে কাজে নেমে পড়ছেন মা-ও। মুখে মুখে প্রচার আর ফেসবুকের মাধ্যমে অর্ডার নিয়েই এতদিন চলছিল। তবে কেকের মরশুমে বড়দিনের বাজার ধরতেই নিজের সংস্থা 'Chantelle'-এর জিনিসপত্র নিয়ে এবছর চলে এসেছেন অ্যালেন পার্কে। ব্যবসাও হবে, পরিচিতিও বাড়বে- এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারলে ক্ষতি কী?

মায়ের সঙ্গে কলিন
মায়ের সঙ্গে কলিন

আরও একটু এগোলই চোখে পড়বে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান খাবারের একটি ছোট্ট স্টল। বো-ব্যারাক্‌সের জর্জিনা কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে সঙ্গে নিয়ে স্টলটি চালাচ্ছেন। এমনিতে সারাবছরই কেটারিং করেন তিনি। পাশাপাশি বো-ব্যারাক্সখ্যাত হোমমেড ওয়াইনের ব্যবসাও আছে। তবে বছরের এই সময়টা গত তিন বছর ধরেই অ্যালেন পার্কে কাটান তিনি। ব্যবসা যেমন বেশি হয়, তেমনই ক্রিসমাস টা বেশ সকলের সঙ্গে আনন্দ করে কাটানো যায়। গত দু-তিন বছরে অ্যালেন পার্কের সৌজন্যে কলকাতার ক্রিসমাসের চেহারা বদলেছে, মানছেন জর্জিনা। উৎসব, আনন্দের পাশাপাশি ব্যবসাও যেভাবে এই কদিন লাভের মুখ দেখছে তাতে তিনি বেজায় খুশি। তাঁর মতে এশহরের পুরো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এবং ক্রিশ্চান কমিউনিটির জন্যই এটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

গতবছর পর্যন্ত বড়দিনের উৎসবে অ্যালেন পার্কের ভিতরে মোমো, ফ্রাই, কেক, চকোলেট বাড়িতে বানানো নানা রংয়ের মোমবাতি এধরণের বিভিন্ন জিনিসের অল্প কয়েকটি স্টল দেখা যেত। এবছর কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিখাদ দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের স্টল, এমনকী চটের ব্যাগের স্টল পর্যন্ত। এই যেমন মৌলালির সইফ আলি। পেশায় এসি মেকানিক। গতবছর ক্রিসমাসে বন্ধুদের সঙ্গে অ্যালেন পার্কে বেড়াতে এসেছিলেন। ছোট ছোট দোকানগুলি মনে ধরেছিল। তখনই ঠিক করেছিলেন এরকম কিছু একটা পরেরবার থেকে তিনিও করবেন। ব্যস্‌, যেমন ভাবা তেমন কাজ। এবছর এক সহকর্মীকে নিয়ে দিব্যি খাবার বিক্রি করছেন। সকালে এসি মেশিন সারানো, তারপর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিক্রিবাট্টা। খানিকটা উপরি রোজগার হোক সকলেই তো চায়। তবে সইফ কিন্তু রোজগার নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন না। বছরের এই সময় পার্ক স্ট্রিট তাঁকে বরাবর টানে। এবছর থেকে নিজেও সেই আনন্দ আয়োজনের ভাগীদার হতে পেরেই খুশি তিনি। অন্যদিকে, চটের ব্যাগের পসরা সাজিয়ে বসে পড়েছেন শুভজিৎ গোস্বামী। তিনি যে সংস্থার হয়ে কাজ করেন তাদের প্রচারের জন্যই স্টল দেওয়া। তবে নতুন পরিবেশে নতুনভাবে কাজ করতে পেরে ভালোই লাগছে তাঁর। শনি, রবিবার ব্যবসাও ভালো হচ্ছে বলে জানালেন। শুধুমাত্র খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষেরা নন, গত কয়েক বছরে বাঙালিরাও যেভাবে এই উৎসবে সামিল হচ্ছেন তা বেশ ইতিবাচক বলেই মনে করেন শুভজিৎ।

তবে শুধুই কি এধরণের স্টল আর স্টেজ মাতানো দারুণ সব পারফরম্যান্স? অ্যালেন পার্কে গেলে আর কিছু কি নজরে পড়বে না? নিশ্চয় পড়বে। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কেমন যেন একা বসে ছিল ছোট্ট একটি মেয়ে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তার নাম হাসিনা। বাড়ি মল্লিকবাজারে। বাবা মদাসক্ত। মা কয়েকটি বাড়িতে কাজ করেন। তাতেই চলে চার বোন, দুই ভাই আর হাসিনার। স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছে সে। তবে বড়দিনের এই সময়টা প্রতিবছরই সান্তার টুপি, আর নানা রঙের হেয়ারব্যান্ড বিক্রি করে হাসিনা। এবছরও ৩,০০০ টাকার জিনিস এনেছে। এখনও পর্যন্ত সব বিক্রি হয়নি। তবে ২রা জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলবে। সব মাল বিক্রি হয়ে যাবে বলেই আশা হাসিনার। বাবা, মা-র হাত ধরে বেড়াতে আসা বাচ্চাদের দেখলেই গিয়ে গিয়ে সান্তা টুপি কেনার কথা বলতে কসুর করছে না বছর চোদ্দর মেয়েটি।

হাসিনা কিন্তু একা নয়। পার্কের আর এক প্রান্তে তাকালেই আপনার চোখ পড়বে বেলুন বিক্রেতা ওসমানের উপর। বাবা নেই। বাড়িতে মা আর দুই ভাইবোন। সারা বছর ধরেই কখনও দরজির কাজ, কখনও কোনও দোকানে কাজ করে পেট চালায় ছেলেটি। অ্যালেন পার্কে এবছর সে এসেছে বেলুন বিক্রি করতে। কোনওদিন ১০০ কোনওদিন ২০০ টাকার বিক্রি হচ্ছে। অভাবের সংসার। ইচ্ছে থাকলেও অন্য কোনও জিনিসের দোকান দেওয়ার সাধ্য নেই। যেটুকু রোজগার হয় তা-ই লাভ। গোটা শহর বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মাতোয়ারা। তবে ওসমানের পাখির চোখ এই ক'টা দিন। হাতে তো এটুকুই সময়। তাতেই যতটা সম্ভব রোজগার সেরে ফেলতে হবে তো।

কলকাতার বড়দিন আর বর্ষবরণের উৎসবের অধিকাংশটাই তো পার্কস্ট্রিট চত্বর জুড়ে। অ্যালেন পার্ক তাতে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। কলিন, জর্জিনা, সইফরা যখন অ্যালেন পার্কে তাঁদের স্টার্ট আপ নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন তখন মনের মধ্যে আশার আলো জ্বলে ওঠে। মনে হতে থাকে এই তো সম্ভাবনা রয়েছে। এই শহরেও দারুণ সব নতুন ব্যবসা গড়ে উঠতেই পারে। তবে দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার সময় কোথাও যেন হাসিনা, ওসমানরা মনের কোনে বারবার উঁকি মারতে থাকে।