ইউনুসের দেখানো পথ নবীন উদ্যোক্তাদের পাথেয়

0

মহম্মদ ইউনুস। নতুন করে পরিচয় দেওয়ার কিছু নেই। সামাজিক উদ্যোক্তাদের জগতে তিনি নামী চরিত্র। সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ। গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইউনুসের পরিচিতি সবচেয়ে বেশি। তাঁর এই ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষকে স্বল্প ঋণ দিয়ে রোজগারের পথ দেখিয়েছে। এই অবদানের জন্য ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তখন থেকে আর থামেননি। গ্রামীণ ফাউন্ডেশন, গ্রামীণ ফোন, গ্রামীণ দানোন এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর জীবন এবং কাজ থেকে নবীন উদ্যোক্তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। তেমনি ৬টি অমূল্য শিক্ষা তুলে ধরা হল-

যেখানে কেউ নজর দেয়নি তেমন বাজার ধরা

বাংলাদেশের গ্রামের ৪২ জন মহিলার কাছ থেকে সব মিলিয়ে হাজার খানেক টাকা(২৭ ডলার) ধার করে শুরু করেছিলেন এই নোবেলজয়ী। এটা এমন একটা বাজার ছিল যেখানে কোনও ব্যাঙ্ক কোনওদিন উৎসাহ দেখায়নি। তিনি নতুন বাজারের সৃষ্টি করেছেন। TED talk এ তিনি ব্যাখ্যা দেন, কীভাবে ব্যাঙ্কগুলির সাধারণ নিয়মের উলটো পথে হেঁটে বড়লেক পুরুষদের নয়, বরং গরিব মহিলাদের ব্যাঙ্কের মালিক করে দিয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, মহিলা এবং গরিবরাই নিজেদের ভাগ্যগড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিশ্বস্ত। যেটা দরকার সেটা হল অল্প একটু মূলধন। তাতেই পরিস্থিতি আমূল পালটে যেতে পারে।

বড় স্বপ্ন দেখতে হবে

ইউনুস ছোট করে শুরু করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি ধাপে ধাপে এগিয়েছেন। বড় হয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক নিয়ে তাঁর স্বপ্নে কখনও টাল খাননি। ১৯৮৩ সালে যদি ফিরে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে সেই সময় গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ৮৬টি শাখা এবং ৫৮ হাজার ঋণগ্রহীতা নিয়ে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিল। ২০১০ সালে সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে ২,৮০০ শাখা এবং ৭০ লক্ষ ঋণগ্রহীতায় দাঁড়ায়। কয়েক হাজারের দারিদ্র মুছে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, লক্ষ লক্ষ মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন তিনি। সেটা শুধু নিজের দেশ বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

সহযোগিতাই বৃদ্ধির চাবিকাঠি

গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ব্যবসা বাড়তে এবং কনসেপ্ট সফল করতে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। যদি নানা অংশীদারের একাধিক সহযোগিতার হাত না পেতেন তাহলে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক নিয়ে বেশিদূর এগোন সম্ভব ছিল না ইউনুসের। গ্রামীণ ব্যাঙ্কের পর ইউনুস আরও বেশ কয়েকটি উদ্যোগে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফরাসি সংস্থা ডানোনের সঙ্গে গাঁটছড়া। ডাবড গ্রামীণ ডানোন ইউনুসের আরও একটি বড় স্বপ্ন পূরণ করেছে। সামাজিক ব্যবসার পরিচিতি ঘটিয়ে পুঁজিবাদের চেহারা চিরতরে বদলে দিতে চেয়েছিলেন। ইকবাল জে কাদিরের সঙ্গে কাজ করে গ্রামীণ ফোন লঞ্চ করেন। টেলিকম প্রোভাইডার গ্রামীণ ফোন বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার হয়ে যায়।

প্রয়োজনে বৈচিত্র দরকার

গ্রামীণ ব্যাঙ্কের সাফল্যের পর গেরে বসে থাকেনিন ইউনুস। আরও নানা বিকল্প খুঁজতে থাকেন। ৮০র শেষ দিকে গ্রামীণ নানা প্রকল্প নিয়ে আসতে থাকে। গ্রামীণের ছাতার তলায় গ্রামীণ মৎস্য, গ্রামীণ কৃষি, গ্রামীণ ট্রাস্ট, গ্রামীণ ফান্ড, গ্রামীণ সফটওয়ার লিমিটেড, গ্রামীণ সাইবার নেট লিমিটেড এবং গ্রামীণ নিটওয়ার লিমিটেডের মতো পৃথক পৃথক সংস্থাও গড়ে ওঠে। গ্রামীণ টেলিকমের অংশীদারিত্ব রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফোন সংস্থা গ্রামীণফোনে।

পুষ্টিসাধন, শিক্ষাদান এবং সাহায্য

ইউনুস স্যোশাল বিজনেস(YSB) গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাবের একটা অংশ। সারা বিশ্বে সামাজিক ব্যবসা তৈরিতে সাহায্য করে। ইউনুস, সাসকিয়া ব্রুইস্টেন, সোফি এইসেনম্যান এবং হনস রেইটজরা মিলে YSB প্রতিষ্ঠা করেন। YSB এর কাজ হল নানা সংস্থা, সরকার এবং এনজিওগুলিকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। YSB ছাড়াও ইউনুস YY (Yunus + You) ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এর কাজ হল ২৫ বছরের নীচের সামাজিক উদ্যোক্তাদের নেটওয়ার্ক তৈরিতে এবং ব্যবসার নানা আইডিয়া দিয়ে সাহায্য করে।

মন ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন লোকের কাছ থেকে সাবধান

এতগুলি ভালো কাজের পরও নানাভাবে সমালোচিত হয়েছেন ইউনুস। এমআইটি-এর পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব প্রশ্ন তোলে, ক্ষুদ্রঋণ ভারতের মতো দেশে আদৌ কার্যকর কিনা। বাংলাদেশসরকার ইউনুসকে আক্রমণ করে এই বলে, যে তিনি নাকি গরিবদের রক্ত শুষে নিচ্ছেন। সাংবাদিকরাও ক্ষুদ্রঋণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এমনকী গ্রামীণ ব্যঙ্গের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদও ছাড়তে বলা হয়, যে সংস্থা তাঁর হাতেই গড়া। ইউনুসের প্রতিক্রিয়া ছিল, বাধা ঠেলে এগিয়ে যেতে হবে এবং তাঁরে এই কাজগুলি নিয়ে আলোচনা চলতে থাক।

লেখক-নেলসন বিনোদ মোসেস

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস